প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ির সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের আবেদন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে ‘সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি’।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) কমিটির আহ্বায়ক কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে বড় সরদার বাড়ির পূর্ণাঙ্গ কারিগরি পরীক্ষা, শুটিংসংক্রান্ত নথি প্রকাশ, ফাউন্ডেশনের আর্থিক কার্যক্রমের স্বাধীন নিরীক্ষা এবং প্রকৃত কারুশিল্পীদের অধিকার সুরক্ষাসহ ১২ দফা আবেদন জানানো হয়।
স্মারকলিপির অনুলিপি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী, ইউনেস্কোর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ও সব সদস্য এবং দেশের জাতীয় সংবাদ মাধ্যমের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাঠানো হয়েছে।
এর আগে এসব অভিযোগ নিয়ে ২৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সংরক্ষণ কমিটি। ৩১ আগস্ট সোনারগাঁয়ে মানববন্ধনও অনুষ্ঠিত হয়।
স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ি টানা চার দিন বাণিজ্যিক শুটিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এ সময় উচ্চক্ষমতার জেনারেটর, ভারী ক্যামেরা, সাউন্ড সিস্টেম, ক্যামেরা ক্রেন, ট্রলি ও শক্তিশালী আলোকসজ্জার সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়।
কমিটি জানতে চেয়েছে, শুটিংয়ের আগে হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছিল কি না, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের লিখিত মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছিল কি না এবং ভারী সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো কারিগরি নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। জেনারেটরের কম্পন, ভারী সরঞ্জামের চলাচল ও দীর্ঘ সময় শক্তিশালী আলোর তাপে পুরোনো গাঁথুনি, চুনসুরকি, কাঠ, প্লাস্টার, মেঝে ও অলংকরণের ভেতরে ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে প্রত্নতত্ত্ববিদ, সংরক্ষণ স্থপতি ও কাঠামো প্রকৌশলীদের নিয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল গঠনের আবেদন জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে শুটিংয়ের আগের সংরক্ষণ নথি ও আলোকচিত্রের সঙ্গে ভবনটির বর্তমান অবস্থা মিলিয়ে পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।
ফাউন্ডেশনের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম নিয়েও স্মারকলিপিতে কয়েকটি অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে প্রকৃত কারুশিল্পীদের বঞ্চিত করে সুবিধাজনক স্থানে অকারুশিল্পীদের দোকান বরাদ্দ এবং দোকান বরাদ্দে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ। ফাউন্ডেশনের সুবর্ণজয়ন্তী ও বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ উদযাপন, নির্মাণ ও মেরামত, শ্রমিক বিল, স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ, কারুশিল্পীদের কাঁচামাল কেনা, সরকারি অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা এবং অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রমে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোও স্বাধীন তদন্তের আওতায় আনার আবেদন করা হয়েছে। এ জন্য কার্যাদেশ, টেন্ডার ও কোটেশন, পরিমাপ বই, বিল, ভাউচার, ব্যাংক হিসাব, শ্রমিক হাজিরা, অর্থ পরিশোধের রেকর্ড, দোকান বরাদ্দের তালিকা ও ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করার কথা বলেছে কমিটি। তদন্ত চলাকালে সংশ্লিষ্ট নথি যাতে পরিবর্তন, সরিয়ে ফেলা কিংবা নষ্ট করা না যায়, সে জন্য প্রশাসনিক সুরক্ষার আবেদনও জানানো হয়েছে।
কারুপল্লীর প্রকৃত কারুশিল্পীদের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়। স্মারকলিপিতে বলা হয়, অনেক কারুশিল্পীর দোকান এমন স্থানে রয়েছে, যেখানে দর্শনার্থীরা সহজে পৌঁছাতে পারেন না। অন্যদিকে সুবিধাজনক স্থানে অকারুশিল্পীদের দোকান বরাদ্দের অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় প্রকৃত কারুশিল্পীদের অগ্রাধিকার, কারুশিল্পী পরিচয় যাচাইয়ের স্বচ্ছ পদ্ধতি এবং প্রধান প্রবেশপথ থেকে কারুপল্লীর দিকে সুস্পষ্ট নির্দেশনাচিহ্ন স্থাপনের আবেদন জানানো হয়েছে। ১২ দফা আবেদনের মধ্যে আরও রয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপনায় বাণিজ্যিক শুটিং ও বড় আয়োজনের আগে হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট নিশ্চিত করা, ঐতিহাসিক স্থাপনার বাণিজ্যিক ব্যবহারে পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন, দোকান বরাদ্দের পূর্ণ তথ্য প্রকাশ, তদন্তে দায় পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্ত কমিশন ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ।
কমিটির আহ্বায়ক শাহেদ কায়েস বলেন, তদন্তের আগে কোনো অভিযোগকে তাঁরা চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করছেন না। স্বাধীন তদন্ত ও বিশেষজ্ঞ পরীক্ষার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ এবং বড় সরদার বাড়িসহ সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক সম্পদ ও প্রকৃত কারুশিল্পীদের স্বার্থ সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা।






































আপনার মতামত লিখুন :