নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের আসামী করা হলেও তাদের সকলরে অব্যাহতি পেয়ে যান। তবে এখনো ঝুলে আছেন শওকত হাশেম শকু। যে ৬ জনকে মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে তাদের মধ্যে আলোচিত তিনিই রয়ে গেছেন।
২০০১ সালের ১৬ জুন বোমা বোমা হামলার পর দিন মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা বাদি হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় দুইটি মামলায় (একটি বিস্ফোরক অন্যটি হত্যা) জেলা বিএনপির তৎকালীন সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে প্রধান করে বিএনপি ও এর অঙ্গ দলের মোট ২৭ জনকে আসামী করা হয়। মামলার আসামীরা হলেন জেলা বিএনপি নেতা আনিসুল ইসলাম সানি, মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন, নুরুল ইসলাম সরদার, সুরুজ্জামান, ইকবাল আহমেদ শ্যামল, অকিলউদ্দিন ভূইয়া, মমতাজ উদ্দিন মন্তু, মনিরুল ইসলাম রবি, ক্যাপ্টেন দুলাল, তুষার আহমেদ মিঠু, কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাসান রোজেল, সহ সভাপতি রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী, বদিউজ্জামান, জাহাঙ্গীর আলম, সামসুল ইসলাম মিঠু প্রমুখ।
মামলার আসামী কামালউদ্দিন মৃধা, সুরুজ্জামান, মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন, মমিনউল্লাহ ডেভিড ও তার ভাই ওবায়েদউল্লাহ মনা, পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম মারা গেছেন।
২০১৩ সালে এদের সকলকে বাদ দিয়ে ৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট দেয় সিআইডি। তিনি হলেন সিটি করপোরেশনের ১২নং ওয়ার্ডের তিনবারের কাউন্সিলর ও বিলুপ্ত পৌরসভার কমিশনার শওকত হাশেম শকু। জেলা বিএনপির সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক ও মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক শকু কি কারণে ওই মামলায় অভিযুক্ত সেটা নিয়ে তিনি নিজেও সন্দিহান। কারণ মামলার বাদী অ্যাডভোকেট খোকন সাহা ২০১৫ সালের ৬ নভেম্বর আদালতে হলফনামা দিয়ে স্বীকার করেছিলেন ঘটনার সঙ্গে শকু জড়িত না। এছাড়া ২০২০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর আদালতে সাক্ষ্য প্রদানের সময়ে শামীম ওসমান দাবী করেছিলেন বোমা হামলায় শওকত হাশেম শকু ‘জড়িত মনে করেন না’।
চার্জশীটে শকুর পরিচয় হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার আসামী মেজর বজলুর হুদার শ্যালক খালাসপ্রাপ্ত আসামী ক্যাপ্টেন কিসমত হাশেমের ছোট ভাই উল্লেখ করা হয়। এরই মধ্যে ক্যাপ্টেন কিসমত হাশেম মারা গেছেন। তিনি মুজিব হত্যা মামলার খালাসপ্রাপ্ত আসামী ছিলেন।
২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর শেখ মুজিবুর হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয় সেদিন আওয়ামী লীগের কিছু উশৃঙ্খল লোকজন ডনচেম্বার এলাকাতে শকুর বাড়িতে হানা দেয়। শকুর বৃদ্ধ মা ও বাবাকে ঘর থেকে টেনে বের করে নিচে সব আসবাবপত্র বের করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘরে নারীদের উপর চলে নির্যাতন যেটা কেউ বলে না। সেলে নিয়ে ১০ দিন চোখ বেঁধে নির্যাতনের পর চোখ নষ্টের উপক্রম ছিল।
চার্জশীটভুক্তদের মধ্যে ২০০৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী ভারতের রাজধানীর দিল্লীর একটি রেল ষ্টেশন হতে হরকাতুল জিহাদের দুই জঙ্গি সহোদর আনিসুল মোরসালিন ও মুহিবুল মুত্তাকিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা বোমা হামলার ঘটনা স্বীকার করেছেন। বর্তমানে দিল্লী কারাগারে বন্দী রয়েছে।
আরেক আসামী শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল অপর এক মামলায় কারাবন্দী। তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন অনেক আগেই।
মুফতি হান্নানের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে আরো একটি মামলায়।
মামলার তদন্ত প্রতিবেদন মতে ওবায়দুল হক নিজেই মোরসালিন ও মোত্তাকিমকে নিয়ে চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার কিছুক্ষণ আগে প্রবেশ করেন। ওবায়দুল নিজেই শামীম ওসমানের সামনে গিয়ে টেবিল চাপড়ায়। তাদের হাতে ছিল কালো ব্রিফকেস। এর কিছুক্ষণ পরেই বোমাটি বিস্ফোরণ ঘটে। ওবায়দুল হকের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া ও মিশনপাড়ার সংযোগস্থল চকলেট ফ্যাক্টরী মোড়ে। ২০২০ সালের ১২ মার্চ মারা গেছেন।
প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জ শহরের উত্তরাঞ্চলে এক সময়ে বিএনপির আলোচিত যেসব নেতা ছিলেন তাদের একজন শওকত হাশেম যাঁকে সকলে ডাক নাম ‘শকু’ নামেই ডাকে। বিলুপ্ত পৌরসভায় কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের তিনটি নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে দোর্দা- দাপট নিয়ে তিনি যেমন জিতেছেন তেমনি বিগত সময়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনেও ছিলেন সামনের সারির একজন দক্ষ ফাইটার। আর সে কারণেই ২০০৮ সালের পর থেকে তাকে পোহাতে হয়েছিল অত্যাচার আর নির্যাতনের এক ভয়াবহ খড়গ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বার বার গ্রেপ্তার, বিশেষ সেলে নিয়ে নির্যাতন এমনকি শীতের কনকনে রাতে আঁধারে সাদা পোশাকের কতিপয় দুর্বুত্তরাও বাড়িতে হানা দিয়ে গুমের চেষ্টা করেছিল। নারায়ণগঞ্জে ভয়াল ১৬ জুনের সেই আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার মামলাতেও শুধু জড়ানো হয়নি বরং চার্জশীট দিয়েও এক মানসিক যন্ত্রনায় রাখা হয়েছে। অথচ ওই মামলায় যেসব বিএনপি নেতাকর্মীদের শুরুতে বিবাদী করা হয়েছিল তাদের কেউ আপস, কেউ বা সমঝোতা করে রেহায় পেয়ে গেছেন বহু আগে। কিন্তু শহরের উত্তরাঞ্চলের দোর্দ- ও জনপ্রিয় কাউন্সিলর থাকাতেই কেবল শকুকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে এমন অভিযোগ অনেকের। এলাকাবাসী বলছেন, ২০০৮ হতে অদ্যাবধি নির্যাতনের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছেন শকু।
বলা হয় শকু হলেন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামীর ভাই। কিন্তু বাস্তবিক হলো বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা থেকে তাঁর ভাই কিসমত হাশেম খালাস পেয়েছেন। আর সেটা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই। তবে যেটা প্রকাশ হয় না সেটা হলো ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা সময়ে যখন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় প্রকাশ হয় সেদিন আওয়ামী লীগের কিছু উশৃঙ্খল লোকজন ডনচেম্বার এলাকাতে শকুর বাড়িতে হানা দেয়। শকুর বৃদ্ধ মা ও বাবাকে ঘর থেকে টেনে বের করে নিচে সব আসবাবপত্র বের করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘরে নারীদের উপর চলে নির্যাতন যেটা কেউ বলে না। গত সময়েও সেলে নিয়ে ১০ দিন চোখ বেঁধে নির্যাতনের পর চোখ নষ্টের উপক্রম ছিল।
সময়টা তখন ২০০১। ১ অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসলেও নানা মামলায় কারাগারে ছিলেন শওকত হাশেম শকু। বিএনপি ক্ষমতায় আসলেও কারাগারে ছিলেন কয়েক মাস। মুক্তির পর আনন্দের বন্যা বইয়ে যায় এলাকাতে। দেওয়া হয় বিশাল সংবর্ধনা যেখানে লোকজন জড়ো হয় বিভিন্ন এলাকা থেকে। পরের বছর ২০০২ এর শেষের দিকে। ওই সময়ে পৌরসভা নির্বাচনের উত্তেজনা। একই সঙ্গে অপারেশন ক্লিনহার্টের কারণে বিএনপির অনেকেই কিছুটা ভীত ছিল। শহরের ১২নং যা তৎকালীন ছিল ৩ নাম্বার ওয়ার্ডবাসী সিদ্ধান্ত নিলেন ১৮ বছর পর পৌর নির্বাচনে অবহেলিত ওয়ার্ডের উন্নয়নের ঝান্ডা দিতে হবে একজন তরুণের হাতে। দায়িত্ব দেওয়া হয় শওকত হাশেম শকুকে। একাট্টা হন সবাই। কিন্তু বিএনপি তখন শকুকে সমর্থন দেয়নি। কিন্তু এলাকাবাসীর আকুণ্ঠ সমর্থনে ২০০৩ সালের ১৬ জানুয়ারীর নির্বাচতে বাজিমাত ঘটান তিনি। কাউন্সিলরের পাশাপাশি হয়ে যান জেলা বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদকও। এগিয়ে চলেন উন্নয়ন কাজে তাল মিলান রাজনীতিতেও।
২০১১ সাল এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ আর বিএনপির কাটখড় পোড়ানো নেতা শকু কাউন্সিলর প্রার্থী। প্রতিদ্বন্দ্বি ক্ষমতাসীন দলের একঝাক পরিচিত মুখ। কিন্তু বিগত উন্নয়নের আচড়ে ধোপে টিকেনি কেউ। এলাকাবাসী ক্ষমতার দম্ভকে ভুলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পেছনে রেখে সামনে নিয়ে আবারও শকুকে টানা দ্বিতীয়বারের মত জনপ্রতিনিধি বানান।
কিন্তু পরের ঘটনা আরো মর্মান্তিক। একের পর এক কাজের জন্য যখন তিলক সরে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তখনই পেছনে ছুটেন একদল ব্যক্তি যারা উন্নয়নের রথ টেনে ধরার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন অজুহাতে মামলায় গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনে চোখ হারানোর উপক্রম হয় শকুর। ভয়ভীতি থেকে শুরু করে এমন কিছুই বাদ যায়নি তার বিরুদ্ধে। আর এসব কারণ কাউন্সিলরশীপও চ্যুত করা হয়। যদিও পরে উচ্চ আদালত থেকে আবারও তিনি সেটা ফেরত পেয়েছেন। বিএনপির জন্য নির্যাতনের শিকার হলেও বিএনপির রাঘববোয়াল নেতারাই তার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে।
২০১৩ এর শেষ ও ২০১৪ সালের শুরুতে যখন বিএনপি নেতাদের দমনে বিভিন্ন স্থানে গুপ্তহত্যা ও গুমের ঘটনা তখন সাদা পোশাকের দুর্বৃত্তরা ডনচেম্বারে শকুর বাড়িতে হানা দেয়। সারারাত শীতের কাপুনিতে বাইরে কাটাতে হয়েছে রাতের পর রাত। দুই শিশু সন্তানকেও তখন উদ্বেগ উৎকণ্ঠাতে কাটাতে হয়েছে। বেশ কিছু মামলাতেও কাবু করার চেষ্টা করা হয়।



































আপনার মতামত লিখুন :