ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হয়েও স্বস্তিতে নেই জমিয়তে উলামায়ে ইসলামীর জেলা সভাপতি মুফতি মনির হোসাইন কাশেমী। বরং নির্বাচনী মাঠে তাকে ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ১১ দলীয় জোটভুক্ত এনসিপির প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে আল আমিনের সক্রিয়তা ও উপস্থিতি এই আসনের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গাটিতেই পিছিয়ে পড়েছেন কাশেমী। বিপরীতে আব্দুল্লাহ আল আমিন অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের মধ্যে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। কয়েক মাসের ব্যবধানে মাঠে নিয়মিত উপস্থিতি, সামাজিক যোগাযোগ এবং সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে তিনি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, কাশেমীর চেয়ে আল আমিন বেশি ভোট পাবেন এমন ধারণা এখন এলাকাজুড়ে জোরালো।
আবার কাশেমীকে নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীদের মাঝে অর্থ বিতরণের ঘটনায় তাকে আর্থিক জরিমানা গুনতে হয়েছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি বিএনপির একটি বড় অংশের ভেতরে এখনো তার প্রতি ক্ষোভ রয়ে গেছে। দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে প্রকাশ্যে কেউ বিরোধিতা না করলেও অভ্যন্তরীণভাবে অনেকেই তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএনপি জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাশেমীর অবস্থান মাঠপর্যায়ে এখনো দুর্বল বলেই মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে শামীম ওসমানের বিপক্ষে টিকে থাকতে না পারার পর দীর্ঘদিন তাকে এলাকায় সক্রিয় দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা না থাকায় ভোটারদের সঙ্গে তার দূরত্ব আরও বেড়েছে।
বর্তমান নির্বাচনী প্রচারণায়ও কাশেমীর কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভোটারদের সরাসরি কাছে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি মূলত বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জে অনুষ্ঠিত দুটি বড় জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তার পক্ষে ভোট চেয়েছেন। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির নেতারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও বাস্তবে মাঠে তার ব্যক্তিগত প্রভাব তেমন চোখে পড়ছে না। ফলে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিই এখন তার প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই আসনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার এখনো মুফতি মনির হোসাইন কাশেমীকে ঠিকভাবে চিনেন না। শুধু প্রার্থী নয়, তার প্রতীক ‘খেজুর গাছ’ও অনেক ভোটারের কাছে অপরিচিত। ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলেও এলাকায় তার উপস্থিতি কিংবা প্রভাব খুব একটা দৃশ্যমান হয়নি। পাড়া-মহল্লায় প্রচারণা চালালেও ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ বা সাড়া মিলছে না বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
বিএনপি জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলীয় স্বার্থে কিছু নেতাকর্মী কাশেমীর পক্ষে মাঠে নামলেও তা অনেকটাই দায়সারা উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ বলে মন্তব্য করছেন তৃণমূল নেতারা। স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির বড় একটি অংশ নীরব থাকায় ভোটারদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নেতাকর্মী জানান, দীর্ঘদিন এলাকায় রাজনীতি করা ও মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা নেতাদের বাদ দিয়ে বাইরে থেকে একজন প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়ায় কর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়েছে।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হয়েও মনির হোসাইন কাশেমী যেখানে মাঠে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে ব্যর্থ, সেখানে আব্দুল্লাহ আল আমিন ধীরে ধীরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত এই আসনে ভোটাররা কোন দিকে ঝুঁকবেন, তা নির্ধারিত হবে মাঠপর্যায়ের রাজনীতি, তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং দলীয় ঐক্যের বাস্তব চিত্রের ওপর। এর ফলে সব হিসেবে আল আমিন এগিয়ে রয়েছেন।


































আপনার মতামত লিখুন :