ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয়, তার পক্ষে প্রকাশ্যে মাঠে থাকা বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে গিয়াসের ঘনিষ্ঠ কিছু নেতাকর্মী দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় নির্বাচনী মাঠে একরকম একা হয়ে পড়েছেন সাবেক এই এমপি।
তবে সেই শূন্যতা পূরণে সামনে এসেছেন গিয়াস উদ্দিনের দুই পুত্র জেলা কৃষকদলের সাবেক সদস্য সচিব কায়সার রিফাত এবং সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি (সদ্য বহিষ্কৃত) ও সাবেক কাউন্সিলর গোলাম মুহাম্মদ সাদরিল। দুটি আসনেই বাবার পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় সক্রিয় তারা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাঠঘাট চষে বেড়িয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন, তুলে ধরছেন বাবার রাজনৈতিক অবস্থান ও অতীত ভূমিকা।
রাজনীতিতে তাদের এই সক্রিয় উপস্থিতি হঠাৎ করে আসা নয়। রাজনীতিতে প্রবেশের আগেই নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছে গিয়াসের দুই পুত্রকে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই একের পর এক মামলায় জড়ানো হয় তাদের। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। গিয়াস উদ্দিনসহ তার দুই ছেলে রিফাত ও সাদরিলকে গ্রেপ্তার এড়াতে এলাকা ছাড়তে হয়। দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থেকে পালিয়ে বেড়াতে হয় পরিবারটিকে।
পরবর্তীতে ছাত্র ও জনতার টানা আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন আসে। বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের মাত্রা কমে আসে। একই সময়ে ক্ষমতাসীন দলের বহু নেতাকর্মী এলাকা ছাড়েন। মিথ্যা মামলায় আটক অনেক নেতাকর্মী দ্রুত জামিনে মুক্তি পান। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ফের সক্রিয় হয়ে ওঠেন গিয়াসের দুই পুত্র। তখন থেকেই তারা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে বেড়িয়ে সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।
এর মধ্যে সাবেক কাউন্সিলর গোলাম মুহাম্মদ সাদরিল দলীয় গণ্ডির বাইরে এসে ভিন্ন এক পরিচিতি তৈরি করেছেন। তিনি রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগে নিজেকে বেশি যুক্ত রেখেছেন। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষার্থীদের খাবার সরবরাহ, জরুরি রক্তের ব্যবস্থা, এলাকার যুবকদের সঙ্গে নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। সেবা নিতে আসা মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে তাৎক্ষণিক সহায়তার চেষ্টা করায় কাউন্সিলর থাকাকালীন সময়েই ভোটারদের কাছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছিলেন সাদরিল।
এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে গিয়াস উদ্দিন প্রার্থী হতে পারেন এমন আভাস পাওয়ার পরই তিনি ক্ষমতাসীনদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হন। তাকে কোণঠাসা করতে পরিকল্পিতভাবে তার দুই ছেলেকেও মামলার ফাঁদে জড়ানো হয়। এর ফলে দীর্ঘ সময় সাদরিল এলাকায় অনুপস্থিত থাকায় ওয়ার্ডবাসী নাগরিক নানা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে নাশকতাসহ ২০টির বেশি মামলা রয়েছে। এই মামলাগুলোর কারণে তাকে দুবার কারাবরণও করতে হয়েছে।
বর্তমানে সেই অতীত পেছনে ফেলে নির্বাচনী মাঠে নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন গিয়াস উদ্দিনের দুই পুত্র। বাবার রাজনৈতিক লড়াইকে সামনে রেখে তারা শুধু ভোটের অঙ্ক নয়, দীর্ঘদিনের ত্যাগ, নির্যাতন ও আত্মত্যাগের কথাও তুলে ধরছেন ভোটারদের কাছে। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও পারিবারিকভাবে মাঠে থাকার এই দৃশ্য নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনী রাজনীতিতে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।


































আপনার মতামত লিখুন :