নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসককে ঘিরে শেষ দিকে আলোচনায় এসেছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান। কিন্তু আলোচনায় এসেও জেলা পরিষদে জায়গা করে নিতে পারলেন না তিনি। সেই সাথে জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে জায়গা করে নিয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ।
রোববার (১৫ মার্চ) স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে সারা দেশের ৪২টি জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগের তথ্য জানানো হয়। ওই তালিকায় নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে অধ্যাপক মামুন মাহমুদের নাম রয়েছে। নতুন এ নিয়োগের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করবেন বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, নিয়োগ পাওয়া প্রশাসকেরা জেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪-এর ধারা ৩ এবং জেলা পরিষদ আইন ২০০০-এ সন্নিবেশিত ধারা ৮২ক (৩) অনুযায়ী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। বিধি অনুযায়ী তারা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাও পাবেন।
এর আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নিয়োগের পর জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়ে আলাপ আলোচনা সরগরম ছিলো। সেই সাথে সিটি কর্পোরেশনের মতো জেলা পরিষদেও প্রশাসক নিয়োগের সম্ভাবনা ছিলো। আর এই সম্ভাবনায় বেশ এগিয়ে ছিলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। বিএনপির প্রতি আনুগত্যের দিকে কেন্দ্রের সুনজরে ছিলেন তিনি।
তবে তার এই আলোচনায় যেন বাগড়া দিয়েছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান। জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে তার নামটিও নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে আলোচিত হচ্ছিলো। সেই সাথে কাজী মনিরুজ্জামান এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু সেখানে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। ফলে এবার তাকে জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করার সম্ভাবনা ছিলো।
সেই সাথে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদকে ঘিরে আলোচনায় ছিলেন মহানগর বিএনপি নেতা আবু জাফর আহমেদ বাবুল, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবির, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার প্রধান সহ আরও অনেকেই।
তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছেন অধ্যাপক মামুম মাহমুদ। তিনি এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। আর এই মনোনয়ন না পাইলেও তিনি দলের প্রতি আনুগত্য থেকেছেন। অন্যদের মতো বিদ্রোহ করেননি। একই সাথে বিএনপি দলীয় আন্দোলন সংগ্রামেও তার ভূমিকা ছিলো। আর তাই এবার পুরস্কার হিসেবে জেলা প্রশাসক পদে তাকে মনোনয়ন করার সম্ভাবনা ছিলো।
সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলো আওয়ামী লীগ। আর এই ক্ষমতায় থাকাবস্থায় নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মীরা অনেক নির্যাতন নীপিড়নের শিকার হয়েছেন। দিনের পর দিন মাসের পর মাস এবং বছরের পর বছর বিএনপির নেতাকর্মীদেরকে পরিবার পরিজন ছেড়ে দিন যাপন করতে হচ্ছে। সেই সাথে অনেক সময় তারা আন্দোলন সংগ্রামেও অংশ নিতে পারতেন না। ব্যবসা বাণিজ্যেও নানাভাবেই বাধার শিকার হয়েছেন।
সব মিলিয়ে তাদের যেন স্বাভাবিক জীবন যাপন ছিলো না। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনেকবার তাকে গ্রেফতার হতে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কারাভোগ করতে হয়েছে। পরিবারের সদস্যদেরও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। অনেক সময়ে পরিবারের সদস্যদের হেনেস্তার শিকার হতে হয়েছে।
এরই মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আর এই পতনের সাথে সাথে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গাঁ ঢাকা দিয়েছেন। এই অবস্থায় একদম খালি মাঠে ছিলো বিএনপি। দীর্ঘদিন পর খালি মাঠে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি যেন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিলেন। কেউ কাউকে মানছিলেন না।
সেই সাথে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িয়ে গেলেও অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে যেন কোনো বিতর্কই ছুতে পারেনি। কোনো রকম বিতর্ক ছাড়াই দলীয় কর্মসূচিতে সরব ভূমিকা পালন করেছিলেন। যার উপহারস্বরূপ তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হয়। আর এই নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন এলাকাতে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন মামুন মাহমুদ। কিন্তু তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। ফলে মামুন মাহমুদ নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদে অধিষ্ঠিত হতে চান। সেই সাথে কেন্দ্রীয় বিএনপিও তাকে এগিয়ে রেখেছিলেন।
তবে এই আলোচনার মধ্যে হঠাৎ করে বাধা হিসেবে আবির্ভাব হয়েছিলেন কাজী মনিরুজ্জামান। তিনি জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে নতুন করে আলোচনায় চলে এসেছিলেন। যা মামুন মাহমুদের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাহমুদকেই জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।



































আপনার মতামত লিখুন :