News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩

তৃণমূলের রাজনীতি শক্ত করতে চায় এনসিপি


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম তৃণমূলের রাজনীতি শক্ত করতে চায় এনসিপি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার পর এবার নারায়ণগঞ্জের তৃণমূলের রাজনীতিতে স্থায়ী অবস্থান তৈরির দিকে নজর দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সংসদীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে সংগঠনকে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে চায় দলটি। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই, জনসংযোগ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের মধ্য দিয়ে স্থানীয় নির্বাচনের মাঠ প্রস্তুত করছে দলটির নেতাকর্মীরা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এনসিপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য আসে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে। দলটির প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।  এই জয়কে শুধু একটি সংসদীয় আসন ধরে রাখতে চায় না এনসিপি। বরং এটিকে জেলার অন্যান্য এলাকায় সংগঠন বিস্তারের একটি ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে দলটি।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচন আর স্থানীয় নির্বাচনের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। সংসদ নির্বাচনে একটি দলের জনপ্রিয়তা বা প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বড় ভূমিকা রাখলেও স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর সঙ্গে ভোটারের সরাসরি সম্পর্ক, এলাকার সামাজিক অবস্থান, দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা এবং সাংগঠনিক উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভালো ফল করতে হলে শুধু দলীয় প্রতীক বা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে এগোনো এনসিপির জন্য যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে শক্ত তৃণমূল কাঠামো।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই নারায়ণগঞ্জে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সাংগঠনিক বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখছে এনসিপি।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সক্রিয় কর্মী তৈরি, নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় সমস্যা নিয়ে নিয়মিত মানুষের পাশে থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আগেভাগে মাঠে সক্রিয় করার মাধ্যমে ভোটারদের কাছে তাদের পরিচিতি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

এরই অংশ হিসেবে গত ১৪ জুলাই সোনারগাঁয়ে একটি পথসভায় স্থানীয় সরকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। ওই সভায় এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে তুহিন মাহমুদ, সোনারগাঁ পৌরসভার মেয়র পদে মোস্তফা খন্দকার এবং পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে শাকিল সাইফুল্লাহর নাম ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল আমিনও উপস্থিত ছিলেন।

প্রার্থী ঘোষণার এই উদ্যোগকে স্থানীয় রাজনীতিতে আগাম অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে প্রার্থী নির্ধারণ সাধারণত ভোটের সময় যত এগিয়ে আসে ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানে আগেভাগে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম সামনে এনে তাদের জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে চাইছে দলটি।

এনসিপির সামনে অবশ্য চ্যালেঞ্জও কম নয়। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। এসব দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগও বিস্তৃত। নতুন দল হিসেবে এনসিপিকে তাই শুধু নির্বাচনী প্রচারণার সময় মাঠে নামলেই হবে না নিয়মিত রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করতে হবে।

দলের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যকে তৃণমূলের জনসমর্থনে রূপান্তর করা। একটি আসনে বিজয় দলকে রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমানতা এনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু জেলার সব উপজেলা বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের সমর্থন রয়েছে কি না, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে সোনারগাঁ, আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, ফতুল্লা ও নারায়ণগঞ্জ সদর এলাকার স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। ফলে প্রতিটি এলাকায় আলাদা সাংগঠনিক কৌশল নিতে হতে পারে।

তরুণদের সম্পৃক্ত করাও এনসিপির পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলে আত্মপ্রকাশ করা দলটির জন্য তরুণ ভোটার ও নতুন রাজনৈতিক কর্মীদের বড় একটি অংশকে সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে আনা গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ে তরুণ নেতৃত্ব তৈরি করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে সেটিই দলের সাংগঠনিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

তবে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করাই শেষ কথা নয়। ঘোষিত প্রার্থীদের এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা, ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দলীয় কর্মীদের সক্রিয়তা সবকিছু মিলিয়েই নির্বাচনী ফল নির্ধারিত হবে। পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সমন্বয় কতটা কার্যকর হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এনসিপির জন্য একই সঙ্গে নির্বাচন ও সংগঠন দুই ক্ষেত্রের পরীক্ষাই হতে পারে। জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনে পাওয়া সাফল্য যদি ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ের সংগঠনে রূপ নেয়, তাহলে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দলটির অবস্থান আরও দৃঢ় হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিপরীতে স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হলে সংসদীয় সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা কঠিন হতে পারে।

ফলে নারায়ণগঞ্জে এনসিপির সামনে এখন মূল প্রশ্ন জাতীয় নির্বাচনের ভোটকে তারা কতটা তৃণমূলের রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাঠে সেই উত্তরই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে। আর সেই পরীক্ষায় সফল হলে নারায়ণগঞ্জের প্রচলিত রাজনৈতিক সমীকরণে এনসিপি নতুন একটি শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করার সুযোগ পাবে।