রাজপথে সক্রিয়, কর্মসূচিতে উপস্থিতি আছে, নেতাকর্মীদেরও কমতি নেই তবু নেই সাংগঠনিক নেতৃত্বের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো। এমন এক বাস্তবতায় দীর্ঘ সময় ধরে চলছে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রদল। নতুন কমিটির আশায় দিন গুনতে গুনতে প্রায় দুই বছর পার হলেও এখনো কাক্সিক্ষত নেতৃত্বের দেখা মেলেনি। ফলে তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে যেমন বাড়ছে অপেক্ষা, তেমনি তৈরি হচ্ছে হতাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের কাছে বিষয়টি এখন আর শুধু একটি কমিটি ঘোষণার অপেক্ষা নয়, বরং সংগঠনের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক গতিপথের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব না থাকায় নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম, নতুন কর্মী তৈরি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক কার্যক্রমে প্রত্যাশিত গতি নেই বলে অভিযোগ তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগরসহ কয়েকটি ইউনিটের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। তখন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে নতুন নেতৃত্ব গঠনের কথা জানানো হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল, যাচাই-বাছাই শেষে অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই অপেক্ষাই দীর্ঘ হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজনীতির নানা কর্মসূচিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল। আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে মামলা, গ্রেপ্তার, হামলা কিংবা নানা চাপের মধ্যেও মাঠে থাকার দাবি করছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক কঠিন সময়ে যারা সক্রিয় ছিলেন, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের সময় তাদের সাংগঠনিক ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হবে। কিন্তু কমিটি না থাকায় সেই মূল্যায়নের প্রক্রিয়াটিও যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতারা।
ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে সাংগঠনিক ধারাবাহিকতায়। একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি থাকলে ইউনিটভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন, কর্মী সংগ্রহ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং নিয়মিত সভা-সমাবেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো থাকে। দীর্ঘদিন সেই কাঠামো না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিনির্ভর উদ্যোগের ওপর কার্যক্রম নির্ভর করছে।
তৃণমূলের নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, রাজপথের কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি সংগঠনকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করার কাজটিও জরুরি। কিন্তু নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন কর্মীদের সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিতে নিয়মিত সাংগঠনিক উপস্থিতি না থাকলে অন্য সংগঠন বা নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলো সেই জায়গা দখল করতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
নতুন কমিটি নিয়ে একাধিকবার আশাবাদ তৈরি হলেও প্রতিবারই তা শেষ পর্যন্ত ঘোষণায় রূপ নেয়নি। দলীয় পর্যায়ে ঈদুল আজহার পর কমিটি ঘোষণার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু ঈদ পার হওয়ার পরও যখন কোনো ঘোষণা আসেনি, তখন অপেক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হতাশাও।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা যেন বিবেচনার প্রধান মাপকাঠি না হয়। বরং যারা দীর্ঘদিন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিলেন, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য তাদের সামনে আনা প্রয়োজন।
তাদের মতে, নেতৃত্বে আসার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে দেখা দরকার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি। একই সঙ্গে জেলা ও মহানগরের নেতৃত্বে ভারসাম্য রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা। কারণ, একটি কমিটি শুধু কয়েকজন নেতার পদ পাওয়ার বিষয় নয়, এর ওপর নির্ভর করে আগামী কয়েক বছরের সাংগঠনিক কার্যক্রমের গতিপথ।
কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, এবার নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণের চিন্তা রয়েছে। আন্দোলনে কার ভূমিকা কী ছিল, সংগঠনের জন্য কে কতটা সময় দিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক কার্যক্রমে কার সম্পৃক্ততা রয়েছে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও দাবি-দাওয়ার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তাদের নেতৃত্বে আনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে দীর্ঘ সময় কমিটি না থাকার বিষয়ে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, তাড়াহুড়ো করে নেতৃত্ব ঘোষণা না করে সাংগঠনিকভাবে কার্যকর একটি কাঠামো তৈরি করতেই সময় নেওয়া হচ্ছে। শুধু পদ বণ্টন নয়, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম একটি দল গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।
তবে তৃণমূলের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে কর্মীদের মধ্যে আগ্রহ কমে যেতে পারে। যারা নিয়মিত মাঠে ছিলেন, তাদের অনেকেই ভবিষ্যতে সাংগঠনিকভাবে নিজেদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন। আবার নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রতা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি ছাত্রসংগঠনের শক্তি শুধু আন্দোলনের সময় রাজপথে উপস্থিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মকা-, নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতাই দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনের ভিত্তি মজবুত করে। তাই দীর্ঘ সময় নেতৃত্বহীন থাকা যেকোনো ছাত্রসংগঠনের জন্য সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
দুই বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, এবার যেন আর নতুন কোনো সময়সীমার ঘোষণা নয়, বাস্তবেই আসে কাক্সিক্ষত কমিটি। আন্দোলনে যারা মাঠে ছিলেন তাদের মূল্যায়ন, নতুনদের সুযোগ এবং জেলা-মহানগরের মধ্যে সাংগঠনিক ভারসাম্যÑসবকিছুর সমন্বয়ে একটি কার্যকর নেতৃত্ব গড়ে উঠবে, এমন প্রত্যাশাই এখন নারায়ণগঞ্জ ছাত্রদলের তৃণমূলে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ঘোষিত সেই কমিটি শুধু নেতৃত্বের শূন্যতাই পূরণ করবে, নাকি নারায়ণগঞ্জ ছাত্রদলের রাজনীতিতে নতুন গতি তৈরি করবে এখন সেটিই দেখার বিষয়।

































আপনার মতামত লিখুন :