প্রিয় দলের জন্য ভক্তদের কান্ড-কীর্তির শেষ নেই। ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে বাংলাদেশেও ফুটবল প্রেমীরা উন্মাদনায় ব্যস্ত। বাংলাদেশের বেশীরভাগ মানুষ সাধারণত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থক। এর মাঝে ব্যাতিক্রমি এক ভক্তের খোঁজ মিলেছে নারায়ণগঞ্জে। নেদারল্যান্ড ফুটবল দলকে ভালোবেসে ২ মাসের জন্য নিজ কক্ষই ভাড়া নিয়েছেন স্ত্রী সন্তানদের কাছ থেকে। এ বিষয়ে করেছেন লিখিত চুক্তিও। ভাড়া নেয়া ওই কক্ষ সাজিয়েছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে যেন নেদারল্যান্ডস ফুটবল দলেরই ছোট্ট এক সংগ্রহশালা।
জানা গেছে, চল্লিশোর্ধ মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা লস্কর পেশায় সরকারি কর্মকর্তা। স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের লাকিবাজার এলাকায় নিজেদের বসতবাড়িতে। শতব্যস্ততার মাঝেও ফুটবল খেলাকে মনে প্রাণে ভালোবাসেন। যখন প্রায় অধিকাংশের প্রিয় দল ব্রাজিল-আর্জেনটিনা সেখানে এই ফুটবল অনুরাগির প্রিয় দল হল্যান্ড। তাই নিজের মনকে আনন্দিত করার জন্যে প্রিয় দলের সকল ক্রীড়া সামগ্রী সংগ্রহ করে সেটা নিজের ঘরে সাজিয়ে রাখেন তিনি। তার পোশাক-আশাকে ফুটিয়ে তোলেন নেদারল্যান্ডকে। তবে নিজে নেদারল্যান্ড করলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা ভিন্ন দলের সাপোর্টার। তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস মিলির প্রিয় দল আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে ১৩ বছরের বড় ছেলে আমির হামজা শ্রেষ্ট এবং ৬ বছরের সাদ আব্দুল্লাহ তায়েব জার্মানি দলের চরম ভক্ত। তারপরেও তারা এই হল্যান্ডের এই অন্ধ ভক্তকে কোন বাধা দেন না তার ভালবাসার প্রকাশে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাড়ির ছাদে রয়েছে নেদারল্যান্ডস, জার্মানিসহ বিভিন্ন দলের পতাকা। ঘরের একটি কক্ষের প্রবেশ দ্বারও সাজানো হয়েছে নেদারল্যান্ডের নামে। কক্ষটির দেয়ালে দেয়ালে কমলা রঙের ছোঁয়া। চোখে পড়বে নেদারল্যান্ডসের জার্সি, পতাকা, স্মারক আর ফুটবল ইতিহাসের নানা নিদর্শন। বাসস্থানের ফ্লোরে ভিতরে ৮ ফুট ও ১২ ফুটের আকর্ষণীয় স্টেডিয়াম তৈরি করেছেন। ঘরে সংরক্ষণ আছে ১৯৭৪ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সকল রকমের ৯০টি জার্সি ও টি শার্ট। আছে হল্যান্ডের কাপ (কালো, নীল), প্রাক্টিস কিট, হল্যান্ডের পানির পট, হল্যান্ডের পানির মগ, হল্যান্ডের প্লেট, হল্যান্ডের বল, হল্যান্ডের চাবির রিং সহ অনেক টুকিটাকি জিনিস। এক কথায় এ যেন এক টুকরু হল্যান্ড।
বদরুদ্দোজা লস্কর বলেন, ফুটবলে সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ডিফেন্স। বর্তমান দলে ভ্যান ডাইক এর মতো বিশ্বসেরা ডিফেন্ডার আছে, সাথে আছে নাথান আকে, ড্যাম্ফ্রাইস, কুইন্টন টিম্বার এর মতো বিশ্বের অন্যতম ডিফেন্ডাররা। মাঝমাঠে আছে বিশ্বসেরা ফ্রাংক ডি ইয়ং, ডি রুন, কোমপেয়ারস, ক্লুইভার্ট এর মতো খেলোয়াড়রা স্ট্রাইকিং এ আছে মেনফিস ডিপেই, গেগপো, নুয়া ল্যাং।
বাল্যকাল থেকে ফুটবলের সাথে পরিচিত তিনি। খেলা বুঝতে শেখা বা উপভোগ করতে পারার অল্প কিছুদিন পর ১৯৮৮ সালে হল্যান্ড ফুটবল দলকে দেখেছিলেন ইউরো কাপ জয়ী হতে। তখন সবেমাত্র মাত্র ৮ বছর বয়স ছিলো তার। সেদিন হল্যান্ডের খেলোয়াড় রুড খুলিতের ইউরো কাপ উঁচিয়ে ধরার দৃশ্য আজ অব্দি আবেগতাড়িত করে বেড়ায় তাকে। ঠিক তখন থেকে রুড খুলিত তার প্রিয় খেলোয়াড়ে পরিণত হন। শুধু রুড খুলিত-ই নন, মার্কো ভ্যান বাস্তেন, ফ্রাংক রাইকার্ড, রোনাল্ড কোয়েম্যান রোনাল্ড ডি বোয়েরদের খেলা বেশ ভাল লাগতো তার।
লস্কর জানান, সর্বশেষ ২০১০ সালে আর জে রোবেন, ভ্যান পার্সি, ওয়েসলি ¯øাইডাররা হল্যান্ড দলকে ফাইনালে তুললেও স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারার স্মৃতি ভুলতে পারেননি।
লস্কর আরো জানান, যখন বিশ্বকাপ খেলা আসে তখন তিনি তার কক্ষটি নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন জার্সিসহ নানা সামগ্রী দিয়ে সাজান। এজন্য কক্ষটিতে অনেক কাজ করতে হয়। এতে যাতে স্ত্রী সন্তানরা কোন ধরনের আপত্তি করতে না পারে এজন্য তিনি স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে একটি লিখিত চুক্তিও করেছেন। স্ত্রীর কাছ থেকে দুই মাসের জন্য ভাড়াও নিয়েছেন।
বদরুদ্দোজা লস্করের বড় ছেলে জানান, তাদের বাবা ছোটবেলায় ইউটিউবে বিভিন্ন দলের খেলা দেখিয়েছে। ওেইসব খেলা দেখে তার কাছে জার্মানির খেলা সবচেয়ে বেশী ভাল লেগেছে। তাই সে জার্মানির সাপোর্ট করে। ছোট ভাই তাকে দেখে জার্মানির সাপোর্ট করে। কয়েকদিন আগে তার বাবা মায়ের সঙ্গে চুক্তি করে যাতে তারা দুই ভাইও সাক্ষী হয়েছে। তার বাবার নেদারল্যান্ডের প্রতি আবেগ দেখে তাদের ভালই লাগে।
বদরুদ্দোজা লস্করের স্ত্রী জানান, তার স্বামী বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা আসলে নেদারল্যান্ডের জন্য ভালবাসায় একটি কক্ষকে নিজের মতো করে সাজায়। এবারও সেটা করেছে। এজন্য সে আমাদের সঙ্গে একটি চুক্তিও করেছে। ২ মাসের জন্য ভাড়া নিয়েছে। নেদারল্যান্ডের জন্য তার এই পাগলামো আমরা ইনজয় করি। অনেক সময় আমরা তার সঙ্গে খুনসুটিও করি। বিশ্বকাপে কার পছন্দের দল নিবে সেটা নিয়ে তাদের মধ্যে খুনসুটিও হয় বলে জানান।









































আপনার মতামত লিখুন :