নারায়ণগঞ্জে যেন দিন দিন কিশোর অপরাধ বাড়তে শুরু করছে। কয়েকদিন পর পর কিশোরদের নানা অপকর্মে জড়িত হওয়ার খবর প্রচারিত হচ্ছে। সেই সাথে পুলিশের জালে ধরা পড়ছে। তবে এসকল কিশোরদের বেশিরভাগ অংশই নারায়ণগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা নয়। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে শহরে ভাড়া বাসায় থেকে অপরাধ কর্মকা-ে জড়িয়ে যাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে এসকল সংঘবদ্ধ কিশোররা একেবারে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছেন। তাদের যেন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর তারা অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছেন।
সবশেষ একটি ঘটনা নারায়ণগঞ্জজুড়ে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ১১ বছর বয়সী শিশু হোসাইনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তারই সমবয়সী ও কিশোর বন্ধুদের একটি দল। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকা-ের পেছনে উঠে এসেছে “জেল খাটা কেমন” কৌতুহল। আর সেই কৌতুহল থেকেই তারা পরিকল্পিতভাবে এই নৃশংস অপরাধ সংঘটিত করে। জেলার পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মুন্সি সংবাদ সম্মলনে হত্যার রহস্য উন্মোচন করেন।
এসময় তিনি বলেন, নিহত হোসাইন তার বাবার সঙ্গে শহরে ফুল বিক্রি করত। গত ১৮ এপ্রিল সকাল থেকে সে নিখোঁজ ছিল। পরবর্তীতে জানা যায় ফতুল্লা রেলস্টেশন সংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়মিত আড্ডা দেওয়া ও মাদক সেবনকারী কয়েকজন কিশোর তাকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে হত্যা করে।
পুলিশ সুপার আরো জানান, ঘটনার দিন সাইফুল, তানভীর ও ইউনুস নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে "খুন করলে জেলে যেতে হয়" আর সেই অভিজ্ঞতা নেওয়ার ইচ্ছা থেকেই তারা হত্যার পরিকল্পনা করে। পরে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া হোসাইনকে টার্গেট করে গাঁজা সেবনের প্রলোভন দেখিয়ে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিল তাদের আরও তিন বন্ধু রাহাত, হোসাইন ও ওমর। পরে সবাই মিলে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে পরিত্যক্ত ওই বাড়িতে লাশ ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
হোসাইনের লাশ উদ্ধারের পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রথমে ইয়াসিনকে গ্রেফতার করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে আরও পাঁচ কিশোরকে আটক করা হয়।
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় মোট ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জন এজাহারভুক্ত, তদন্তে আরও ২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। পরে মামলার এজাহারনামীয় ১ নাম্বার আসামী ইয়াসিন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। হত্যায় ব্যাহৃত ধারালো ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরে ওরা ভাসমান। কোনো আত্মীয়ের বাসায় থাকে কিংবা কোনো মেসবাড়িতে থাকে। এদের বেশিরভাগই জামালপুর, নাটোর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, মাগুরা, যশোর ও রংপুর থেকে আসা। তাদের বসবাস বেশি শিল্প এলাকায়। তাদের বয়স ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। তারা কর্মজীবী। কেউ প্রিন্টিং কারখানা, কেউ গার্মেন্টস আবার কেউ ডাইং কারখানায় চাকরি করে। দলবেঁধে চলতে পছন্দ করে এবং চলে। সপ্তাহ শেষে একটি দিন ওরা দলবেঁধে ঘুরে বেড়ায়। আর এই সময়ে তারা বিভিন্ন অপরাধ কর্মকা-ের সাথে জড়িয়ে যায়।
এর আগে নারায়ণগঞ্জ শহরের ইসদাইর এলাকার হত্যা সহ একাধিক মামলার আসামি কিশোর গ্যাং প্রধান ইভনকে (৩০) কুপিয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। গত ৭ সেপ্টেম্বর ইসদাইরে ওসমানী পৌর স্টেডিয়ামের পূর্ব দিকের সড়কে এই ঘটনা ঘটে। নিহত কিশোর গ্যাং লিডার ইভন ফতুল্লা ইসদাইর এলাকার সাইফুল ইসলামের ছেলে। সাইফুল, শফিকুল ও বাবু নামের তিন সহোদরের হাত পায়ের রগ কেটে দেওয়ার জের ধরে এই ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
এর আগে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে ইয়াছিন (১৬) নামের এক কিশোর নিহত হয়েছিলো। ২০২৫ সালের ৩ মে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের এনায়েতনগর এলাকার লাকিবাজার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত কিশোর ওই এলাকার শহিদুল ইসলামের ছেলে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দর করে শনিবার সকালে এনায়েতনগর এলাকায় দুই কিশোর গ্রুপের ঝামেলা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীসময় সেই ঝামেলাকে কেন্দ্র করে রাতে দুই গ্রুপ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষকালে ওসমান নামের এক তরুণের ছুরিকাঘাতে ইয়াছিন আহত হয়। পরে ঘটনাস্থল থাকা মানুষজন তাকে নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শষ্যাবিশিষ্ট খানপুর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এভাবে একের পর এক কিশোরদের দ্বারা হত্যাকা- ঘটে যাচ্ছে। এই কিশোরদের সাথে অন্যান্য সংঘবদ্ধ চক্র জড়িয়ে অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়িয়ে তুলছে।



































আপনার মতামত লিখুন :