News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩

জিয়া হলের হারানো জৌলুস ফেরাতে মাঠে বিএনপি


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১০:০৬ পিএম জিয়া হলের হারানো জৌলুস ফেরাতে মাঠে বিএনপি

নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়ায় দাঁড়িয়ে থাকা একসময়ের ঐতিহ্যবাহী শহীদ জিয়া হল আজ যেন সময়ের নির্মম অবহেলার প্রতীক। একসময় রাজনৈতিক সভা, সাংস্কৃতিক আয়োজন, নাগরিক সংলাপ ও জাতীয়তাবাদী চেতনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই মিলনায়তন এখন জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত এবং ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ভাঙাচোরা দেয়াল, নষ্ট অবকাঠামো আর অবহেলার চিহ্ন বহন করা জিয়া হলকে ঘিরে নতুন করে সক্রিয় হয়েছে বিএনপি। দলটির স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ের নেতারা এখন একযোগে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির পুনর্নিমাণে সোচ্চার।

জাতীয় সংসদ থেকে রাজপথ, সাংগঠনিক কর্মসূচি থেকে সাংস্কৃতিক সমাবেশ সব জায়গাতেই জিয়া হলের পুনর্নিমাণ এখন নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অন্যতম আলোচিত দাবি। দলটির নেতারা মনে করছেন, এটি শুধু একটি ভবন পুনর্নিমাণের প্রশ্ন নয়, বরং জাতীয়তাবাদী ইতিহাস, রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধারের বিষয়।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম জিয়া হল পুনর্নিমাণের দাবি তুলে ধরেন। এর ধারাবাহিকতায় ২৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানও সংসদে একই দাবি জানিয়ে বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনেন।

শুধু সংসদেই নয়, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুও একাধিকবার বিভিন্ন সভা-সমাবেশে জিয়া হল পুনর্নিমাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তাদের ভাষ্য, নারায়ণগঞ্জের ঐতিহাসিক পরিচয় ও জাতীয়তাবাদী চেতনার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এই স্থাপনাটি। ফলে এটিকে ধ্বংস হতে দেওয়া মানে একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্মারক হারিয়ে ফেলা।

জিয়া হল ইস্যুতে নতুন মাত্রা যোগ করেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক মুস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপু। যদিও তার নির্বাচনী এলাকা রূপগঞ্জ, তারপরও নারায়ণগঞ্জ শহরের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জিয়া হল পুনর্নিমাণের আবেদন জানান।

তার এই পদক্ষেপ স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিএনপির নেতারা বলছেন, দলীয় ও আদর্শিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি বিষয়টিকে বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

দিপু ভূইয়ার এ উদ্যোগের পর বিষয়টির রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ২৫ এপ্রিল জিয়া হল প্রাঙ্গণে আয়োজিত পাট পণ্যজাত মেলায় উপস্থিত বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলমও প্রকাশ্যে বলেন, এমপি দিপু ইতোমধ্যে পুনর্র্নিমাণের জন্য ডিও লেটার দিয়েছেন এবং অন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যদেরও একই উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, বিষয়টি এখন শুধু রাজনৈতিক দাবি নয়; সরকারি পর্যায়েও আলোচনায় এসেছে।

জিয়া হলের ইতিহাস বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৭৮ সালের ১০ মার্চ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ৬০ দশমিক ৬২ শতাংশ জমির ওপর টাউন হলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে ১৯৮১ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার এটি ‘শহীদ জিয়া হল’ নামে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ স্থাপনাটি কেবল একটি মিলনায়তন ছিল না; বরং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতীকী অবকাঠামো হিসেবেও পরিচিতি পায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে এটি দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জের জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরবর্তীতে জমি-সংক্রান্ত জটিলতা ও আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ভবনটি নানা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। তবে আদালতের রায়ে ‘শহীদ জিয়া হল’ নাম বহাল থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভবনটি ব্যবহারহীন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ অব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও অবহেলায় বর্তমানে এটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

বিএনপি নেতাদের মতে, জিয়া হল পুনর্নিমাণ মানে শুধু পুরনো একটি ভবন সংস্কার নয়; এটি নারায়ণগঞ্জে একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার সুযোগ। তারা চাইছেন, নতুনভাবে নির্মিত জিয়া হল এমন একটি বহুমুখী কেন্দ্র হোক যেখানে থাকবে আধুনিক মিলনায়তন, সাংস্কৃতিক মঞ্চ, পাঠাগার, নাগরিক সম্মেলনকেন্দ্র এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য ইতিহাসচর্চার সুযোগ।

এতে একদিকে যেমন নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদী দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হবে, অন্যদিকে শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যকর্মী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও পাবে একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম।

নারায়ণগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত হলেও আধুনিক সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। সেই জায়গা থেকে জিয়া হল পুনর্নিমাণ শহরের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জিয়া হলকে ঘিরে বিএনপির আগ্রহে রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট। দলটি চাইছে জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্যের দৃশ্যমান প্রতীকগুলোকে পুনরায় সামনে আনতে। তবে স্থানীয় নাগরিকদের বড় একটি অংশও ভবনটির পুনর্নিমাণকে রাজনৈতিক সীমার বাইরে একটি জনস্বার্থমূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।

চাষাঢ়ার মতো ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় একটি আধুনিক ও নিরাপদ সাংস্কৃতিক স্থাপনা নগরজীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে জিয়া হল এখন কেবল বিএনপির আবেগের জায়গা নয়; এটি শহরের সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও নাগরিক প্রয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে উঠছে।

স্থানীয় বিএনপি নেতারা আশাবাদী, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে। তাদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ায় দীর্ঘদিনের অবহেলিত এই স্থাপনাটি নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে। নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ জিয়া হল আবারও ফিরে পাক তার পুরনো গৌরব, তবে নতুন সময়ের উপযোগী আধুনিকতায়।