নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাতে বসার লক্ষ্যে দিন দিন হকারদের দৌরাত্ম্য যেন বেড়েই চলছে। তারা ফুটপাতে বসার দাবীতে পুরো শহরজুড়ে মিছিল করছেন। একই সাথে নিজেদেরকে বেপোরোয়া হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করছেন। ফুটপাতে বসতে দেয়া যেন তাদের অধিকার হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে। তারা জনসাধারণের ভোগান্তির কোনো ভ্রুক্ষেপ না করেই নিজেদের সুবিধার্থে ফুটপাতে বসার জন্য যেন দিন দিন মরিয়া হয়ে উঠতে চাচ্ছেন।
এরই মধ্যে ‘পুনর্বাসনের আগে হকার উচ্ছেদ চলবে না’- স্লোগানে সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেছে নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাতগুলো থেকে উচ্ছেদ হওয়া হকাররা। বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে চাষাঢ়ায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হন হকাররা। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রেখে মিছিল নিয়ে বের হন তারা। জাতীয়তাবাদী হকার ইউনিয়ন দলের নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার সভাপতি কেএম মিজানুর রহমান রনির নেতৃত্বে শতাধিক হকারদের মিছিলটি শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
একইসঙ্গে তারা শায়েস্তা খাঁ সড়কেও বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সড়কেই নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালামের বাসার সামনেও তারা পুনর্বাসনের দাবিতে স্লোগান দেন। অ্যাডভোকেট আবুল কালামের বাসার সামনে স্লোগান দিয়ে নিজেদের জানান দেয়ার চেষ্টা করেন।
এর আগে পুনর্বাসন ও নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য ফুটপাতে বসার দাবিতে আবারও বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে হকাররা। গত ২৬ এপ্রিল বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেলা হকার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে চাষাঢ়া থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু করেন হকাররা।
এ সময় তারা পুনর্বাসনের আগে হকার উচ্ছেদের বিরোধীতা করে বিভিন্ন স্লোগান দেন। একইসঙ্গে দিনের নির্দিষ্ট একটি সময় ফুটপাতে বসারও দাবি জানান। মিছিলটি নিয়ে বঙ্গবন্ধু সড়কের দুই নম্বর গেট পর্যন্ত গিয়ে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে এসে জড়ো হন হকাররা। সেখানে বক্তব্য রাখেন হকার নেতারা।
হকাররা বলেন, তাদের ফুটপাত থেকে উচ্ছেদের পর জীবিকা নিয়ে ঝুঁকির মুখে আছেন। পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসনের আগে তারা বিকেল পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ফুটপাতে বসে ব্যবসা করারও দাবি জানান।
তার আগেও নারায়ণগঞ্জ শহরের হকার পুনর্বাসনের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে হকাররা। গত ২০ এপ্রিল দুপুরে চাষাঢ়া শহীদ মিনার থেকে শুরু করে শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকার সিটি কর্পোরেশনের নগর ভবন পর্যন্ত এই বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা।
এদিন তারা সকাল থেকেই চাষাঢ়া শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকেন। সেই সাথে তারা একপর্যায়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন। বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নগর ভবনের সামনে গিয়ে তারা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। একই সাথে হকারদের পক্ষ থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। তাদের এই কর্মসূচির সাথে একাত্মতা পোষণ করেছিলেন দুই একজন বাম নেতা।
একই সাথে এদিন বিকেলে ফুটপাতে না বসার জন্য আহ্বানকারী ভলান্টিায়ারদের উপর হামলা করেছেন হকাররা। উই আর ভলান্টিয়ার্সের সদস্য ফারদিন শেখ বলেন, আমরা হকার উচ্ছেদে কাজ করে থাকি। বিকেলে কাজ করতে গিয়েছিলাম। এসময় মর্ডানের সামনে থাকা হকাররা টার্গেট করে হামলা করে। তারা হকার নামধারী গু-া। তারা আমার ছোট ভাইয়ের উপর হামলা করে তার হাত কেটে ফেলে। আর এভাবেই দিন দিন হকাররা নিজেদের বেপোরোয়া হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করে আসছেন।
তবে কয়েকদিন হকার না থাকায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। ফলে গত কয়েকদিন ফুটপাতে মানুষের চলাচল বেড়েছে। দ্রুত সময়ে হাঁটার কারণে তারা সিটি করপোরেশনের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বস্তি মনে হয় বেশিদিন স্থায়ী হচ্ছে না। নগরবাসীর ভোগান্তি আবারও শুরু হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে গত ১৩ এপ্রিল শহরের সকল সড়কের ফুটপাতের হকারদের উচ্ছেদ করে সিটি করপোরেশন। যদিও আগে থেকে ঘোষণা থাকায় সেদিন কোন হকার বসেনি। এর পর কয়েকদিন পর্যন্ত মোটামুটি শহরের ফুটপাত ছিল ফাঁকা। তবে হকাররা ফুটপাতে ফেরার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তারা বিভিন্ন জায়গায় দেন দরবার করতে থাকেন।
জানা যায়, জেলা পুলিশ প্রশাসন ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর থেকে হকারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গিয়ে ফুটপাত ফাঁকা করে দিয়েছিলো। আর প্রশাসনের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আইভী। ফলে কোন ভাবেই ফুটপাতে বসতে ব্যর্থ হয়ে আন্দোলন শুরু করেন হকাররা। এর ধারবাহিকতায় ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর মেয়র আইভীকে স্মরকলিপি প্রধান করেন। ওই সময় আইভীর বক্তব্যে পরই কঠোর হয়ে হকাররা। একের পর এক কর্মসূচি ও স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান এবং সেলিম ওসমানের কাছে যান। ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি হকারদের সমাবেশে শামীম ওসমান হকারদের বঙ্গবন্ধু সড়কে বসার জন্য পক্ষে বক্তব্য দেন। আর পরদিনই হকারা আইভীর উপর হামলা চালায়। যেখানে যুক্ত হয় শামীম ওসমানের অনুগামী নেতাকর্মীরাও। ইট পাটকেলের সঙ্গে গুলি করা হয় মেয়র আইভীকে লক্ষ্য করে। সেসময় মেয়র আইভী সহ অর্ধশতাধিক তার অনুগামী নেতাকর্মী আহত হয়। এছাড়া পরেও প্রায়শই হকারদের পক্ষেই কথা বলেন শামীম ওসমান।
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে হত্যাচেষ্টার পর পুলিশকে হত্যার চেষ্টা করেন বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে বসা হকাররা। সদর মডেল থানায় একটি মামলা করে পুলিশ। ২০২১ সালের ৯ মার্চ বিকেলে ফুটপাতে বসার দাবীতে হকাররা বিক্ষোভ করে। সেদিন পুলিশের সাথে মারামারির ঘটনা ঘটে।
হকারদের একটি অংশ জানান, তাদের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে আবার বসার চেষ্টা করছেন। তারা সেই পুরানো প্রক্রিয়ায় একই সাথে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক সহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি প্রদান করবেন। পর্যায়ক্রমে তারা একের পর এক কর্মসূচি গ্রহণ করবেন। এভাবে একের পর এক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসলে তারা আবারও ফুটপাতে বসে যাবেন। পাশাপাশি সামনে ঈদুল আজহা রয়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করেও তারা একটা সুযোগ নেয়ার চেস্টা করবেন। সেই সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও মানবিক দিক বিবেচনায় সহনশীল হয়ে যাবেন।
নগরবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসিন্দাদের ভোগান্তির অপর নাম হকার। এখানকার হকাররা প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান সড়কের ফুটপাতগুলো দখলে রাখে। ফুটপাতের পাশাপাশি রাস্তাও দখলে নেয়। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হয়ে আসছেন শহরবাসী। কোনোভাবেই যেন এই হকারদের দমানো যাচ্ছে না। তাদের সংখ্যা ব্যাপক হয়ে গিয়েছিলো।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে হকাররা যেন লাগামছাড়া হয়ে পড়েছেন। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত পুরো সড়কই দখল করে রাখছেন। এতে করে নগরবাসী অসহনীয় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
নতুন প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের কাছে নগরবাসীর প্রত্যাশা তিনি যেন নগরবাসীকে অতিদ্রুত ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেন।


































আপনার মতামত লিখুন :