News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শুক্রবার, ০১ মে, ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩

হকারমুক্ত শহরে টানা বৃষ্টিতেও নেই জলাবদ্ধতা


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ১১:০৮ পিএম হকারমুক্ত শহরে টানা বৃষ্টিতেও নেই জলাবদ্ধতা

একসময় সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু সমান পানিতে ডুবে যেত নারায়ণগঞ্জ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার ও জনবহুল মোড়গুলো। চাষাঢ়া, গলাচিপা, ২নং রেলগেইট কিংবা শহরের অন্যান্য ব্যস্ত এলাকায় বৃষ্টি মানেই ছিল জনদুর্ভোগ, যানজট, জলাবদ্ধতা আর সীমাহীন ভোগান্তি। কিন্তু চলতি মৌসুমে টানা দুদিনের বৃষ্টির পরও শহরের প্রধান প্রধান সড়কে উল্লেখযোগ্য জলাবদ্ধতা না থাকায় নগরবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে স্বস্তি। আর এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে সম্প্রতি পরিচালিত হকার উচ্ছেদ অভিযান।

গত ১৩ এপ্রিল থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে শুরু হয় হকার উচ্ছেদ কার্যক্রম। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতজুড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বর্জ্যের কারণে শুধু পথচারীদের চলাচলই ব্যাহত হচ্ছিল না, বরং শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাও ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ফুটপাতের পাশে জমে থাকা পলিথিন, প্লাস্টিক ও নানা ধরনের আবর্জনা বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে গিয়ে জমে মুখ বন্ধ করে দিত। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে শহরজুড়ে তৈরি হতো জলাবদ্ধতা।

শহরবাসীর ভাষ্য, হকার উচ্ছেদের পর শুধু রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে এমন নয়; বরং পুরো নগর ব্যবস্থাপনাতেই দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। ফুটপাত পরিষ্কার থাকায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয়েছে, ড্রেনের মুখ খোলা থাকছে এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেতে পারছে।

বিশেষ করে চাষাঢ়া, যা নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম ব্যস্ততম কেন্দ্র, সেখানে আগে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হতো। একই অবস্থা ছিল গলাচিপা ও ২নং রেলগেইট এলাকাতেও। ব্যবসায়ী, পথচারী, শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষদের দুর্ভোগ ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। কিন্তু এবার টানা বৃষ্টির মধ্যেও সেই পরিচিত জলাবদ্ধতার চিত্র অনুপস্থিত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে নগরবাসীর বড় একটি অংশ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বহুদিন পর প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ নগরজীবনে বাস্তব ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

শহরের বাসিন্দাদের অনেকে মনে করছেন, শুধু হকার উচ্ছেদ নয় এটি মূলত একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনার সূচনা। কারণ, অবৈধ দখলমুক্ত ফুটপাত শহরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্যও রক্ষা করছে।

নারায়ণগঞ্জ শহরের জলাবদ্ধতা সমস্যা নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে বর্ষা মৌসুম এলেই শহরের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ছিল। অনেকেই এ সমস্যার জন্য অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে দায়ী করলেও বাস্তবে ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়াই ছিল অন্যতম বড় কারণ।

ফুটপাতঘেঁষা হকারদের দোকান থেকে প্রতিদিন উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা যথাযথভাবে অপসারণ না হওয়ায় সেগুলো বৃষ্টির সময় ড্রেনে গিয়ে জমা হতো। ফলে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যেত। এতে নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, যান চলাচল ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ত।

হকার উচ্ছেদের ফলে শহরের প্রধান সড়কগুলো এখন তুলনামূলক বেশি খোলামেলা ও পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। পথচারীরা স্বস্তিতে হাঁটতে পারছেন, যানবাহনের চলাচলেও কিছুটা গতি ফিরেছে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় নাগরিকদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে নারায়ণগঞ্জও জলাবদ্ধতামুক্ত শহরে পরিণত হতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শহরের টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দখলমুক্ত ফুটপাত, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সচেতনতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক পরিবর্তন সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।

যদিও হকার উচ্ছেদ অভিযান নগর ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তবুও জীবিকার প্রশ্নে হকারদের পুনর্বাসন বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেকের মতে, দীর্ঘমেয়াদে শহরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখতে হলে একদিকে যেমন ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে হবে, অন্যদিকে বিকল্প পুনর্বাসন পরিকল্পনাও জরুরি। কারণ, নগর শৃঙ্খলা ও জীবিকার ভারসাম্য রক্ষা করেই একটি মানবিক ও কার্যকর নগরব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

নগরবাসীর প্রধান প্রত্যাশা এখন একটাই, এই ইতিবাচক পরিবর্তন যেন সাময়িক না হয়। অতীতে বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও কিছুদিন পর আবার ফুটপাত দখলের অভিযোগ উঠেছে। তাই এবার নগরবাসী চাইছেন, প্রশাসন যেন কঠোর অবস্থান ধরে রাখে এবং পরিচ্ছন্ন, জলাবদ্ধতামুক্ত শহর গড়ার উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখে।

টানা বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতামুক্ত শহরের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা নারায়ণগঞ্জবাসীকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে সমস্যা শুধু প্রকৃতির নয়, ব্যবস্থাপনাগতও। সঠিক উদ্যোগ, কঠোর মনিটরিং এবং নগর পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োগ থাকলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব। নারায়ণগঞ্জ এখন দেখছে, ফুটপাত দখলমুক্ত হলে শুধু পথচারীর পথই খোলে না, উন্মুক্ত হয় জলাবদ্ধতামুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য শহরের সম্ভাবনাও।