News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩

কাজে আসছে না ১৬ কোটি টাকার স্ট্রিট লাইট প্রকল্প


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ১০:০৭ পিএম কাজে আসছে না ১৬ কোটি টাকার স্ট্রিট লাইট প্রকল্প

যান চলাচল সহজ করতে ছয় লেনে উন্নীত হওয়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড এখন রাত নামলেই পরিণত হচ্ছে আতঙ্কের সড়কে। শত কোটি টাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ১৬ কোটি টাকার স্ট্রিট লাইট প্রকল্প, ৭৪৮টি সড়কবাতি সবকিছু থাকলেও বাস্তবে দীর্ঘ ৮ কিলোমিটার সড়কের বড় অংশ ডুবে থাকে ঘন অন্ধকারে। এর ফলে দুর্ঘটনা, ছিনতাই, চুরি, মাদক বাণিজ্য এবং জননিরাপত্তাহীনতা এখন এই সড়কের নিত্যসঙ্গী। সরকারি দপ্তর, আদালত, প্রশাসনিক কার্যালয় ও শিল্পাঞ্চল ঘেরা নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সংযোগপথে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও নিরাপত্তা মিলছে না কেনো।

জানা যায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত লিংক রোডটি জেলা শহরকে রাজধানীসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত করেছে। কয়েক বছর আগে একলেনের এই সড়কে সড়কবাতি ও সাইন সিগন্যাল স্থাপনে ধরা হয় ১৬ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, প্রকল্পের বড় অংশ এখন কার্যত অকার্যকর।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা পরিষদ, রেজিস্ট্রি অফিস, আদালতপাড়া, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিস, কারাগার, এলজিইডি, গণপূর্তসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার সামনের সড়কেও রাত হলেই নেমে আসে অন্ধকার। সড়কের মাঝখানে ল্যাম্পপোস্ট থাকলেও অধিকাংশ স্থানে বাতি জ্বলে না। বিশেষ করে জেলা পরিষদ ও রেজিস্ট্রি অফিসের সামনের ইউটার্ন এলাকাকে স্থানীয়রা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

সেই সাথে ঢাকার পাশের এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্পকারখানা ও নতুন বসতি। ফলে বিদ্যমান সড়কে যানবাহন সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। গত কয়েক বছরে নারায়ণগঞ্জ জেলা সদরে বেসরকারি হাসপাতাল,বেসরকারি ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানসহ বড় আকারের বেসরকারি আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এছাড়া লিংক রোডের উভয় পাশে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টসসহ নানা শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। যে কারণে লিংক রোডটি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সড়কবাতি না থাকায় রাতের বেলায় সড়কটিতে যাতায়াত করাটা ভয়ানক হিসেবে আবির্ভাব হয়ে থাকে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কবাতির মূল বৈদ্যুতিক তার বারবার চুরি হয়ে যাওয়ায় পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে তার চুরি করছে। নতুন করে তার প্রতিস্থাপন করা হলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও তা উধাও হয়ে যাচ্ছে। ফলে সংস্কার হচ্ছে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

চাষাঢ়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে ইউটার্ন এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। দিনের বেলাতেই যেখানে ঝুঁকি থাকে, সেখানে রাতে অন্ধকার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক জোনের সামনে যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায় থাকবে।

শিবুমার্কেট এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, গণমাধ্যমে কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের কথা জানা গেলেও বাস্তবে জনগণ তার সুফল পাচ্ছে না। তার ভাষায়, “বাতি আছে, খুঁটি আছে, কিন্তু আলো নেই। ফলে ছিনতাইকারী আর অপরাধীদের জন্য পুরো সড়ক যেন নিরাপদ ক্ষেত্র হয়ে গেছে।”

শুধু স্থানীয় বাসিন্দাই নন, ব্যবসায়ী মহলেও রয়েছে তীব্র উদ্বেগ। নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতি মো. আবু জাফর বলেন, শিল্পাঞ্চল, গার্মেন্টস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য লিংক রোড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অন্ধকারের সুযোগে ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীরা প্রায়ই ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। তার মতে, কেবল লাইট লাগিয়ে দায়সারা সমাধান নয়, অপরাধচক্র শনাক্ত করে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জুনে সড়কবাতির সংযোগ চালুর পরপরই সোর্স লাইনের তার চুরি শুরু হয়। একাধিকবার নতুন তার বসানো হলেও একই ঘটনা ঘটেছে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগ নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম জানান, প্রতিবারই চুরির ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়েছে। পুলিশকে জানানো হয়েছে; কিন্তু অপরাধ বন্ধ হয়নি। তার ধারণা, ছিনতাইকারী ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সঙ্গে এই চুরির যোগসূত্র থাকতে পারে। এতে শুধু জননিরাপত্তাই বিঘিœত হচ্ছে না, সরকারি অর্থেরও বারবার অপচয় হচ্ছে। আমরা দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করবো।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, লোকজন তার চুরি করে নিয়ে যায়। আবার তার লাগালে আবার চুরি করবে। আমরা টেকনিক্যাল কমিটি করে দিয়েছি। কোন কোন পয়েন্টগুলোতে চুরি হয় এটা সনাক্ত করার জন্য। প্রায় ৮ কিলোমিটার রাস্তা সিসি ক্যামেরার আওতায় কঠিন কাজ। আমাদের ওইরকম বাজেট নেই। সমাজের বিত্তশালীদের কাছে অনুরোধ করেছি। চুরিপ্রবণ এলাকাগুলোতে সিসি ক্যামেরা লাগানো হবে। আমাদের কার্যক্রম চলছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই এই সমস্যার সমাধান ঘটবে।