অসাবধানতা, গ্যাস লাইনের ত্রুটি, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট ও অব্যবস্থাপনার কারণে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ যেন ধীরে ধীরে বিস্ফোরণের ঝুঁকিপূর্ণ শহরে পরিণত হচ্ছে। একের পর এক গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রতিনিয়ত আহত হচ্ছেন মানুষ, ঝরছে প্রাণ। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকাগুলোতে পুরনো গ্যাসলাইন, অবৈধ সংযোগ ও সচেতনতার অভাব বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর নগরজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে অসাবধানতা ও নিরাপত্তা বিধি না মানার প্রবণতা। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, তিতাস গ্যাসের পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ পাইপলাইন সংস্কারে দীর্ঘদিনের গাফিলতি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ফলে ছোট একটি গ্যাস লিকেজও মুহূর্তেই বড় বিস্ফোরণে রূপ নিচ্ছে।
সবশেষ গত দুদিনে ফতুল্লায় পরপর দুটি গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সোমবার (১১ মে) সকালে সদর উপজেলার কুতুবপুরের লাকি বাজার এলাকায় একটি টিনশেড বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানান, ভোরে ঘরের ভেতরে জমে থাকা গ্যাস থেকে হঠাৎ বিস্ফোরণ হয়। এতে দরজা-জানালা উড়ে যায় এবং একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের ঢাকায় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে।
এর মাত্র একদিন আগে ফতুল্লার গিরিধারা এলাকায় আরেকটি বসতবাড়িতে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় একই পরিবারের পাঁচজন দগ্ধ হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সবজি বিক্রেতা কালাম মারা যান। পরপর দুটি ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন আশপাশের বাসিন্দারা। অনেকেই অভিযোগ করছেন, বিভিন্ন এলাকায় দিনের পর দিন গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলেও কার্যকর উদ্যোগ নেয় না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তবে নারায়ণগঞ্জে গ্যাস বিস্ফোরণের ইতিহাস নতুন নয়। গত বছরের ২৩ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জের রনি সিটি সংলগ্ন মুড়ি ফ্যাক্টরি এলাকায় ঘটে জেলার অন্যতম ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা। একটি পরিবারের নয়জন সদস্য দগ্ধ হন। পরবর্তীতে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে মারা যান সাতজন। নিহতদের মধ্যে এক মাস বয়সী শিশু ইমাম উদ্দিনও ছিল। পুরো ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে আসে এলাকায়।
এর চারদিন পরই নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অ্যাম্বুলেন্সে সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আবারও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে দগ্ধ হন চালক ও এক পথচারী।
এছাড়া গত বছরের মার্চে সিদ্ধিরগঞ্জের ধনকুন্ডা এলাকায় একটি বাড়িতে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ আটজন দগ্ধ হন। অক্টোবর মাসে রূপগঞ্জে টিনশেড ঘরে জমে থাকা গ্যাসে মশার কয়েল ধরাতে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। একই মাসে সিদ্ধিরগঞ্জের দক্ষিণ কদমতলীতেও গ্যাস বিস্ফোরণে দগ্ধ হন এক নারী। নভেম্বর মাসে সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর এলাকায় গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে সাত শ্রমিক আহত হন।
একটির পর একটি দুর্ঘটনা ঘটলেও নারায়ণগঞ্জে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিট বা বিশেষায়িত দগ্ধ চিকিৎসা কেন্দ্র। ফলে বিস্ফোরণে আহত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়। যানজট ও সময়ক্ষেপণের কারণে অনেক রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে। স্থানীয় সরকারি হাসপাতালগুলোতেও দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
নগরবাসীর দাবি, শুধু সচেতনতার কথা বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাসলাইন দ্রুত পরিবর্তন, নিয়মিত মনিটরিং এবং অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জে জরুরি ভিত্তিতে একটি আধুনিক বার্ন ইউনিট স্থাপন করতে হবে। তা না হলে প্রতিনিয়ত এমন দুর্ঘটনায় আরও প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যাবে।
তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় গ্যাসের চাপের তারতম্য ঘটে এবং পুরনো লাইনের কারণে বিভিন্ন স্থানে লিকেজ তৈরি হয়। তবে ধাপে ধাপে পাইপলাইন সংস্কারের কাজ চলছে বলেও দাবি তাদের।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফীন বলেন, অধিকাংশ বিস্ফোরণের ঘটনায় অসাবধানতা একটি বড় কারণ। পুরনো গ্যাসলাইন, বন্ধ কক্ষে জমে থাকা গ্যাস এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে উদাসীনতার কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। তিনি সবাইকে গ্যাস ব্যবহারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসের গন্ধ পেলেই দ্রুত জানালা-দরজা খুলে দেওয়া, বৈদ্যুতিক সুইচ অন-অফ না করা এবং দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। কারণ সামান্য অসাবধানতাই মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারে বহু মানুষের জীবন।


































আপনার মতামত লিখুন :