নারায়ণগঞ্জে আলেম ওলামাদের রাজনীতিতে এক সময়ে নিজেকে অপরিহার্য করে তোলা ফেরদাউসুর রহমানের অবস্থান ক্রমশ খর্ব হতে শুরু করেছে। হেফাজত ও ওলামা পরিষদের পৃথক দুটি কর্মসূচী তাঁকে ছাড়াই হয়েছে। অথচ কয়েক বছর আগেও ফেরদাউস ছাড়া হেফাজত, জমিয়ত ও ওলামা পরিষদ ছিল অকার্যকর এমনটা মনে করা হতো।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও নারায়ণগঞ্জ উলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেছেন, নতুন করে আবার সবাইকে আহ্বান করে যারা আমাদের সাথে এবং হেফাজতের সাথে দৃষ্টতা দেখিয়ে বেয়াদবি করেছে এদেরকে সকলকে মাইনাস করে তাদের সকলকে নিয়ে একটা সুন্দর মজবুত কমিটি বানানোর জন্য ইচ্ছা করেছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের কমিটি আবার আগের অবস্থানে নিয়ে আসবো।
বুধবার (৬ মে) বিকালে শাপলা চত্বরে গণহত্যা ও ৬ মে নারায়ণগঞ্জের মাদানীনগরে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের বিচার বাস্তবায়নে করণীয় শীর্ষক আলোচনা সভা ও শহীদদের মাগফিরাত কামনায় এক দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রশ্নের উত্তরে এসব কথা বলেন। এদিন শহরের ঐতিহাসিক ডিআইটি মসজিদের দ্বিতীয় তলায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর উলামা পরিষদের ব্যানারে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেন, আমি আমার সিদ্ধান্তের উপর অটল; বেয়াদব নিয়ে কোনোদিন কাজ করবো না। করি নাই করবো না। যেদিন সভার আহ্বান করা হবে ৫ থানার উলামায়ে কেরাম আসবেন। তাদের রায়ের উপর নির্ভর করে কমিটি করবো। নারায়ণগঞ্জকে আবার নতুন করে উজ্জীবীত করবো।
এর আগের দিন ৫ মে একটি রেস্টুরেন্টে মহানগর হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে একটি দোয়া ও সভার আযোজন করা হয়। সেখানেও ফেরদাউস ছিলেন না।
হেফাজত নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালিন সময়ে তৎকালিন মহানগর হেফাজত ইসলামের সভাপতি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান ও তার অনুসারিরা শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতেন। সেই সাথে তাদের অনুসারীদের সাথেও মাওলানা ফেরদাউসের ভালো সম্পর্ক ছিলো। বিভিন্ন সময় ওসমানদের স্বার্থ আদায়ে মাওলানা ফেরদাউস হেফাজতের নেতাকর্মীদের নিয়ে কর্মসূচি পালন করতেন।
বিভিন্ন সময় হেফাজত ইসলামের নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হলেও ফেরদাউস থাকতো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান মহানগর হেফাজত ইসলামকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাবস্থায় এ নিয়ে কেউ কিছু বলতেন না। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই ফেরাদউসকে নিয়ে হেফাজত ইসলামের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। সেই ক্ষোভের সূত্র ধরেই এবার তাকে মহানগর হেফাজতের একক নেতৃত্বে চাননি একটি অংশ।
২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে হেফাজতে ইসলামের মিছিলে দুই গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এদিন জুমআর নামাজের পর শহরের ডিআইটি কেন্দ্রীয় রেলওয়ে জামে মসজিদের সামনে এই ঘটনা ঘটে। প্রায় মিনিট দশেক ধরে হেফাজতের নেতাকর্মীদের মধ্যে হৈ চৈ ও হাতাহাতি চলে। পরে সিনিয়ররা নেতারা বার বার অনুরোধ করলে থামে। তবে প- হয়ে যায় পূর্ব ঘোষিত বিক্ষোভ মিছিল। পরবর্তীতে অপর একটি গ্রুপ মিছিল করে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
কিন্তু এসকল সমস্যার সমাধান না করেই নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজত ইসলামের নতুন কমিটি ঘোষণা করে দেয়া হয়। নারায়ণগঞ্জ হেফাজতে ইসলামের দুইজন নায়েবে আমীর থাকলেও তাদের একজনও কমিটি ঘোষণার সময়ে তারা কেউই ছিলেন না। সেই সাথে হেফাজতের একটি অংশের নেতাকর্মীরা এই কমিটিকে মেনে নেননি। তারা প্রত্যাখানের ঘোষণা দেন।
২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় শহরের বাগে জান্নাত মসজিদের দ্বিতীয় তলায় প্রতিনিধি সম্মেলনের মধ্য দিয়ে হেফাজতে ইসলাম সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব এই কমিটি ঘোষণা করেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফজত ইসলামের কমিটিতে সভাপতি হিসেবে রয়েছেন মুফতি মনির হোসাই কাসেমী এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন এবিএম সিরাজুল মামুন। সেই সাথে মহানগর হেফাজত ইসলামের কমিটিতে সভাপতি হিসেবে মুফতি হারুনুর রশদি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন মাওলানা মীর আহমাদুল্লাহ।
কিন্তু এই কমিটি ঘোষণার পর থেকেই হেফাজতের একটি অংশের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দেয়। হেফাজতের নেতাকর্মীদের দাবী ছিলো নতুন কমিটিতে আওয়ামী লীগের দোসরদের জায়গা দেয়া হবে না। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে যারা ওসমান পরিবারের দোসর হিসেবে পরিচিত তাদেরকে জায়গা দেয়া হয়েছে। যা ওসমানীয় হেফাজত আখ্যা দিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীরা মেনে নিতে পারছেন না।

































আপনার মতামত লিখুন :