নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম ক্রাইমজোন হিসেবে খ্যাত জিমখানা বস্তি ও আশপাশ এলাকা আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সেখানে দুটি গ্রুপ ১১ মে পাল্টাপাল্টি শো ডাউন দেখিয়েছে। একাংশের দাবী বহিরাগত এসে এখানে মাদক ব্যবসা করছে। এতে করে জিমখানার অধিবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জিমখানাবাসী লাঠিসোটা নিয়ে একাতবদ্ধ হয়ে বহিরাগত মাদক ব্যবসায়ীদের রুখে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বিপরীতে মাদক ব্যবসায়ীরাও দফায় দফায় হামলা করেছে। বিকেলে বিক্ষোভের সময়ে পুলিশ গাড়ি নিয়ে সেখানে গেলে স্থানীয়রা ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেয়।
জিমখানার লোকজন জানান, আলো সহ কয়েকজন বহিরাগতরা মিলে জিমখানায় মাদক ব্যবসা করে। সেখানে লোকজন গেলেই মাদক লাগবে কি না প্রচার করে। এতে করে প্রকৃত জিমখানার লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পুলিশকে বার বার জানালেও কোন কাজে আসছে না। এ কারণেই জিমখানার লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে মাঠে নেমেছে।
এদিকে জিমখানায় ক্রমশ অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে। গোটা এলাকা এখন ভয়ংকর হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে পুলিশ এলে সবাই গা ঢাকা দেয়, চলে গেলেই ফিরে এসে আগের মতো উৎপাত শুরু করে।
এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনের আলোয় প্রকাশ্যে বস্তির পাশের সড়কে দাঁড়িয়ে মাদক কারবারিরা বিক্রি করছে গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। শহরের আশপাশে মাদকের সবচেয়ে বড় কারবার এখন চলে জিমখানা রেলওয়ে কলোনি ঘিরে। এখান থেকেই শহরের টানবাজার, কালীরবাজার রেলস্টেশন, দেওভোগ, পাইকপাড়া, বাশমুলি, কাশীপুর, ভোলাইল, সৈয়দপুর, শহীদনগর, বাবুরাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক সরবরাহ করা হয়। এই মাদক কারবারকে ঘিরে শহরে দিন দিনই বাড়ছে অপরাধ কার্যক্রম।
এ সময় জিমখানা রেলওয়ে কলোনি ঘিরে সক্রিয় হয় দুটি বড় গ্রুপ হাসি গ্রুপ ও ‘মামা-ভাগনে গ্রুপ। এদের মধ্যে আছে আলো, হাসিন, আলমগীর, তানভীর, আলম চান। দুটি পাইকারি দরে মাদক এনে সরবরাহ করে বস্তিতে, তাদের কাছ থেকে নিয়ে খুচরা বিক্রি করে তরুণরা। এর মধ্যে রাব্বি, হাসান, পাভেল, হাসান, আব্দুল হান্নান, শুভ, সাকিব, হৃদয়, মনির ও জিসান অন্যতম।
পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্যে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ আমলে এই জিমখানা বস্তির নিয়ন্ত্রক ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু ওরফে ডিশ বাবু। তিনি শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার নির্দেশেই জিমখানা বস্তিতে চলত মাদকের কারবার। স্থানীয়রা জানান, নিজের লোকদের নিয়ে ওই এলাকায় একচ্ছত্র মাদক কারবার চালিয়েছেন তিনি।
৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক একজন শীর্ষ নেতা কারামুক্তি লাভ করলে ওই এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে তার অনুসারীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এরপর থেকে জিমখানা ও আশপাশের এলাকায় মাদক ও অন্যান্য অপরাধমূলক ঘটনা বেড়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় যেসব চক্র মাদক কারবার চালাচ্ছে, সেটা ওই নেতার অনুসারীদের আশীর্বাদেই হচ্ছে। আর রাজনৈতিক এই প্রভাবের কারণেই ওই এলাকায় বেপরোয়া হয়েছে মাদক কারবারি ও অন্যান্য অপরাধ চক্রের সদস্যরা।
ঘটছে হত্যাকা-: মাদক কারবার ও অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি জিমখানা বস্তি এলাকায় হত্যাকা-ও ঘটেছে একাধিকবার। ২০২৫ সালের ১৪ মে রাত ১১টার দিকে পার্কের অভ্যন্তরে জিমখানা তৃতীয় গলির বাসিন্দা শাহাদাতকে (৩৫) ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। শাহাদাতের বিরুদ্ধে আটটি মামলা ছিল। মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই ওই হত্যাকান্ড ঘটে।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৫ জুন রাত ৮টার দিকে জিমখানাসংলগ্ন ম-লপাড়ায় নাসির নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকান্ডটিও মাদক ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকেই ঘটে।
জিমখানা বস্তিতে অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের ওপর একাধিক হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর জিমখানা বস্তিতে মাদক কারবারিদের হামলায় পাঁচ পুলিশ আহত হন। এর মাস দুয়েক আগে ২২ অক্টোবর একই জায়গায় আসামি ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার মদনগঞ্জ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্য কামরুজ্জামান। দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গত ২৪ মার্চ পুলিশ জিমখানা বস্তিতে অভিযান চালিয়ে দেশীয় অস্ত্র ও মাদকসহ রাব্বি হাসান, হৃদয়, পাভেল, হাসান ও আব্দুল হান্নান নামের পাঁচজনকে প্রেপ্তার করে। গত বছরের ১৯ জুন সন্ধ্যায় জিমখানা বস্তি এলাকা থেকে হত্যাসহ এক ডজন মামলার আসামি ও শীর্ষ মাদক কারবারি তানভীরকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব।
২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হয় জিমখানার অন্যতম শীর্ষ মাদক কারবারি আলম চানসহ আরও ২৩ জন।


































আপনার মতামত লিখুন :