News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

সমন্বিত উদ্যোগেই বদলাতে পারে নারায়ণগঞ্জের চিত্র


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: আগস্ট ১৮, ২০২৬, ০৯:২১ পিএম সমন্বিত উদ্যোগেই বদলাতে পারে নারায়ণগঞ্জের চিত্র

প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ। শিল্প-বাণিজ্যের দিক থেকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শহর ২০১১ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলেও নাগরিক জীবনের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি আসেনি। সময়ের সঙ্গে শহরের পরিধি বেড়েছে, মানুষের চাপ বেড়েছে, বেড়েছে যানবাহন ও বাণিজ্যিক কর্মকা-। কিন্তু সেই তুলনায় নাগরিক সুবিধা ও নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উন্নয়ন না হওয়ায় নানা সংকটে জর্জরিত নারায়ণগঞ্জ।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট, ফুটপাত দখল, মশার উপদ্রব এবং বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ ও পারস্পরিক টানাপোড়েনও নগর উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলেছে। ফলে শিল্প ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা শহরটি নাগরিক স্বস্তির ক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের সামনে নতুন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। বিএনপি সরকার গঠনের পর নারায়ণগঞ্জের তিন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে দলের তিন নেতাকে রাখা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে রয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। আর নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজিব।

একই রাজনৈতিক বলয়ের তিন নেতার হাতে শহরের স্থানীয় সরকার, জেলা পরিষদ এবং নগর উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকায় সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যে সমন্বয়ের অভাবে অনেক উদ্যোগ আটকে থেকেছে, এবার সেটিই নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নের অন্যতম শক্তিতে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নগরবাসীর মতে, তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে উঠলে একই কাজ বারবার করার প্রবণতা কমবে, উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথও সহজ হবে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়ন, জেলা পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্প এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যান যদি একই পরিকল্পনার আওতায় আনা যায়, তাহলে নারায়ণগঞ্জের নগর ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব।

ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতার ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন নগরবাসী। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা কমাতে নাসিকের ড্রেন নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর সাম্প্রতিক সময়ে অল্প বৃষ্টিতে আগের মতো শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে থাকার দৃশ্য কমেছে। এতে নগরবাসীর মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছে। তবে একটি সমস্যার কিছুটা সমাধান হলেও নতুন নতুন সংকট সামনে আসছে।

বর্তমানে শহরের বড় সমস্যাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার সুযোগ না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অলিগলির বিভিন্ন স্থানে ময়লার স্তূপ দেখা যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, অন্যদিকে সড়কের জায়গা সংকুচিত হয়ে যানবাহন চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ী, পথচারী ও যাত্রীদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।

চাষাঢ়া থেকে পঞ্চবটি ও চানমারী পর্যন্ত সড়কেও প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে ভোগান্তি। ব্যস্ত এই সড়কের বিভিন্ন অংশে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও ছোট যানবাহন উল্টে দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটছে। অথচ এই সড়কের আশপাশেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, জেলা আদালত, পাসপোর্ট অফিস, নির্বাচন অফিস, শিল্প পুলিশ ও সিভিল সার্জনের কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর রয়েছে। ফলে সড়কটির ব্যবস্থাপনা ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা প্রশাসনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

শহরের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা ফুটপাত দখল। বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও কিছুদিন পর আবারও ফুটপাত চলে যাচ্ছে হকারদের দখলে। এতে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে অবৈধ রিকশা, থ্রি-হুইলার ও ভ্রাম্যমাণ দোকানের কারণে সড়কের ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে যানজট এখন আর শুধু অফিস সময়ের সমস্যা নয় দিনের বড় একটি সময়জুড়েই নগরবাসীকে যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে।

বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু সড়কের পরিস্থিতি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে সামান্য যানজটও দ্রুত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী বহনকারী যানবাহন থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদেরও দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকতে হচ্ছে।

এর পাশাপাশি ডেঙ্গু পরিস্থিতিও নগরবাসীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে মশার প্রজনন বাড়লেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত ও কার্যকর মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ছিটানো ও লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে না। ফলে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

তবে এসব সংকটকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে সমস্যার সমাধান কঠিন হবে। ময়লা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সড়ক ব্যবস্থাপনা, ফুটপাত দখলের সঙ্গে যানজট, ড্রেনেজের সঙ্গে জলাবদ্ধতা এবং মশক নিধনের সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একই নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। আর এখানেই নারায়ণগঞ্জের তিন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

অতীতে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন কর্মকা-ে রাজনৈতিক বিরোধের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের রাজনৈতিক বিরোধ বহুবার আলোচনায় এসেছে। দুই পক্ষের টানাপোড়েনে বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ নিয়ে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ ছিল। কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই বিরোধ বা প্রশাসনিক জটিলতায় তা থেমে যাওয়ার ঘটনাও নগরবাসীর কাছে নতুন নয়।

বর্তমান বাস্তবতায় সেই পুরোনো দ্বন্দ্বের বদলে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যদি নিজেদের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় করে কাজ করে, তাহলে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নকে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনা সম্ভব।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, নারায়ণগঞ্জের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী মাস্টারপ্ল্যান। তিন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা তিন বিএনপি নেতার জন্য তাই সুযোগের পাশাপাশি বড় পরীক্ষাও অপেক্ষা করছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে তারা নগরবাসীর প্রত্যাশাকে অগ্রাধিকার দিতে পারলে এবং নিজেদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ধরে রাখতে পারলে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নে নতুন অধ্যায় তৈরি হতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়ে পরস্পরের পরিপূরক হলে সীমিত সম্পদ দিয়েও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

নারায়ণগঞ্জবাসী এখন বড় কোনো প্রতিশ্রুতির চেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা চায় পরিচ্ছন্ন সড়ক, দখলমুক্ত ফুটপাত, স্বাভাবিক যান চলাচল, কার্যকর মশক নিধন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ আবারও বসবাসযোগ্য ও আধুনিক নগরীর পরিচয় ফিরে পেতে পারে।