নারায়ণগঞ্জের শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসছে। বিগত কয়েকদিন গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় নারায়ণগঞ্জে শিল্প কারাখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিলো। বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ায় এসকল কারখানাগগুলো উৎপাদনে ফিরছে। সেই সাথে শিল্প এলাকায় কর্মরত শ্রমিকদের মাঝেও কর্মচাঞ্চল্যতা ফিরে আসতে শুরু করছে।
তবে বিগত কয়েকদিন গ্যাসের চাম কম থাকায় শিল্প কারখানার মালিকদের বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হয়ে গেছে। গত কয়েকদিনে প্রায় প্রতিদিনই ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকা লস হয়েছে বল জানিয়েছেন শিল্প কারখানার মালিকরা। সেই সাথে তারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা নিয়ে অনেক বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। কিভাবে এই টাকা পরিশোধ করবেন সেটার যেন কোনো কুল কিনারা পাচ্ছেন না তারা।
ইতোমধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর জুলাই ও আগস্টের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আগামী ১২ মাসে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়েছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। এ জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, জুলাই ও আগস্ট মাসে গ্যাস ও বিদ্যুতের মারাত্মক সংকটের কারণে দেশের নিটওয়্যার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে খোলা সিলিন্ডার ও সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কারখানাগুলোয় স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে পারেনি।
আরও বলা হয়, উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কারখানার মালিকদের নগদ অর্থ ব্যয় করে ডিজেল, এলপিজি ও অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়েছে। এ অবস্থায় অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে জুলাই ও আগস্টের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল এককালীন পরিশোধ করা কঠিন হবে।
এ বিষয়ে বিকেএমইর সহ সভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, বিকেএমইর পক্ষ থেকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর জুলাই ও আগস্টের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আগামী ১২ মাসে কিস্তিতে পরিশোধের ব্যাপারে সুচিন্তিত মতামতা চাওয়া হয়েছে। যাতে করে যে সকল দূর্বল কারখানাগুলো আছে তাদের জন্য যেন সহজ হয়ে যায়। এ বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করে উদ্যোগ নিবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জে ছোটবড় মিলিয়ে ৫ শতাধিক ডাইং কারখানা রয়েছে। আর ডাইং কারখানাগুলো পুরোপুরি গ্যাসের উপড় নির্ভরশীল। বিকল্প কিছু করতে গেলে উৎপাদন খরচ বহন করে বাজারে টিকে থাকা যায় না। যে খরচ বহন করাটা মালিকদের জন্য সম্ভব হয়ে উঠে না। অনেকেরই ডাইং কারখানার সাথে আবার গার্মেন্টসও রয়েছে।
আর এরকম ছোট ডাইং কারখানা হলেও সেখানে প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ লোক কাজ করে থাকে। তার চেয়ে ছোট যেখানে শুধু ডাইং কারখানা সেখানে প্রায় ২ থেকে ৩ শতাধিক লোকের প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলোতে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ লোকের কর্মসংস্থান রয়েছে। গত কয়েদিন গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার শিল্প এলাকায় স্থবিরতা বিরাজ করছিলো।
এদিকে ডাইংয়ের কাজ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। একটি কাপড় মেশিনে ওঠার পর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রায় ১১ থেকে ১২ ঘণ্টা পর ফলাফল পাওয়া যায়। মাঝপথে আধা ঘণ্টার জন্যও গ্যাস বন্ধ হলে পুরো কাপড় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কাপড় নষ্ট হয়ে গেলে এটার খরচ বহন করাটা কষ্টকর হয়ে যায় মালিকদের জন্য। ফলে গ্যাস চাপ না থাকলে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।
বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি নাসির উদ্দিন বলেন, গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে। তবে খুব বেশি আসছে তা না; মোটামুটি আসছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় নারায়ণগঞ্জের অনেকগুলো কারখানা ছুটি দিয়ে দিয়েছিলো। কারণ একবারে বন্ধ করে দিলে কাজের লোকগুলো জোগাড় করা কষ্টকর হয়ে যায়। এইজন্য কেউ কেউ বন্ধ না করে ছুটি দিয়েছিলো। গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ায় আবার এসকল কারখানাগুলো চালু করতেছে। সবমিলিয়ে বলা যায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। একেবারে নাই থেকে পরিত্রাণ পেতে শুরু করছি। আশা করি আরও স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, ডাইং কারখানাগুলো পুরোপুরি গ্যাসের উপড় নির্ভরশীল। বিকল্প কিছু করতে গেলে খরচ বহন করে বাজারে টিকে থাকা যায় না। যে খরচ বহন করাটা মালিকদের জন্য সম্ভব হয় না। এখনও চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না; এই কয়েকদিনে কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। তবে এই কয়েকদিনে গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের অনেক কারখানার অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে। আর অর্ডাল বাতিল হওয়া মানে আম ছালা সব চলে যাওয়া। আর যে সকল অর্ডার এখনও বাতিল হয়নি কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে পাঠানো যাবে না। সেগুলোকে বিকল্প উপায়ে পাঠাতে হবে। আর বিকল্প উপায়ে পাঠাতে হলে খরচ অনেকগুণ বেশি বেড়ে যাবে।
এই শিল্পমালিক নেতা বলেন, আমাদের এখন চিন্তার কারণ হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে কিভাবে গ্যাস বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করবো। কারণ আমাদের কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে। এখন একসাথে এতগুলো টাকা পরিশোধ করাটা খুবই উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিল পরিশোধ করাটা যেন এখন একটা বোঝা হয়ে গেছে। কিছুদিন কারখানা বন্ধ রেখে পরিস্থিতি সামাল দিলেও আমরা ক্ষতিটা সামাল দিতে পারছি না।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, গ্যাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে শুধু এই কয়দিনে গ্যাস সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ হয়নি। যদি বন্ধ হয়ে থাকে তাহলে সে কারখানার আগে থেকেই সমস্যা ছিলো। তবে কিছু কারখানা ছুটি দিয়ে দিয়েছিলো। এসকল কারখানা এখন চালু হতে শুরু করেছে। সেই সাথে যে সকল কারখানা ছুটি দিয়েছিলো সেগুলো অন্য ছুটির দিনে কাজ করিয়ে সমন্বয় করে নিবে।
গ্যাস সংকটে ক্ষতির পরিমাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই কয়দিনে প্রতিদিন কমপক্ষে নারায়ণগঞ্জের ৮০ থেকে ১০০ কোটি লস হয়েছে। অধিকাংশ ডাইং গ্যাসের উপড় নির্ভরশীল। এছাড়া প্রায় সকল কারখানাগুলোতে গ্যাসের কাজ থাকে। প্রায় সকল কারখানাতেই ব্রয়লার রয়েছে। আর এসকল ব্রয়লার চালাতে হলে গ্যাস লাগেই। বয়লার বন্ধ থাকলে গার্মেন্টসগুলোতে মালামাল আসে না। মালামাল না আসলে সব জায়গাতেই প্রভাব পড়ে।







































আপনার মতামত লিখুন :