২০২০ সালে দেশের মহামারি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলো। বার বার লকডাউনের মাধ্যমে এর সংক্রামন থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করে যান সরকার। এরপরও মৃত্যু মিছিল থামাতে হিমশিম খেতে হয়েছিলো স্বাস্থ্য বিভাগ। সেই সময় আলোচিত মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ জীবনের মায়া ত্যাগ করে করোনায় আক্রান্ত ১৫৩জনকে দাফন ও সংৎকার করেছেন। টিম খোরশেদ নামে স্বেচ্ছাসেবীরা নারায়ণগঞ্জ ছাড়াও রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ ও সূদূর কক্সবাজারেও দাফন কাজে অংশ নিয়েছে। তৎকালীন নগর যুবদলের সভাপতি ও সিটি কর্পোরেশনের চার বারের কাউন্সিলর দায়িত্ব পালনে সামাজিক কর্মকান্ডে খোরশেদ ছিলেন প্রথম সারিতে। খোরশেদকে করোনা যোদ্ধা খ্যাত দিয়েছেন বিভিন্ন সংস্থা সহ সামাজিক সংগঠনগুলো। আওয়ামীলীগ সরকার সময়ে খোরশেদের স্বেচ্ছাসেবীতে প্রশংসিত হলেও বিএনপি কর্মী হওয়ার কারণে সরকারীভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। বরং তৎকালীন সময়ে লন্ডন থেকে খোরশেদকে ফোন করে খোজঁ খবর নিয়ে ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খোরশেদ ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর শওকত হাসেম শকু পরবর্তিতে সময়ে করোনা যোদ্ধা হয়ে মাঠে নামেন। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও নিজ উদ্যোগে করোনা রোগীদের জন্য পুষ্টিকর খাবার হাসপাতাল ও বাড়িতে সরবরাহ করেছেন। এমনয় করোনা ভাইরাস রোধে বিভিন্ন সরঞ্জাম বিতরণ করেছেন।
জানা যায়, ২০২০ সালের ৮ মার্চ প্রথম নারায়ণগঞ্জে করোনা রোগী শনাক্ত হয়। পরদিন ৯ মার্চ থেকে করোনা যুদ্ধে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন নাসিক ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর খোরশেদ। পরবর্তীতে তার সহযোদ্ধা হিসেবে সম্পৃক্ত হন একঝাঁক অকুতোভয় যোদ্ধা। করোনা ভাইরাস মহামারির এক বছরে আক্রান্ত ৩৬০ জনকে দাফন-সৎকার করেছেন। সারাদেশে সিটি করপোরেশনের মধ্যে করোনাযোদ্ধা ছিলেন খোরশেদ। করোনার ছোবলে গোটা দেশ যখন ভীত-সন্ত্রস্ত, করোনায় মৃত ব্যক্তিদের দাফনে যখন ছেলে-সন্তানসহ নিকটজনদের চরম অনীহা ঠিক তখনই এগিয়ে এসেছিলেন নগরীর কয়েকজন করোনাযোদ্ধা। সব ভয়-ডর উপেক্ষা করে করোনায় শত শত মৃত ব্যক্তির দাফন ও মুখাগ্নি করে স্থানীয়দের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তারা।
সেই যোদ্ধা নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে ১৩নং ওয়ার্ডে খোরশেদ ও ১২নং ওয়ার্ডে শওকত হাসেম শকু বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী করেন ভোটাররা। ওই সময়ে তাদের পরাজিত করার জন্য আওয়ামীলীগের হেভিওয়েট নেতারা ওয়ার্ডে বিভিন্ন মহল্লা গিয়ে নিজেদের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন। এরপরও করোনা সময়ে তাদের অবদান সাধারণ মানুষ প্রতিদান দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ভোটাররা ভুল করেননি করোনাযোদ্ধাদের বেছে নিতে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসা সেই করোনা বীর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ নগরীর ১৩নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত করা হয়। করোনাকালে কাউন্সিলর খোরশেদ করোনা বীর উপাধি পান। করোনা আক্রান্ত রোগীর লাশ দাফনে স্বজনদের মধ্যেও যখন এক ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছিল ঠিক তখন খোরশেদ একটি টিম গঠন করে লাশ দাফনে নেমে পড়েন। রেডজোনখ্যাত নারায়ণগঞ্জের শত শত লাশ দাফন করে জাতীয় ও বিশ্ব গণমাধ্যমে জায়গা করে নেন কাউন্সিলর খোরশেদ। শুধু নিজ জেলায়ই নয়, খোরশেদের কাজের পরিধি ছড়িয়ে পড়ে অন্য জেলায়ও। একপর্যায়ে তিনি সস্ত্রীক করোনায় আক্রান্তও হয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে তিনি তৃতীয়বারের মতো সিটি করপোরেশনে কাউন্সিলর পদে জয়ী হয়েছেন।
নগরীর আরেক করোনাযোদ্ধা ১২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকুকেও প্রতিদান দিয়েছেন ভোটাররা। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের করোনা হাসপাতালটি (খানপুর ৫শ শয্যার হাসপাতাল) তার নিজের ওয়ার্ডে হওয়ায় তার ভূমিকা ছিল স্মরণীয়। লাশ দাফন, ত্রাণ বিতরণ, মাস্ক বিতরণ, করোনা রোগীদের দেখভাল করা, তাদের মাঝে নিজের টাকায় পুষ্টিকর খাবার বিতরণ, অক্সিজেন সরবরাহ করার মতো বহু কাজ করেছেন এ কাউন্সিলর। কাজ করতে গিয়ে তিনিও আক্রান্ত হয়েছিলেন করোনায়।
এদিকে বিএনপির সরকার গঠনের পরও নারায়ণগঞ্জে আলোচিত দুই করোনা যোদ্ধা ভালো নেই। মহানগর বিএনপিতে নেই তাদের কোন পদ। মহানগর যুবদলের সভাপতি হারানো পর থেকে প্রত্যাশিত বিএনপিতে আলোচনায় রয়েছেন মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। যুবদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া কারণে শহর বন্দর সিদ্ধিরগঞ্জে দলীয় নেতা-কর্মী সহ সাধারণ মানুষের মধ্যে পছন্দের নাম রয়েছেন তিনি। এক সময়ে বিএনপির জেলা সহ শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্বে ছিলেন খোরশেদের বড় ভাই তৈমূর আলম খন্দকার। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গে কারণে তাকে দলকে বহিস্কার হওয়া পর থেকে খোরশেদকে চাপে রেখেছেন প্রতিপক্ষরা। যার ফলে মহানগর বিএনপি আহবায়ক কমিটিতেও ঠাঁই হয়নি সদ্য মহানগর যুবদলের সভাপতি খোরশেদ। বিগত ১৫ বছর যুবদলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় খোরশেদের বিরুদ্ধে ৯০টি বেশি মামলা রয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন তিনি। এমনকি মেয়েদের সাথে মাসের মাস দেখা করতে হতো আদালত চত্বরে। সেই খোরশেদ এখন বিএনপি সরকার আমলে এক কর্মী রয়েছে। তৃনমূল পর্যায়ে নেতা-কর্মীরা দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে খোরশেদের উপযুক্ত সম্মানের আহবান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে মহানগর বিএনপি আহবায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন শওকত হাসেম শকু। সিনিয়র বিএনপি নেতা হলেও কাউন্সিলর ও করোনা যোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি রয়েছে তার। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় নেতাদের কৌশলের কারণে বহিস্কার হয়েছিলেন শকু। বহিস্কার হলেও তিনি বিএনপি রাজনীতি থেকে সরে দাড়াঁয়নি বরং রাজনীতিতে সক্রিয় রেখেছেন স্ত্রী ও অনুসারীদের। রাজনীতিতে মাষ্টারমাইন্ড শওকত হাসেম শকু ১৬ জুন আওয়ামীলীগের বোমা হামলা মামলায় আসামী হয়ে আদালতের চত্বর ঘুরপাক খাচ্ছে দীর্ঘ বছর ধরে। ডিবি অফিসে গ্রেপ্তারকৃত স্বামী শকুকে মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভ করায় স্ত্রী দিপা হাসেম সহ অনুসারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলো আওয়ামীলীগ সরকার। মহানগর বিএনপির আসন্ন কমিটিতে শওকত হাসেম শকু গুরুত্বপূর্ণ পদে আসায় প্রহর গুনছে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা।



































আপনার মতামত লিখুন :