News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর বেড়েছে হামলা


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: আগস্ট ১৮, ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর বেড়েছে হামলা

শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক কারবার, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার পাশাপাশি এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপরও একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে। গত ছয় মাসে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে অন্তত ১০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও অভিযানে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা মারধরের শিকার হয়েছেন, কোথাও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছেন, আবার কোনো কোনো ঘটনায় আসামি ছিনিয়ে নেওয়া বা সরকারি অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

সর্বশেষ গত ১৫ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জের আটি ওয়াপদা কলোনি এলাকায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশের তিন সদস্য। হামলায় আহতরা হলেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এএসআই স্বপন এবং কনস্টেবল হানিফ ও মনির। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ওয়াপদা কলোনির একটি বাসায় ওয়ারেন্টের আসামি ধরতে গেলে হঠাৎ রড ও ইট দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে তাদের স্থানীয় সুগন্ধ্যা হাসপাতাল ও নারায়ণগঞ্জের খানপুর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

একই দিন বিকেলে ফতুল্লার ইসদাইর এলাকায় আরবান স্কুলের সামনে পুলিশের সঙ্গে অস্ত্রধারী মাদক কারবারিদের গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। এতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। গুলিবিদ্ধ হয় এক মাদক কারবারি। ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিনসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ইসদাইর এলাকায় অভিযান চালাচ্ছিল পুলিশ। এ সময় জসিম, মোহনসহ ৭ থেকে ৮ জন মাদক কারবারি পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ও ইটপাটকেল ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে এসআই মো. রফিক ও এসআই নন্দন চন্দ্র সরকার আট রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এতে জসিম নামে এক মাদক কারবারি উরুতে গুলিবিদ্ধ হন। হামলায় আহত হন এসআই রফিক, এসআই নন্দন চন্দ্র সরকার ও কনস্টেবল রাশিদুল।

এর আগে গত ৪ জুলাই সোনারগাঁয়ের সাতভাইয়াপাড়া এলাকায় মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনায় এক আসামিকে ধরতে গিয়ে হামলার মুখে পড়েন তিন পুলিশ সদস্য ও পুলিশের এক সোর্স। আহতরা হলেন সোনারগাঁ থানার এসআই সুরুজ্জামান, কনস্টেবল শাহীন ও মাইনুল এবং পুলিশ সোর্স মাসুম মিয়া।

পুলিশ জানায়, মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও পিকআপ ভ্যান ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্ধার অভিযান এবং এক আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য সাতভাইয়াপাড়া এলাকায় যায় পুলিশের দল। সেখানে আসামি সাগর ও তার ভাই সজল ধারালো দা দিয়ে পুলিশ সদস্য ও সোর্সের ওপর হামলা চালান। এতে চারজন আহত হন। পরে অন্য পুলিশ সদস্যরা তাদের উদ্ধার করেন। তিন পুলিশ সদস্যকে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর আহত সোর্স মাসুমকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

এর দুদিন আগে, ২ জুলাই ফতুল্লার জামতলা ধোপাপট্টি এলাকায় সাদা পোশাকে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে মারধরের শিকার হন পুলিশের দুই সদস্য ও তাদের দুই সোর্স। ফতুল্লা মডেল থানার এসআই খাইরুল বাশার ও কনস্টেবল আরিফুল ইসলাম দুই সোর্সকে সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকায় অভিযান চালান। এ সময় বাড়ির লোকজনের সঙ্গে তাদের বিরোধের সৃষ্টি হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের সময় কনস্টেবল আরিফুল ইসলাম একটি আলমারির ড্রয়ার থেকে স্বর্ণের চেইন পকেটে নেওয়ার চেষ্টা করেন। বিষয়টি বাড়ির লোকজনের নজরে এলে তারা পুলিশের পরিচয়পত্র দেখতে চান। পরিচয়পত্র দেখাতে না পারার অভিযোগে তাদের নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হলে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে চারজনকে মারধর করেন। পরে থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।

গত ৬ মে ফতুল্লার কাশিপুরের হাশেমবাগ এলাকায় অভিযানে গিয়ে একদল পুলিশ সদস্য অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে পড়েন। এ সময় পুলিশের হাতে আটক পাঁচ আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। ওই ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্য আহত না হলেও, অভিযানে গিয়ে পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এর আগের দিন, ৫ মে শহরের বোয়ালিয়া খাল লিচুবাগ এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন র‌্যাব সদস্যরা। দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তিন র‌্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। পরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় ১৩ জনকে আটক করা হয়।

একই দিন গভীর রাতে রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকায় পুলিশের গাড়ি থেকে একাধিক মামলার আসামি শামীমকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এরও আগে গত ৩০ এপ্রিল বন্দরের পুরান বন্দর এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগ তদন্তে গিয়ে সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। হামলায় এক কনস্টেবলের আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই ঘটনায় পুলিশের সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

গত ১৫ মার্চ শহরের উকিলপাড়া রেললাইন এলাকায় দুই পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনা ঘটে। পরে ওই রাতেই অভিযান চালিয়ে ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

আরও আগে গত ৯ মার্চ ভোরে শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই লুৎফর রহমানকে কুপিয়ে আহত করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তার অস্ত্রও ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

পরপর এসব ঘটনায় নারায়ণগঞ্জে অপরাধীদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের ওপর হামলা, সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া এবং পুলিশের হেফাজত থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় একই সঙ্গে মাদক কারবার, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর কিছু এলাকায় মানুষের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধের আশঙ্কাও বাড়ে।

নগরবাসীর অনেকের প্রশ্ন, যেখানে অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর প্রকাশ্যে হামলার সাহস পাচ্ছে, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কতটা কার্যকর। একের পর এক এসব ঘটনায় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিও বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা কমছে না। ফলে শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তার নয়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এসব হামলার নেপথ্যের কারণ ও সংঘবদ্ধ চক্রগুলোর বিষয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।