News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

পরিবহন মালিকদের কাছে জিম্মী


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২৬, ১০:১৭ পিএম পরিবহন মালিকদের কাছে জিম্মী

নারায়ণগঞ্জে পরিবহন মালিকদের কাছে সাধারণ মানুষজন যেন জিম্মী হয়ে পড়েছে। তাদের একরোখা নীতি সবসময় সাধারণ যাত্রী সাধারণ মেনে নিচ্ছেন। সেই সাথে সবসময় জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে একলাফে টিকেটের মূল্য বাড়িয়ে দেন। আর যুগের পর যুগ নারায়ণগঞ্জের পরিবহন সেক্টরে এমনটাই চলে আসছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে পরবর্তী সময়েও এটাই বহাল রয়েছে। 

একই সাথে নারায়ণগঞ্জের পরিবহন মালিকরা সবসময় বলে থাকেন তাদের কোনো চাঁদা দিতে হয় না। তাদের পরিবহনে কোনো চাঁদাবাজি নেই। অথচ সবসময় এই পরিবহন থেকেই নারায়ণগঞ্জে সাংঘাতের শুরু হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নারায়ণগঞ্জে পরিবহন নিয়ে অনেক ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকেও এই পরিবহন সেক্টর থেকে সংঘাতের শুরু হয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন গ্রæপে বিভক্ত হয়ে পরিবহন সেক্টর দখল করার জন্য কয়েকবার সংঘর্ষে জড়িয়েছেন।

জানা যায়, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে প্রজ্ঞাপনের আগে থেকেই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ভাড়া ৫৫ টাকা থেকে ৫ টাকা বাড়িয়ে ৬০ টাকা করা হয়েছে। সে হিসেবে তারা এখন থেকে যাত্রীদের কাছ থেকে ৬০ টাকা করে ভাড়া আদায় করছেন। একই সাথে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩৫ টাকা করে আদায় করছেন। কিন্তু তাদের এই একরোখা নীতি নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ মেনে নিতে রাজী নয়। তারা এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন।

এরই মধ্যে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে যাতায়াতকারী বন্ধন ও উৎসব পরিবহনের বাসে শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসন, বাস মালিক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে দফায় দফায় মিটিং করেও সমাধান হয়নি। পরিবহন মালিকরা কোনোভাবেই যেন দাবী মেনে নিতে রাজী হয়নি।

সবশেষ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে যাতায়াতকারী বন্ধন ও উৎসব পরিবহনের বাসে শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসন, বাস মালিক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে সাড়ে চার ঘণ্টার মিটিং করেও কোনো সমাধান হয়নি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৫ টা থেকে শুরু করে ৯ টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এই দীর্ঘ সময় নিয়ে আলোচনা হয়।

সেই সাথে কোনো সমাধান ছাড়াই মিটিংয়ে উপস্থিত থাকা প্রশাসন, বাস মালিক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা আলোচনা স্থল ত্যাগ করেন। আলোচনা সভায় শিক্ষার্থী ও বাস মালিকরা সকলেই যার যার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে তাদের মাঝে অনেক সময় উত্তপ্ত পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছে। সেই সাথে দীর্ঘ সময় নিয়ে একেকজন আলোচনা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান ছাড়াই বাস মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা বের হয়ে যান।

দীর্ঘ সময় নিয়ে আলোচনার শুরুতেই শিক্ষার্থীদের বাস ভাড়া ৩৪ টাকার বিষয়টি বাস মালিকরা মেনে নেন। এরপর সাধারণ যাত্রীদের ভাড়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সেই সাথে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা সভা শেষে শিক্ষার্থীরা সাধারণ যাত্রীদের জন্য ৫৮ টাকা আদায়ে সিদ্ধান্তে পৌছেন। কিন্তু এই দাবী বাস মালিকরা মেনে নিতে চান না। তাদেরকে বিভিন্নজন বিভিন্ন বুঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস মালিকরা কোনোভাবেই ৫৯ টাকার কম ভাড়া নিবেন না।

এরপর শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম শিক্ষার্থীদের ৫৯ টাকা ভাড়া মেনে নেয়ার জন্য বলেন। কিন্তু এই দাবী আবার শিক্ষার্থীরা মেনে নিতে চান না।

পরবর্তীতে ফতুল্লা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী আলাদাভাবে উৎসব পরিবহনের পরিচালক রতন দাস, বন্ধন পরিবহনের পরিচালক সালাউদ্দিন  ও দেলোয়ারকে নিয়ে বসেন। তাদের নিয়ে আলোচনা করেন।

একই সাথে রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী যাত্রী অধিকার ফোরামের আহŸায়ক রফিউর রাব্বি, জেলা গণহসংহতির সমন্বয়ক তরিকুল সুজন এবং ফারহানা মানিক মুনাকে নিয়ে বসেন এবং তাদের নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু আলোচনা শেষে কোনোপক্ষই সিদ্ধান্তের পৌঁছাতে পারেনি। সবশেষ কোনো রকম সিদ্ধান্ত ছাড়াই মিটিংয়ের সমাপ্তি হয়।

যাত্রী অধিকার ফোরামের আহŸায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের যে শান্তিপূর্ণ অবস্থান, সেটা আমরা নষ্ট করতে চাই না। আবার আন্দোলন, সংগ্রাম কিংবা বাস বন্ধ এমন পরিস্থিতিতেও আমরা যেতে চাই না। দীর্ঘ আন্দোলনের পর নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা সবাই সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই, কোনো বিতর্ক তৈরি হোক, এটাও চাই না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণ যাত্রীর ভাড়া ৫৫ টাকা বলছি, আর বাস মালিকেরা ৬০ টাকা বলছেন। মাঝামাঝি একটি জায়গায় আনার জন্য ৫৮ টাকা একটি প্রস্তাব এসেছে। শিক্ষার্থীদের ভাড়া ৩৪ টাকার কথা বলা হয়েছে। বাস মালিকদের বলা হয়েছে ৫৮ টাকা নেয়ার জন্য। কিন্তু কোনোভাবেই ৫৮ টাকায় আসতে চায়নি। ফলে আর সিদ্ধান্ত হয়নি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা গণসংহতির সমন্বয় তরিকুল সুজন বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সাধারণ যাত্রীদের জন্য ৫৮ টাকা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৪ টাকা ভাড়া রাখার জন্য। এটা আগের মিটিংয়ে বলা হয়েছিলো। সেই সাথে বাস মালিকরা ৫৮ টাকা মেনে নিয়েছিলো। আর শিক্ষার্থীদের ভাড়া ৩৪ টাকা মানছিলো না। কিন্তু এবারের মিটিংয়ে শিক্ষার্থীদের ভাড়া ৩৪ টাকা মেনে নিলেও সাধারণ যাত্রীদের ৫৮ টাকা ভাড়া মেনে নেয়নি। বাস মালিকরা তারা তাদের কথায় নেই। তারা আগের মিটিংয়ে যা বলেছিলো এবারের মিটিংয়ে সেই কথা রাখেনি।

উৎসব পরিবহনের পরিচালক রতন দাস বলেন, সাধারণ যাত্রীদের জন্য ৫৯ টাকা করে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৪ টাকা করে ভাড়া নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিলো। কিন্তু শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সাধারণ যাত্রীদের ৫৯ টাকা মেনে নিতে চায়নি। যার কারণে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা সাধারণ যাত্রীদের জন্য ৬০ টাকা করে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৫ টাকা করেই ভাড়া আদায় করবো।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, দীর্ঘ সময় নিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাস ভাড়া নিয়ে মিটিং হয়েছে। মিটিং শেষে ছাত্রদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সাধারণ যাত্রীদের জন্য ৫৮ টাকা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৪ টাকা ভাড়া রাখার। পরিবহন মালিকরা ৩৪ টাকা মেনে নিলেও ৫৮ টাকা মানতে রাজী হয়নি।

তিনি আরও বলেন, মিটিংয়ে সকলেই আন্তরিক ছিলেন। সকলেই সাধারণ জনগণের পক্ষে ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌছানো সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে অন্য মিটিংয়ে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

এদিকে সভা চলাকালিন সময়ে যাত্রী অধিকার ফোরামের আহŸায়ক রফিউর রাব্বি পরিবহনে ‘চাঁদাবাজি’ নিয়ে কথা বলায় পরিবহন মালিকরা ঘোর আপত্তি জানান। রফিউর রাব্বি বলেছিলেন চাঁদাবাজি কমলে ভাড়া কমানো যাবে। ভাড়া কমলে চাঁদাবাজি কম হবে এবং ভাড়া বাড়লে চাঁদাবাজি বেশি হবে। এ নিয়ে কথা বলতে চাইলে পরিবহন মালিকরা ঘোর আপত্তি জানিয়ে বলেন- এখন আর কোনো চাঁদাবাজি নেই। এখানে কোনো চাঁদাবাজি হয় না।

অথচ এর আগে ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে বন্ধন পরিবহনের দখল নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছিলো। গুরুতর আহত দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিলো। আর এই সংঘর্ষের সময় এক ব্যক্তিকে অস্ত্র হাতে নিয়ে দুটি গুলি করতে দেখা গেছে। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে সাতজনকে আটক করেছে।

এদিন দেড়টার দিকে জাকির খানের গ্রæপের সমর্থক লিটন ও সালাউদ্দিন সাল্লুর নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে টার্মিনালটি দখলমুক্ত করার চেষ্টা করেন। তাঁরা বন্ধন পরিবহনের কাউন্টারের চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেন। এ সময় সেখানে জাকির খানের গ্রæপের একজনকে অস্ত্র হাতে দুটি ফাঁকা গুলি ছুড়তে দেখা গেছে এবং সেখান থেকে মাহবুব উল্লাহর অনুসারীরা পালিয়ে যান।

পরবর্তীতে বিকেল তিনটার দিকে সাখাওয়াত হোসেনের পক্ষের অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে জাকির খানের গ্রæপকে ধাওয়া দেন। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিলো। এরপরেও আরও কয়েকবার এই পরিবহন নিয়ে তারা সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। তাদের মাধ্যে উত্তেজনা বিরজমান ছিলো।