কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে বা পলাতক রয়েছেন। সাবেক মন্ত্রী গাজী ও সাবেক মেয়র আইভী গ্রেপ্তার হলেও সাবেক এমপি শামীম ওসমানসহ জেলা ও মহানগর কমিটির মূল নেতারা এলাকা ছেড়েছেন। মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও গ্রেপ্তার আতঙ্কে রয়েছেন, এবং আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিভিন্ন নাশকতার অভিযোগে দলটির ১৭ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
১৩ মাস কারাভোগের পর ১২ মামলায় জামিনে মুক্ত হয়ে বাড়িতে রয়েছেন নাসিকের সাবেক মেয়র আইভী। এদিকে ২৪-এর ৫ আগষ্টে পর থেকে নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের নারায়ণগঞ্জের জেলা মহানগর পদধারী নেতা গা-ঢাকা দিয়েছেন। ২৩ জুন দলীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনে জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাই, সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদল ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা সহ অঙ্গসংগঠনের পদধারী নেতাদের দেখা যায়নি।
এছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাধিক মামলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ পদধারী নেতারা গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছেন।
এদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের পদধারী নেতাদের দেখা যায়নি দলীয় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। এর ফলে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন যুবলীগের পদ প্রত্যাশিত আজমেরি ওসমানের নেতৃত্বে তার অনুসারীরা সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড ও সোনারগাঁয়ের কাচঁপুরে মিছিলে দেখা গেছে নবাগত নেতাকর্মীরা। মুখোশ লাগিয়ে জাতীয় পতাকা নিয়ে যুবলীগের ব্যানারে মিছিলটি এখন আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সরকার নারায়ণগঞ্জ সহ ছয়টি জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। যার কারণে আওয়ামী লীগের পদধারী নেতারা রাজপথে দেখা যায়নি। জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি নাসিম ওসমান ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য পারভীন ওসমানের একমাত্র ছেলে আজমেরি ওসমান যুবলীগের ব্যানারে তৎপর রয়েছে। গত বছর থেকে আজমেরি ওসমানের নির্দেশনায় তার অনুসারীরা শহর বন্দর সিদ্ধিরগঞ্জ ফতুল্লা ও সোনারগাঁয়ে জেলা যুবলীগের ব্যানারে মিছিলে দেখা গেছে।
নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নিস্ক্রিয়তা রয়েছে দুই বছর যাবৎ। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের শীর্ষ থেকে তৃনমূল পর্যায়ে রাজপথে দখলে রাখতে ব্যর্থ। ১৯ জুলাই শামীম ওসমানের নেতৃত্বে শহরে তান্ডবলীলা করলেও পরবর্তিতে তিনি রাজপথে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এমনকি ৪ আগষ্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে শামীম ওসমানকে শেষ দেখা যায়।
অন্যদিকে ৪ আগস্ট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কালো পতাকা মিছিলে দেখা যায় এরপর থেকে তারা আত্মগোপনে চলে যান। প্রায় দুই বছরের কাছাকাছি সময়ে পদধারী নেতাদের অনুপস্থিতিতে প্রত্যাশিত নেতা-কর্মীরা সক্রিয়তা রূপ নিয়েছে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের নবাগত কমিটি ঘোষণা হলেও তাদেরকে রাজপথে দেখা যায়নি। অন্যদিকে জেলা যুবলীগের কমিটি প্রত্যাশায় আজমেরি ওসমান ও সাফায়েত আলম সানি পৃর্থক কর্মসূচীতে আশা জাগিয়ে তুলে। গত মাসে তাদের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে প্রশাসনের মধ্যে টনক নড়ে।
ওসমান পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের বড় সন্তান হিসেবে দাপুট ছিলেন বিগত ১৫ বছর। বাবা প্রয়াত নাসিম ওসমান ও মা পারভীন ওসমানের প্রশয়ে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান ছিলেন তিনি। বাবা-মা জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হলেও আজমেরি ওসমান দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলের পর নব্য আওয়ামী লীগার হয়ে বিএনপি-জামায়াত ও ত্বকি হত্যার বিরোধী মহড়া ছিলো আলোচিত। ওই সময় বিএনপি-জামায়াতের ডাকা হরতাল-অবরোধের বিরুদ্ধে প্রভাবশালী সেজে শহর বন্দর সিদ্ধিরগঞ্জ ফতুল্লায় আজমেরি ওসমানের নেতৃত্বে হাজারো নেতা-কর্মীদের গাড়ি-হোন্ডা মহড়া ছিলো আলোচিত।
জাতীয় পার্টির বদলে আওয়ামীলীগের দলীয় স্লোগানের মুখরিত আজমেরি ওসমানের মহড়ায় রীতিমত দলের শীর্ষ নেতারা সমালোচিত করেছিলো। কিন্তু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আজমেরি ওসমানের মা পারভীন ওসমানকে বদলে চাচা সেলিম ওসমানকে মহাজোটের প্রার্থী দেয়া পর স্তব্ধ হয়ে পড়ে পরিবার। এক পর্যায়ে ২০২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে হাজার হাজার নেতাকর্মী নিয়ে বিজয় র্যালী বের করেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত নাসিম ওসমান’র এক মাত্র ছেলে আজমেরী ওসমান। ওই গাড়ী বহরে মা পারভীন ওসমান, স্ত্রী ও একমাত্র ছেলে নিয়ে হাজারো সমর্থক শোডাউন ছিলো। বিজয় র্যালীটি কলেজ রোড থেকে শুরু করে চাষাঢ়াস্ত গোল চত্বর হয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দুই চাচা সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান এমপি হওয়া পর আজমেরি ওসমানের গতিবিধি থমকে যায়। পরবর্তিতে এপ্রিল শেষ সময়ে বন্দর উপজেলা নির্বাচন ঘিরে পারভীন ওসমান ও আজমেরি ওসমান নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা যায়। মাত্র কয়েকদিন প্রচারণা করলেও তাদের প্রার্থী বন্দর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী মুকিত বিপুল ভোটে পরাজিত হন।
পরাজিত হওয়ার তিন মাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেমে যান ছাত্র-জনতা। ওই সময়ে আগষ্টের শুরুতে ছাত্র-জনতা আন্দোলনকে অশ্রালীন শব্দ প্রয়োগ করে আজমেরি ওসমান মহড়া দেয় বলে অভিযোগ উঠে। এতে করে নাসিম ওসমানের মালিকানাধীন চারতলা ভবনে ভাড়া দেওয়া আজমেরি ওসমানের হোয়াইট হাউস রেস্তোরাটি ৫ আগষ্ট বিকালে ভাংচুর অগ্নিসংযোগ করে কয়েক হাজার আন্দোলনকারী। অন্যদিকে একই সময়ে তাঁর বাড়িতে সাতটি মোটরসাইকেলে আগুন ও দুটি হ্যামার গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। তিনটি মোটরসাইকেল নিয়ে যায়।
জানা যায়, ৫ আগষ্ট সকালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়ক দিয়ে তিনি এলাকা ত্যাগ করেন। এক পর্যায়ে দুই তিন দিন পর গোদনাইল একটি প্রতিষ্ঠানে গেষ্ট হাউজে অবস্থান ছিলো কয়েকদিন। পলাতক জীবনে কলকাতা অবস্থান করছেন আজমেরি ওসমান। তার সাথে ক্যাসিনো সম্রাটকে দেখা গেছে একাধিক ভিডিওতে।


































আপনার মতামত লিখুন :