News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩

অর্থনীতির শক্তিকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ, প্রাপ্য স্বীকৃতি কবে?


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | আসামাউল হুসনা প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬, ০৮:৩৭ পিএম অর্থনীতির শক্তিকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ, প্রাপ্য স্বীকৃতি কবে?

বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যের মানচিত্রে নারায়ণগঞ্জের অবস্থান দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত। পাটশিল্পের গৌরবময় ঐতিহ্য থেকে শুরু করে গার্মেন্টস, নিটওয়্যার, টেক্সটাইল, ডাইং, স্টিল, সিমেন্ট ও জাহাজ নির্মাণ পর্যন্ত বাংলাদেশের শিল্পায়নের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে এই জেলার নাম উচ্চারিত হয়েছে গর্বের সঙ্গে। "প্রাচ্যের ডান্ডি" শুধু একটি ঐতিহাসিক খেতাব নয়, এটি নারায়ণগঞ্জের অর্থনৈতিক শক্তি ও সক্ষমতার জীবন্ত স্বীকৃতি।

অথচ বাস্তবতা হলো, দেশের অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখা এই জেলাটি আজও প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাসে 'বি' ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে।

এই অসামঞ্জস্যকে সামনে রেখেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশনে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য এবং নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেছেন; নারায়ণগঞ্জকে 'এ' ক্যাটাগরির জেলায় উন্নীত করা এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনকে মেট্রোপলিটন সিটিতে রূপান্তর করা।

দাবি দুটি নতুন নয়। ব্যবসায়ী মহলের বিভিন্ন আলোচনা ও মতবিনিময় সভায় দিপু ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরেই নারায়ণগঞ্জের কাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে আসছেন। নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তবে জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপিত হওয়ায় এই আলোচনা নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

সংসদে উপস্থাপিত তথ্যগুলো স্পষ্ট করে, নারায়ণগঞ্জের এই দাবি কেবল প্রত্যাশার নয়; এটি বাস্তবতার দাবি। বাংলাদেশের মোট জিডিপিতে নারায়ণগঞ্জের অবদান প্রায় ৭.৫ শতাংশ। ৩৯ লাখের বেশি মানুষের এই জেলায় প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালিত হয়। রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ আসে এখানকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। এত বড় অর্থনৈতিক ভার বহন করা একটি জেলা কেন প্রশাসনিকভাবে এখনো 'বি' ক্যাটাগরিতে থাকবেÍ সেই প্রশ্ন তাই আরও জোরালো হয়ে উঠছে।

চেম্বার সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেছেন, নারায়ণগঞ্জ শুধু একটি জেলা নয়, এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও ব্যবসায়িক হাব। দেশের অর্থনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে নারায়ণগঞ্জের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখার পরও প্রশাসনিকভাবে জেলার প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত হয়নি।

তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জকে 'এ' ক্যাটাগরির জেলায় উন্নীত করা এবং সিটি কর্পোরেশনকে মেট্রোপলিটন কাঠামোয় নিয়ে আসা এখন বাস্তব প্রয়োজন। এটি শুধু মর্যাদার প্রশ্ন নয়; বরং উন্নত নগর ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, আইনশৃখলা এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

'এ' ক্যাটাগরি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিচয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত উন্নয়ন বরাদ্দ, অবকাঠামো অগ্রাধিকার, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ। আজকের নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাব নয়, বরং সেই সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামোর অনুপস্থিতি।

যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, নদী দখল, শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নাগরিক সেবার সীমাবদ্ধতা বছরের পর বছর ধরে জেলার অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো ছাড়া এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান কঠিন।

একই কথা প্রযোজ্য মেট্রোপলিটন মর্যাদার প্রশ্নেও। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, খুলনা ও রাজশাহীর মতো শহরগুলো ইতোমধ্যে মেট্রোপলিটন কাঠামোয় পরিচালিত হচ্ছে। শিল্প উৎপাদন, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং কৌশলগত গুরুত্বের বিচারে নারায়ণগঞ্জ কোনো অংশে পিছিয়ে নেই।

সিটি কর্পোরেশন, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ, বন্দর, সোনারগাঁ ও আড়াইহাজারজুড়ে লক্ষাধিক শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও নাগরিকের যে বিশাল অর্থনৈতিক জীবন প্রতিদিন চলমান, তা পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

এই দাবিগুলোর প্রতি ব্যবসায়ী মহলের সমর্থনও স্পষ্ট। নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং বিকেএমইএ'র সহ-সভাপতি (অর্থ) মোরশেদ সারোয়ার সোহেল মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করা এখন জরুরি।

তিনি বলেন, "নারায়ণগঞ্জের সম্ভাবনা বিশাল। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা গেলে নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম আধুনিক ও শক্তিশালী শিল্পনগরীতে পরিণত হতে পারে।"

তিনি আরও জানান, চেম্বার সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রশ্নে যেভাবে ধারাবাহিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন, তা আশাব্যঞ্জক। নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদে জেলার ন্যায্য মর্যাদার দাবি উত্থাপন পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি উদ্যোগ ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করছে।

মোরশেদ সারোয়ার সোহেলের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট; নারায়ণগঞ্জের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন নেই; প্রশ্ন কেবল সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে কত দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

নারায়ণগঞ্জ দেশকে যা দিয়েছে এবং দিয়ে চলেছে, রাষ্ট্রের সময় এসেছে তার যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার। 'এ' ক্যাটাগরির জেলা এবং মেট্রোপলিটন মর্যাদা এখন আর কোনো অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি নারায়ণগঞ্জের অর্জিত অধিকার। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, কার্যকর নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই এই দাবির বাস্তব প্রতিফলন সম্ভব। কারণ, শক্তিশালী নারায়ণগঞ্জ মানেই আরও শক্তিশালী বাংলাদেশ।