হানি ট্র্যাপ একধরনের অপকৌশল। বাংলা অনুবাদে একে ‘ভালোবাসার ফাঁদ’ নামে অভিহিত করা যেতে পারে। সহজ কথায় যৌনতা ও শারীরিক সম্পর্কের ফাঁদে কাজ সমাধা করে নেওয়ার নামই হানি ট্র্যাপ। নিছক মজা করার জন্য এই ফাঁদ পাতা হয় না, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বা গোয়েন্দাদের কাছ থেকে তথ্য বা অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই থাকে এর উদ্দেশ্য। আর এই হানিট্র্যাপেই ফাঁসছেন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। সর্বশেষে বিআইডব্লিউটিএ’র বরখাস্তকৃত পরিচালক দুর্নীতিবাজ একেএম আরিফ উদ্দিনের হানিট্র্যাপে ফেঁসে যাওয়া এখন বহুল আলোচিত। আরিফ উদ্দিন বিআইডব্লিউটিএ অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক। কয়েকবছর আগে তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরে কর্মরত অবস্থাতেও তার বিরুদ্ধে নারীঘটিত অভিযোগ থাকলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের দুই মন্ত্রীর সঙ্গে সখ্যতার কারণে তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
জানা গেছে, নারী কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)’র বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এক নারীর সঙ্গে একান্ত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তার বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হলো। মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান মো. মুহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক দপ্তর আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আদেশে বলা হয়, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগের ভিডিও ক্লিপ প্রকাশিত হওয়ায় কর্তৃপক্ষের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের কর্মচারী চাকুরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর বিধি ৩৫ (খ) ও (ঙ) লঙ্ঘনের কারণে বিধি ৪১ (১) অনুযায়ী তাকে চাকুরী থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।
আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়, বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি বিধি মোতাবেক খোরাকী ভাতা প্রাপ্য হবেন। তবে এ সময় তাকে প্রশাসন ও মানব সম্পদ বিভাগে হাজিরা দিতে হবে এবং হাজিরার ভিত্তিতেই ভাতা পরিশোধ করা হবে।
এদিকে আরিফ উদ্দিনের স্থলে বিআইডব্লিউটিএর প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলামকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, এ নির্দেশনা অনতিবিলম্বে কার্যকর হবে।
জানা গেছে, একে এম আরিফ পাবনার সুজানগর উপজেলার রায়পুর গ্রামের ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মৃত আলহাজ্ব আব্দুল করিমের ছেলে, তার পরিবার ছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত পারিবারিক কিছু জমি জমা ছিল আর্থিক অবস্থা একেবারে অসচ্ছল ছিল না, বাবা চাচারা সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল, তবে আরিফ চাকরিতে যোগদানের পরপরই ফুলে ফেঁপে ওঠে, টিনশেড বাড়ি ভেঙে নির্মাণ করে একটি আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি পাবনায় ক্রয় করে শত শত বিঘা জমি জমা। ছিলেন ছাত্রদল নেতা কিন্তু অর্থের লোভে নিজেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা প্রচার করে সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান এবং খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়।
দুদক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিএ’র আওতাধীন নারায়ণগঞ্জ বন্দর হতে ০১/০১/২০১৯ হতে ৩১/১২/২০২২ তারিখ পর্যন্ত সময়ে এবং সদরঘাট বন্দরে ০১/০১/২০২০ হতে ৩১/১২/২০২২ তারিখ পর্যন্ত সময়ে সরকারি রাজস্ব বাবদ আদায়কৃত খাতওয়ারী বিবরণ, সরকারি কোষাগারে জমা দানের প্রামাণ্য রেকর্ডপত্র (ডিপোজিট স্প্রিসহ), বর্নিত সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের বিবরণ চেয়েছে দুদকের অনুসন্ধানী টিম।
এছাড়াও বিআইডব্লিউটিএ’র তৎকালীন অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিনের সকল ব্যক্তিগত নথি, উত্তোলিত বেতন ভাতার বিবরণ (চাকুরী জীবনের শুরু থেকে জুন, ২০২৩ সময় পর্যন্ত) দায় দায়িত্ব সম্পর্কিত অফিস আদেশ সমূহ, নিজ/স্ত্রী/সন্তান/ভাই গনের নামে ব্যবসা/শেয়ার পরিচালনার আবেদন ও অনুমোদন সংক্রান্ত সমুদয় রেকর্ডপত্র চেয়েছে উক্ত তদন্ত কমিটি।
অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের স্বার্থে চাহিত রেকর্ডপত্র/কাগজপত্রের মূল কপি সংরক্ষণপূর্বক সত্যায়িত কপি বিগত ০৮/০১/২৩ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক (অনু ও তদন্ত-২) মোঃ হাফিজুল ইসলামের কাছে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলেও অদ্যাবধি সরবরাহ না করায় অনুসন্ধান কার্যক্রম বিলম্বিত ও বিঘœ হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে দুদকের অনুসন্ধানী দল কর্তৃক প্রেরিত চিঠিকে পাত্তাই দিতেন না এ কে এম আরিফ উদ্দিন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, এ.কে.এম আরিফ উদ্দিন ঢাকার ৩০১ এলিফ্যান্ট রোডে তার স্ত্রী শামীমার নামে রয়েছে বিলাসবহুল বাড়ী, বারিধারা বসুন্ধরাতে ব্লক সি তিনি প্রসাদতম ফ্ল্যাটে বসবাস করে, পাশে ১টি ফ্ল্যাট ক্রয় করে ভাড়া দেওয়া রয়েছে। এছাড়াও তার নামে ও তার পরিবারের নামে পাবনাতে রয়েছে অসংখ্য সম্পত্তি, সুজানগর পাবনাতে রয়েছে অঢেল সম্পদ। পূর্বাচলে প্লট, বসুন্ধরা অংশীদারিত্বে ১টি বিল্ডিং এর কাজ চলমান। ২০০৮ সালে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করার পর শাজাহান খান নৌপরিবহন মন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে আর পেছন ফিরে তাকানো লাগেনি আরিফ উদ্দিনের। একটানা বন্দর ও পরিবহন বিভাগে চাকরী করে আসছেন। নারায়ণগঞ্জ এবং সদরঘাটে থাকাকালীন সময়ে ঘাট ইজারা দিয়ে, ফোরশোর লীজ এবং ঘাটের ইজারাদারকে দিয়ে কোর্টে মামলা দিয়ে ইজারার পরিবর্তে ঘাট খাওয়ানোর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করেন। ছেলে আমেরিকা এবং মেয়েকে লন্ডনে পড়াশোনা করাচ্ছেন আরিফ উদ্দিন।
বসুন্ধরা রিভারভিউ (ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টিজ লিমিটেড), তুরাগ হাউজিং, মধু সিটি, মধুমতি মডেল টাউনসহ নদীর তীরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানিকে বিপুল পরিমাণ নদীর জমি দখলের সুযোগ করে দেয় একেএম আরিফ উদ্দিন, যার মূল্য আনুমানিক শত কোটি টাকার বেশি। এছাড়া নদীর সীমানা পিলার স্থাপনের নামে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা। সঠিক জায়গায় সীমানা পিলার না বসিয়ে নদী দখলকারীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে সীমানা পিলার ঘুরিয়ে দিয়েছেন আরিফ। আওয়ামীলীগ আমলে আরিফের নেতৃত্বে স্থাপিত সীমানা পিলারের কার্যক্রম খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন ভুক্তভোগী জমির মালিক এবং নদী প্রেমী জনগণ। ফোরশোর লীজ দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আরিফ উদ্দিন। স্বৈরাচার আওয়ামীলীগের দোসর আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ'র শান্তি প্রিয় কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ। নারায়ণগঞ্জের কর্ণফুলি শিপইয়ার্ড স্ত্রীর নামে শেয়ার রয়েছে। স্ত্রীর নামে রয়েছে এলিফ্যান্ট রোর্ডে ৫ তলা কমার্শিয়াল বিল্ডিং। ভাইয়ের নামে বিপুল সম্পদ। ব্রিটেনে বাড়ি এবং বিপুল অর্থ পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাবনা সদর, স্কয়ার রোড,শালগাড়িয়া,পাবনাতে ৬ তলা বাড়ি। পাবনা সদর, কাচারী পাড়ায় ৫ তলা বাড়ি। পাবনা সদর, সাধুপাড়ায় ৪ তলা বাড়ি। মালিকের নাম নাদিরা, বাড়ি নং ৩৭,রোড নং -৪, ব্লক-সি, ওয়ার্ড -৩০, মনসুরাবাদ হাউজিং মোহাম্মদপুর, ঢাকা। বাড়ি নং ৩০১, মুল্য ২২ কোটি টাকা। এলিফেন্ট রোড, ঢাকা। এই বাড়িটি স্ত্রীর নাম ক্রয় করেছেন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি বিল্ডিং এ ৮ টি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন। ব্লকঃ বি-হোল্ডিং নং-৪৭,৪৮,৫২,৪১। নিজ জেলা পাবনা সুজা নগর মৌজা-বনখোলা,ঘেতুপাড়া, রামপুর, হাটখালি, খেতুপাড়া এলাকায় জমি কিনেছেন প্রায় ২০০ বিঘা। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে পট পরিবর্তনের পরে একেএম আরিফ উদ্দিন নিজেকে পাবনার এমপি শিমুল বিশ্বাসের কাছের লোক পরিচয় দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।







































আপনার মতামত লিখুন :