আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির মাঠে শামীম ওসমানের উপস্থিতিই ছিল বড় এক রাজনৈতিক বার্তা। ‘খেলা হবে’ স্লোগানে রাজপথ সরব করা, বিশাল কর্মী-সমর্থক নিয়ে মিছিল-সমাবেশ আর প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার কারণে শামীম ওসমান ছিলেন আলোচিত-সমালোচিত এক চরিত্র। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই দৃশ্যপট বদলে যায়। রাজপথ থেকে আড়ালে চলে যান তিনি। প্রায় দুই বছর পর বিদেশের মাটিতে আবারও একাধিকবার প্রকাশ্যে এলেন। তবে এবারও তাঁকে ঘিরে তৈরি হলো উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত বিক্ষোভের মুখে সভাস্থল ছাড়তে হলো নারায়ণগঞ্জের সাবেক এই সংসদ সদস্যকে। একদিকে প্রাণে রক্ষা পেতে বিদেশে পালালেও সেখানেও পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে।
গত ১৫ আগস্ট রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড এলাকায় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে অতিথি হিসেবে শামীম ওসমান উপস্থিত ছিলেন।
তাঁর উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়তেই সেখানে জড়ো হন বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা। শুরু হয় বিক্ষোভ ও মিছিল। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, বিক্ষোভকারীরা শামীম ওসমানকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে সভাস্থলের আশপাশে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত শামীম ওসমান সভাস্থল ত্যাগ করেন।
বিএনপি নেতাদের দাবি, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বাদল মির্জার নেতৃত্বে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ওই বিক্ষোভে অংশ নেন বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল পাশা বাবুল, বিএনপি নেতা সালেহ আহমদ মানিকসহ দলটির আরও কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
বিদেশের মাটিতে শামীম ওসমানের এই প্রকাশ্য উপস্থিতি কেবল নিউইয়র্কের একটি কর্মসূচিকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাব এসে পড়েছে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘাঁটি নারায়ণগঞ্জেও। কারণ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শামীম ওসমান ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জসহ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাঁর শক্তিশালী সাংগঠনিক বলয় ছিল। রাজপথে তাঁর কর্মসূচিতে বড় জমায়েত হতো। তাঁর বক্তব্যকে ঘিরে যেমন কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যেত, তেমনি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও তৈরি হতো বাড়তি উত্তাপ।
কিন্তু ৫ আগস্টের পর সেই রাজনৈতিক বাস্তবতা আর নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শামীম ওসমান দেশ ছাড়েন। কিছু সময় ভারতে অবস্থানের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে জানা যায়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জে তাঁর রাজনৈতিক উপস্থিতি ছিল কার্যত অনুপস্থিত। তাঁর অনুসারী হিসেবে পরিচিত নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশও প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে দূরে চলে যান। ওই সময় নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতার বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। শামীম ওসমান ও তাঁর পরিবারের বিভিন্ন স্থাপনাও হামলার শিকার হয়। ফলে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বলয় কার্যত ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে।
এর আগে নিউইয়র্কে একটি দলীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়ে শামীম ওসমান জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁরাও দেশে ফিরবেন। সেই বক্তব্যের পর তাঁর সাম্প্রতিক প্রকাশ্য উপস্থিতি নতুন করে নানা আলোচনা তৈরি করেছে। তবে দেশে ফিরে তিনি কী ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকা রাখবেন, কিংবা আদৌ নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারবেন কি না তার উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা একজন নেতার প্রকাশ্যে আসা এবং একটি রাজনৈতিক সংগঠনের মাঠে ফিরে আসা এক বিষয় নয়। ব্যক্তিগত প্রভাব ও অতীতের সাংগঠনিক শক্তি থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মাঠে কার্যকর অবস্থান তৈরি করতে হলে নতুন করে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলোর শক্তি ও কৌশলও বিবেচনায় নিতে হবে।

































আপনার মতামত লিখুন :