একসময় নারায়ণগঞ্জের ফুটবল মানেই ছিল কানায় কানায় পূর্ণ গ্যালারি, মাঠজুড়ে টানটান উত্তেজনা আর ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। সময়ের ব্যবধানে সেই উন্মাদনা কিছুটা ম্লান হলেও, হারানো সোনালি দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে আবারও পেশাদার ফুটবলের মূল মঞ্চে ফিরেছে জেলার অর্ধশতাব্দির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব শুকতারা যুব সংসদ।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) আয়োজিত বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স লিগে(বিসিএল) অংশ নিতে ইতোমধ্যে দলবদল কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে ক্লাবটি। আগামী ২৫ জানুয়ারী শুরু হতে যাওয়া এই লিগে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ২৬ জানুয়ারী পূর্বাচলের ফর্টিস গ্রাউন্ড(জলসিঁড়ি)মাঠে চট্টগ্রাম সিটি ফুটবল ক্লাবের মুখোমুখি হবে শুকতারা যুব সংসদ।
লিগকে সামনে রেখে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে জোর প্রস্তুতি নেমেছে দলটি। কঠোর অনুশীলন শুরু করেছেন তারা।
সোমবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের ওসমানী স্টেডিয়ামে লিগ শুরুর আগে প্রস্তুতি হিসেবে প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলে দলটি। কোচ ও টেকনিক্যাল স্টাফ এবং কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে খেলোয়াড়দের ফিটনেস এবং কৌশলগত দক্ষতা ও দলগত বোঝা পড়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ক্লাবের সভাপতি মোজাম্মেল হক তালুকদার বলেন, এ বছর আমাদের ক্লাবের সুবর্ণজয়ন্তী। এই বিশেষ বছরটিতে স্মরণীয় করে রাখতে আমরা একটি শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন করেছি। লক্ষ্য শুধু লিগে অংশগ্রহণ নয়, ভালো ফল করে নারায়ণগঞ্জের ফুটবলকে জাগিয়ে তোলা। একটি ভালো খেলা উপহার দেওয়া।
দল গঠনে অভিজ্ঞ এবং নারায়ণগঞ্জের তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পাশাপাশি পেশাদার লিগে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে- এমন একাধিক খেলোয়াড়কে দলে অর্ন্তভুক্ত করেছে ক্লাবটি।
দল গঠনে অভিজ্ঞতা ও তারুণের সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্লাবের সমন্বয়কারী মেহেবুবুল হক তালুকদার টগর।
তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের ফুটবলকে আবার সামনে এগিয়ে নিতেই তারা চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের জন্য জন্য দল গড়েছেন। মাঠ সংকটসহ নানা কারণে কয়েক বছর ধরে নারায়ণগঞ্জে লিগ হয় না।আমরা চেয়েছি এমন একটি দল গড়তে, যারা লিগের চাপ সামলাতে পারবে এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষময় হবে। চ্যাম্পিয়নশিপের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে শুকতারা।
দলের প্রধানের কোচের দায়িত্বে আছেন নারায়ণগঞ্জের ছেলে জাতীয় দলের সাবেক তারকা ডিফেন্ডার প্রধান কোচ ওয়ালী ফয়সাল। তিনি বলেন, একসময় জাতীয় দলে একসঙ্গে নারায়ণগঞ্জের ৪-৫ জন খেলোয়াড় থাকতো, কিন্ত এখন আছে দুইজন(তপু বর্মন ও মোহাম্মদ হৃদয়। নারায়ণগঞ্জের ফুটবল এখন বিলুপ্তির পথে। শুকতারা ক্লাব স্থানীয় ছেলেদের জন্য বড় একটি সুযোগ তৈরী করে দিয়েছে, যা কাজে লাগিয়ে নারায়ণগঞ্জের ছেলেরা আবার জাতীয় স্তরে ওঠার সিঁড়ি পেল।
দলের প্রস্তুতি সর্ম্পকে কোচ ওয়ালী ফয়সাল বলেন, দলবদলে আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়ার্ড গঠন করেছি। নিয়মিত অনুশীলনের ফলে খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ছে। প্র্যাকটিচ ম্যাচগুলো থেকে বেষ্ট ইলেন খেলোয়াড় বাছাই করবো। যারা ভালো খেলবে তাদেরকেই খেলানো হবে। আশা করছি, বিসিএল-এ আমরা ভালো করতে পারবো। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি এখান থেকেই হয়তো ৪-৫ জন জাতীয় দলের খেলোয়াড় তৈরী হবে।
তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গড়া এই দল নিয়ে আশাবাদী জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার রেজাউল করিম লিটন ও সোহেল আলী। তাদের মতে, দারুন একটি দল গঠন করা হয়েছে। পরিকল্পিত প্রস্তুতি ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে শুকতারা যুব সংসদ লিগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত শুকতারা যুব সংসদের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। এই ক্লাব থেকেই খেলে উঠে এসেছিলেন সম্রাট হোসেন এমিলি, গোলাম গাউস, জোবায়ের হোসেন নিপু, রেজাউল করিম লিটনে মতো জাতীয় দলের ফুটবলাররা। সেই সোনালী অতীত ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আপাতত ক্লাবের সদস্যসের নিজস্ব অনুদানে গঠিত তহবিলে চলছে কার্যক্রম। তবে পেশাদারত্বের লড়াইয়ে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে ক্লাবটি এখন পৃষ্ঠপোষকের সন্ধান করছে। গত ১৫ জানুয়ারী দলবদল সম্পন্ন করেছে।
বিসিএল লিগের জন্য তারা ৩৫ সদস্যের একটি দল গঠন করেছে, যার মধ্যে ২৫ জনের মতো খেলোয়াড় নারায়ণগঞ্জের স্থানীয়। দলে আছেন ৫ জন উদীয়মান বয়সভিত্তিক খেলোয়াড়ও। জেলার ফুটবলের হারানো গৌরব ফেরাতে স্থানীয় প্রতিভাকেই মুলশক্তি হিসেবে বেছে নিয়েছে শুকতারা।
বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শুরু হওয়ার মধ্যে দিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফুটবলপ্রেমীরা আবারও মাঠে ফিরতে শুরু করেছেন। শুকতারা যুব সংসদের এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি ক্লাবের ফেরা নয়, বরং পুরো জেলার ফুটবল সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখছেন সংশিষ্টরা। গ্যালারিতে আবারও সেই পুরোনো উল্লাসে ফেটে পড়বে-এমনটাই প্রত্যাশাই ফুটবল বোদ্ধাদের।








































আপনার মতামত লিখুন :