নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মোঃ গোলাম সারোয়ার সাঈদ বলেছেন, এক বছর পরে রাষ্ট্রের অগ্রগতি কতটুকু হবে এবং দেশের জনগণের জীবনমানের উন্নতি কতটুকু হবে তার এক্সিকিউটিভ প্ল্যান হচ্ছে বাজেট। বাজেট আসলে আমরা বরাবরই কোন জিনিসের দাম বাড়বে আর কোন জিনিসের দাম কমবে তা নিয়ে আলোচনা করি। আমাদের আলোচনা কেবলই ট্যাক্স কত বাড়লো আর কত কমলো তা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু বাজেটে সামগ্রিকভাবে শিল্প-বাণিজ্য নীতিমালা বা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কি তা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়।
ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট এন্ড বিজনেসম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
সাঈদ একই সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট এন্ড বিজনেসম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি।
সাঈদ বলেন, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। প্রথম দেড় বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। কাজেই এই কর্মসংস্থানের জন্য তাদের বাস্তবমুখী বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। যেহেতু সরকার কর্মসংস্থান তৈরি করে না, কর্মসংস্থানের মূল কেন্দ্র হল প্রাইভেট সেক্টর কাজেই এই বাজেট হইতে হবে শিল্প বান্ধব।
তিনি বলেন, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটকে কর্মসংস্থান তৈরির উপযোগী হিসেবে প্রণয়ন করার জন্য কয়েকটি প্রস্তাবনা: বিটিএমএ এর হিসাব অনুযায়ী প্রায় অর্ধশতাধিক টেক্সটাইল মিল বিগত দুই বছরে বন্ধ হয়েছে শুধুমাত্র ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাবে। বিকেএমইএ এর হিসেব অনুযায়ী গার্মেন্টস বন্ধ হয়েছে দুই শতাধিক এবং এসএমই সেক্টরের হিসেব অনুযায়ী বিগত বছরের প্রবৃদ্ধি কমেছে।
সাঈদ বলেন, সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও সামগ্রিকভাবে অবস্থা বিবেচনায় বুঝা যায় দেশের শিল্প এবং বাণিজ্য কঠিন সময় পার করছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ সরকারের শিল্প-বাণিজ্য বান্ধব নীতিমালার অভাব এবং ব্যাংকিং সেক্টরের অসহযোগিতা। ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাবে যখন একের পর এক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছিল তখন বাংলাদেশ ব্যাংক এক নির্দেশনার মাধ্যমে আউটস্ট্যান্ডিংয়ের টু পার্সেন্ট জমা দিয়ে লোন রিসিডিউলের নির্দেশনা দেয়। অপরদিকে এস এম ই খাতের সাথে ব্যাংকের আচরণ আরো বেশি নেতিবাচক। দেশে প্রায় এক কোটি এসএমই প্রতিষ্ঠান সক্রিয় যার মধ্যে মাত্র ৯ পার্সেন্ট ব্যাংকিং সুবিধা পেয়ে থাকে। তাই বাজেটে সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষ প্রণোদনের আওতায় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে অপারেশনে একটিভ রাখা, সেই সাথে এসএমই খাতের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করে এই সেক্টরেকে আরো প্রসারিত করা।
তিনি বলেন, ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য সরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন করা এবং প্রতিবছর রিনিউ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই কাজে উদ্যোক্তারা প্রচুর হয়রানি শিকার হন এবং অর্থের অপচয় হয় । তাই দীর্ঘদিন ধরে সকল ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল এই সেবা খাতগুলিকে ওয়ানস্টপ সার্ভিসের আওতা নিয়ে আসা। এটা করার জন্য সরকারের ইতিবাচক চিন্তা এবং শিল্প বান্ধব নীতিমালার প্রয়োজন। সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলির শাখা খুব সহজেই ব্যবসায় খাত ভিত্তিক ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আওতায় নিয়ে আসা যায়।
সাঈদ বলেন, প্রতিবছর প্রায় ১০ লক্ষ তরুণ তরুণী শ্রম বাজারে যুক্ত হচ্ছে। সে তুলনায় কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না। তাই কর্মক্ষম এই জনশক্তিকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নীতি সহযোগিতা প্রয়োজন। একজন নতুন উদ্যোক্তার জন্য যতটানা ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন, তার চেয়ে বেশি কঠিন বছর শেষে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের নীতিমালা অনুসরণ করে চলা। বিশেষ করে ট্যাক্স-ভ্যাট রিটার্ন, আবার লিমিটেড কোম্পানি হলে জয়েন্ট স্টকের রিটার্ন আরো বেশি জটিল। এই কাজ পরিচালনা করার জন্য যে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন, তার জন্য যে ব্যয় করতে হবে, তা নতুন উদ্যোক্তার পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের প্রস্তাবনা হচ্ছে নতুন উদ্যোক্তার জন্য প্রথম পাঁচ বছর ট্যাক্স হলিডে ঘোষণা করা হোক এবং জয়েন্ট স্টকের রিটার্নের ক্ষেত্রে এজিএম এর ডেট মিস হলে হাইকোর্টের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। জ্বালানি সংকট নতুন করে ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বরাবরই আমাদের সরকার এ বিষয়ে তড়িৎ সমাধানের ব্যবস্থা করলেও স্থায়ী সংকট সমাধানের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। অথচ প্রায় বাংলাদেশের সমান আমাদের ব্লু ইকোনোমী এড়িয়া রয়েছে, যার আয়তন প্রায় এক লক্ষ আঠারো হাজর বর্গ কিলোমিটার। ব্লু ইকোনোমি এরিয়ায় অফশোর জ্বালানির (তেল এবং গ্যাস, সেই সাথে বাতাস এবং সমুদ্রের ঢেউ থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ) যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, সরকারি নীতিমালার ক্ষেত্রে তা বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছ। তাই জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদী সংকট সমাধানে ব্লু ইকোনোমি এরিয়াকে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের কাজ শুরু করতে হবে, যা একই সাথে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকে বক্তারা জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ বৃদ্ধি, সরকারি হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়ন, ওষুধ শিল্পের বিকাশ এবং চিকিৎসা ব্যয় কমানোর দাবি জানান। পাশাপাশি শিক্ষা খাতে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষায় গুরুত্বারোপ এবং গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি ও খাদ্য খাতে ভর্তুকি ও বরাদ্দ বৃদ্ধি, কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং খাদ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা, শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, রপ্তানি খাতের উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কার্যকর নীতিমালার দাবি তোলা হয়। বক্তারা আরও বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, পরিবহন, রিয়েল এস্টেট, ওষুধ শিল্প, পোশাক শিল্প, লিফট ও এলিভেটর সেক্টর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।
বৈঠকে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা অংশগ্রহণ করেন এবং আসন্ন জাতীয় বাজেটকে আরও কার্যকর, গণমুখী ও ব্যবসাবান্ধব করতে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন। অনুষ্ঠান শুরু হয় কোরআন তেলওয়াত এর মাধ্যমে।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন আয়োজক সংগঠনের সেক্রেটারী জেনারেল ডা: আনোয়ারুল আজীম। এছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন মো: নাসির উদ্দীন, আব্দুর রাজ্জাক, শফিউল আলম উজ্জ্বল, মো: মনিরুজ্জামান মনির, মোজাম্মেল হক ভূইয়া, আতিকুর রহমান, চেয়ারম্যান, হারুনুর রশিদ, জসিম উদ্দিন এফসিএ,







































আপনার মতামত লিখুন :