News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩

আদালতের দুয়ারে ঘুরে স্বজনরা,খালেদা জিয়ার আশ্বাসে বিচার পাবে তো?


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম আদালতের দুয়ারে ঘুরে স্বজনরা,খালেদা জিয়ার আশ্বাসে বিচার পাবে তো?

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে সাতখুনের মতো নৃশংস এক হত্যাকান্ডের স্বাক্ষী হন দেশবাসী। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় অপহরণ করে অমানবিকভাবে একেএকে সাতটি তাজা প্রাণ কেড়ে নেয় সংঘবদ্ধ নরপিশাচের দল। এরপরই জীবনের বাতি নিভে যাওয়া হত্যাকান্ডের শিকার মানুষগুলোর পরিবারে নেমে আসে অন্ধকারের ছায়া। মৃতদের ফেরত যেহেতু অসম্ভব সেহেতু অন্তত ন্যায় বিচার পাবার আশায় বছরের পর বছর আদালত প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাদের পরিবার-পরিজনের সদস্যরা। কিন্তু বিচার আটকে আছে আপিল বিভাগের শুনানির বেড়াজালে।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালত হতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে ঢাকা- নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লা অংশ থেকে অপহরণ হন তৎকালীন সিটি করপোরেশন (নাসিক) ২নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম,তার সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন,মনিরুজ্জামান স্বপনের গাড়ি চালক জাহাঙ্গীর আলম, নজরুল ইসলামের আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও আইনজীবীর গাড়ি চালক মো. ইব্রাহিম।

জানা গেছে, অপহরণের তিনদিন পর অর্থাৎ ৩০ এপ্রিল ও ১মে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ বাকি ছয়জনের মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দরের শান্তিরচরে ভাসমান অবস্থায় পেয়ে উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে এই ঘটনায় নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের জামাতা বিজয় বাদী হয়ে ফতুল্লা থানায় আলাদা আলাদা দু'টি মামলা দায়ের করেন।

উক্ত ঘটনার মামলা চলার একপর্যায়ে ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ দায়রাজজ আদালত অপরাধীদের ২৬ জনকে মৃত্যুদন্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদ সাজা প্রদান করে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন: সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী নেতা ও (নাসিক) ৪নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিল নরঘাতক নূর হোসেন, র‍্যাব-১১ এর চাকরিচ্যুত সাবেক অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানাসহ বাকিরা।

আরও জানা গেছে, সাজা প্রদানের পরবর্তীতে আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত ২০১৮ সালের ২২ আগস্ট মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তের সংখ্যা কমিয়ে ১৫ জন আসামির মৃত্যুদন্ড আদেশ বহাল রাখে এবং অন্যান্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেছিলেন। এরপর হতে প্রায় সাড়ে ৭ বছর ধরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় আটকা পড়ে রয়েছেন। আর ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় নিহতদের স্বজনরা আদালতের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে যাচ্ছেন।

বছরের পর বছর, বিচারক আর সরকার প্রধান পরিবর্তন হলেও বিচারের অগ্রগতি না পেয়ে আশাহত হয়ে যাচ্ছেন নিহতদের স্বজনরা। পাশাপাশি লোকমুখে প্রধান আসামি নূর হোসেনের জামিনে মুক্তি পাবার কথা শুনে আতঙ্কিতভাবে জীবনযাপন করছেন বলে জানিয়েছেন।

নৃশংস হত্যার শিকার তাজুল ইসলামের পিতা আবুল খায়ের তার সন্তান হত্যার বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।

তিনি বলেন, বছর আসে আর বছর যায় কিন্তু সরকার কোনো কার্যকর ভূমিকা নেয়নি। মামলার প্রথম সাড়ে তিনবছরে আমরা হাইকোর্টের রায় পর্যন্ত শেষ করতে পেরেছিলাম। এরপর থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপেল বিভাগে গিয়ে কাগজ পড়ে আছে। এখন আমরা এমনটাই ভাবী যে যারা নিহত হয়েছেন তারা তো কেউ বিত্তবান না এবং তাদের মধ্যে একজন ব্যতীত অন্যদের রাজনৈতিক ক্ষমতাও ছিল না। অথচ আসামিপক্ষের প্রত্যেকে টাকাওয়ালা,ক্ষমতাবান। আসামিপক্ষের শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক দলীয় আর সবাই সরকারি কর্মকর্তা থাকায় আমাদের বিচারটা ঢিলা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমাদের এই ঘটনার কিছুদিন পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর (তারেক রহমান) মা বেগম খালেদা জিয়া আমাদের এখানে এসে মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না, আমরা দল (বিএনপি) যখন ক্ষমতায় আসলে আমরা সর্বপ্রথম এ হত্যার বিচারটা করবো। তাই আমরা বিশ্বাস করি বর্তমানে তিনি (বেগম জিয়া) যেহেতু জীবিত নেই তবে তার দল ক্ষমতায় রয়েছেন। এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার মায়ের দিয়ে যাওয়া কথা বিবেচনায় আমাদের বিচারটা শেষ করবেন।

তাজুলের ছোট ভাই রাজু আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগের নূর হোসেনের ছয় কোটি টাকায় র‍্যাব কর্তৃক সাতখুন সংগঠিত হয়। হত্যাকান্ডের এক যুগ পার হলেও আমরা বিচার পাইনি। রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি পরিবর্তন হয়,অ্যাটর্নি জেনারেল পরিবর্তন হয় কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানও পরিবর্তন হয়। অথচ হত্যাকাণ্ডের ১২ বছর অতিবাহিত হওয়া সত্তে¡ও আমরা বিচার পাচ্ছি না। এতে আমরা হতাশ হই।

তিনি বলেন, তৎকালীন বিরোধীদলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়া ঘটনার পরপর আমাদের এখানে এসে আমাদের প্রত্যেকটা পরিবারের মাথায় হাত রেখে ওয়াদা করেছিলেন যে বিএনপি ক্ষমতা আসলেই সর্বপ্রথম আমাদের বিচারটার পদক্ষেপ নিবেন। বেগম জিয়া মৃত্যুবরণ করায় তারেক রহমান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। এবং তারেক রহমান সাহেবও আমার মতো একজন ভাই হারা মানুষ। তিনি নিজের ভাইয়ের জানাজায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তাই আমি একজন ভাই হারা হিসেবে তারেক রহমানের কাছে অনুরোধ করবো যে সাতখুনের বিচারটা যেন দ্রুত কার্যকর হয় এবং যেসকল আসামিরা এখনো ধরা পড়েনি তাদের দ্রুত গ্রেফতার করা হোক।

নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেছেন, আমাদের মতো গোটা দেশের মানুষ হত্যার বিচারের অপেক্ষায় বসে আছে,কি রায় দেন এটা সবার দেখার ইচ্ছে। আমাদের সাতটা পরিবার প্রতিনিয়ত কান্না করে যায়। আমাদের যা হারানোর সেটা তো হারিয়ে ফেলেছি,এখন শুধু বসে আছি আল্লাহ তা'আলা যেন বিচারটা দেখায়। জজকোর্ট আর হাইকোর্টের রায় দেখে আমরা ভেবেছিলাম বিচারটা দ্রæত পেয়ে যাবো। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে এ রায় কি কারণে ঝুলে আছে তা জানিনা। এখানে তো আমাদের হাতে কিছু নেই সবকিছু সরকারের উপর নির্ভর করে। তারা চাইলেই বিচারটা হয়। আমরা সব সময় ভয়ে ভীতিতে থাকি। কারণ মানুষ এখন বলে নূর হোসেন বেরিয়ে আসবে। যদি নূর হোসেন ঠিকই আসে তাহলে সে আমাদের উপর তো প্রতিশোধ নিবে। কারণ আমরা এই মামলার জন্য যুদ্ধ করে গেছি। হতাশায় ভুগি যে আদৌও বিচারটা হবে কিনা।

বিউটি বলেন, আমরা সরকারের দিকে তাকিয়ে আছি। কারণ হত্যার পর বেগম খালেদা জিয়া আমার বাসায় এসে আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি কখনো ক্ষমতায় আসলে আমাদেরকে ন্যায়বিচার দিবে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের কাছে অনুরোধ করি তার মার ওয়াদা যেনো তিনি রক্ষা করেন।

এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান বলেছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকাররে আমলে সংগঠিত সাতখুন মামলার হাইকোর্ট পর্যন্ত বিচার কার্যক্রম শেষ হবার অন্যতম কারণ হচ্ছে জনগণের চাপে পড়ে সরকার রায় দিতে বাধ্য হয়েছিল। খুনিরা প্রত্যেকে স্বৈরাচার দলীয় হওয়াতে হাইকোর্টের পর বিচার কার্যক্রম আটকে রয়েছে। তাদের লোকজনকে বাঁচানের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ফাইল ফেলে রাখা হয়েছিল। স্বৈরাচার সরকারের আমলে সাতখুন মামলার ফাইলে আদালতে উঠানোর সিরিয়াল পাওয়া যায়নি। আমরা ভেবেছিলাম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রায়টা পেয়ে যাবো এবং তার জন্যে আমরা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগও করেছিলাম। কিন্তু বিচারটা শেষ হয়নি।

তিনি বলেন, আমরা আমাদের বর্তমান সরকারের আমলে এই বিচার কার্যক্রম শেষ করার জন্য যোগাযোগ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ ন্যায় বিচার আমরা পাবো।