আকাশে মেঘ জমলেই এখনই শঙ্কা বাড়ে ফতুল্লাবাসীর| বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই সামান্য বৃষ্টিপাত যেন নতুন করে পুরোনো আতঙ্ককে জাগিয়ে তুলছে| বিশেষ করে ২৬ এপ্রিলের বৃষ্টির পর ফতুল্লার লালপুর, পৌষপুকুরপাড়সহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের মনে আবারও জলাবদ্ধতার ভয় ফিরে এসেছে| অনেকেই বলছেন, কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই যদি এমন পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে টানা বর্ষণে কী হবে সেই চিন্তাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ|
দীর্ঘদিন ধরেই ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা একটি স্থায়ী দুর্ভোগের নাম| স্থানীয়দের অভিযোগ, বৃষ্টি হলেই ড্রেনের পানি উপচে সড়কে চলে আসে, কোথাও কোথাও তা বাড়ির ভেতরেও ঢুকে পড়ে| রাস্তাঘাট কাদাপানি ও ময়লায় একাকার হয়ে যায়| চলাচলে দুর্ভোগ তো থাকেই, পাশাপাশি সৃষ্টি হয় চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি| শিশু, বয়স্ক ও রোগীদের জন্য পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও কষ্টকর|
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে একই চিত্র দেখলেও কার্যকর পরিবর্তন চোখে পড়েনি| বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত বসতি, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং খাল-নালা ভরাট হয়ে যাওয়ায় সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে| লালপুর ও পৌষপুকুরপাড়ের বহু পরিবার জানায়, বর্ষা মানেই তাদের জন্য বাড়তি খরচ, ভোগান্তি আর অনিশ্চয়তা| ঘরে পানি ঢুকে আসবাবপত্র নষ্ট হওয়া, রান্নাবান্নায় সমস্যা, শিশুদের স্কুলে যেতে না পারা এসব যেন প্রতি বছরের নিয়মিত বাস্তবতা|
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই জলাবদ্ধতা কেবল প্রাকৃতিক কারণের ফল নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা| অপরিকল্পিত নগরায়ন, ড্রেনেজ লাইনের অকার্যকারিতা, খাল ও জলাধার দখল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাত্মসব মিলিয়ে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে| ফলে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই পানি আটকে পড়ে জনজীবন অচল হয়ে যায়|
ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অনেক ড্রেনই ময়লা-আবর্জনায় ভরাট| কোথাও কোথাও ড্রেনের অস্তিত্ব থাকলেও তা কার্যকর নয়| স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে| কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে ড্রেন পরিষ্কার বা পাম্প বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি| বরং বর্ষা এলেই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে|
এই জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু যাতায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে| ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্রেতা কমে যায়, দোকানপাটে পানি ঢুকে ক্ষতি হয়, শ্রমজীবী মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়| শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়া ব্যাহত হয়| বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে, কারণ তাদের অনেকের ঘরবাড়িই নিচু এলাকায় অবস্থিত| ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বসতঘর পানির নিচে চলে যায়|
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণ জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছেন| নানা সময়ে নানা প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে টেকসই উন্নয়ন খুব কমই দৃশ্যমান হয়েছে| এ বাস্তবতায় এবার নতুন সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা ˆতরি হয়েছে| স্থানীয়দের মতে, নতুন নেতৃত্বের সামনে এটি বড় পরীক্ষা| জনগণের দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ নিরসনে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে তিনি আস্থা অর্জন করতে পারবেন| অন্যথায় পুরোনো হতাশাই আরও গভীর হবে|
বিশ্লেষকদের মতে, এখন আর সাময়িক পদক্ষেপে কাজ হবে না| প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা| প্রথমত, দখল হওয়া খাল ও পানি চলাচলের পথ উদ্ধার করতে হবে| দ্বিতীয়ত, ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সক্ষম করতে হবে| তৃতীয়ত, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা নিশ্চিত করতে হবে| পাশাপাশি প্রয়োজন উন্নত পাম্পিং ব্যবস্থা, যাতে অতিবৃষ্টির সময় দ্রুত পানি সরানো সম্ভব হয়|
শুধু সরকারি উদ্যোগই নয়, জনসচেতনতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ| অনেক সময় অসচেতনভাবে ড্রেনে ময়লা ফেলা বা জলাধার দখল পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে| তাই স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে|
বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসছে| হাতে সময় খুব বেশি নেই| এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ফতুল্লার মানুষকে আবারও সেই পুরোনো জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে পড়তে হবে এমন আশঙ্কাই প্রবল হয়ে উঠছে| তাই ফতুল্লাবাসীর একটাই প্রত্যাশা প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়, এবার তারা দেখতে চান বাস্তব কাজ; এমন কাজ, যা তাদের প্রতি বর্ষার আতঙ্ক থেকে মুক্তি দেবে|





































আপনার মতামত লিখুন :