নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, “আমরা ২০২৪ সালে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার কর্তৃক অনেক নির্যাতনের মাধ্যমে পলাতক জীবনযাপন করছিলাম। অসংখ্য মামলা-মোকদ্দমা সারা বাংলাদেশের বিএনপি, বিএনপির জোটভুক্ত দল এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছিল। অমানুষিক নির্যাতন, হত্যা, গুম, খুন এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে যখন হয়রানি করা হচ্ছিল, তখনও আমরা এই সরকারের দুর্নীতি, অন্যায়, গণতন্ত্র ধ্বংসসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছিলাম। এত নির্যাতনের পরও দেশের মানুষ আন্দোলন করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। “যদিও নির্যাতনের মাত্রা এত বেশি ছিল যে প্রশাসনকে সরকার নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল। পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ সব শক্তিই একমাত্র স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার অধীনে ছিল। ফলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে আমরা সার্বিকভাবে সফলতা অর্জন করতে পারিনি। কিন্তু আমরা থেমেও থাকিনি। আমরা আশাবাদী ছিলাম, এত দুর্নীতি, অন্যায় ও অপরাধ যারা করছে, তাদেরকে একদিন না একদিন আমরা পরাভূত করতেই পারব। সেই বিশ্বাস নিয়েই আন্দোলন চালিয়ে গেছি।”
গত ২ আগস্ট সময়ের নারায়ণগঞ্জ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, “দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর স্বৈরাচারী সরকারের দুর্নীতি, অত্যাচার, নিপীড়ন, হত্যা ও গুমের কারণে সারা দেশের মানুষ তাদের ওপর ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট ছিল। রাজনৈতিকভাবে আমরা আন্দোলন করেছি, কিন্তু সরকারের পতন ঘটাতে পারিনি। আমরা জানতাম, অত্যাচারী, অন্যায়কারী ও জুলুমকারী একসময় শক্তি প্রয়োগ করে অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচার মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকেই আসে। তখন অত্যাচারী পরাভূত হতে বাধ্য হয়।
তিনি আরও বলেন, “২০২৪ সালের আন্দোলন সম্পর্কে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেন। আমি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। পরে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এই আন্দোলন-সংগ্রামে আমার সহকর্মীরা যেভাবে নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছেন, সে কারণে আমি বলব, যে কারণেই বলা হোক না কেন, এই আন্দোলন কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর বিজয় নয়। ১৫-১৬ বছর ধরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, মানুষের ওপর নির্যাতন, গণতন্ত্র হত্যা, জেল-জুলুম এবং ব্যাপক দুর্নীতিতে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমে ছিল। চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হওয়ার মাধ্যমে রাজনীতির বাইরে নতুন ধারার একটি আন্দোলন গড়ে ওঠে। এরপর যখন কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু হলো, এমনকি রাষ্ট্রের প্রধান তাদের ‘রাজাকার’ বলে আখ্যায়িত করলেন, তখন মানুষের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।”
তিনি বলেন, “সেই আন্দোলন থেকেই দেখা গেল, স্বৈরাচারী শাসক নিরস্ত্র মানুষের বুকেও গুলি চালাতে দ্বিধাবোধ করেনি। সরাসরি গুলি করে মানুষ হত্যা করা হলো। পরে বিভিন্ন বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে, এমনকি হেলিকপ্টার ব্যবহার করেও বিভিন্ন স্থানে মানুষ হত্যা করা হয়। এই হত্যাযজ্ঞ দেখে সাধারণ মানুষ আর বসে থাকতে পারেনি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে আসে। ঢাকার রাজপথে সর্বশ্রেণি-পেশার মানুষ, এমনকি নারী ও শিশুরাও নেমে আসে। সেই কারণেই একটি বিরাট গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং স্বৈরাচার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এই বিজয় যেমন ১৯৭১ সালে সারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের বিজয় ছিল, তেমনি এটিও গণতন্ত্রকামী সব মানুষ, সব রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের বিজয়। আর পরাজয় হয়েছে স্বৈরাচারের।”
তিনি আরও বলেন, “আমি তখন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। এই জেলার সর্বাধিক মামলার আসামি ছিলাম আমি। শুধু আমার নামে নয়, আমার সন্তানদের, সহকর্মীদের এবং সারা বাংলাদেশের অসংখ্য বিএনপি ও গণতন্ত্রকামী মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছিল।
গিয়াস উদ্দিন বলেন, “নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন এসপি সাংবাদিক সম্মেলন করে আমার, কাউন্সিলর ইকবাল ও যুবদল নেতা রনির নাম প্রকাশ্যে উল্লেখ করে আমাদের দুষ্কৃতকারী বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তখন যদি আমাদের গ্রেপ্তার করতে পারতেন, হয়তো হত্যা বা গুমের শিকার হতাম। আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে তখন আমাদের গ্রেপ্তার করতে পারেননি। সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা মনে হলে এখন ভাবি, এত ত্যাগের বিনিময়ে যে পরিবর্তন এলো, রাষ্ট্রীয়ভাবে মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটি দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু আমরা দেখি, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন আগের তুলনায় ব্যতিক্রম কোনো অবস্থানে আসেনি। এটাই সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। এত বড় ত্যাগের পর আরও বড় পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন ছিল। যারা দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ এবং সমাজে অপকর্ম করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।”
দলের বর্তমান অবস্থান প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করি। গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছি, মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছি। নির্বাচন এলো, বিজয়ের পর দল থেকে মনোনয়ন চাইলাম, কিন্তু মনোনয়ন পেলাম না। তখন আমার সহকর্মীরা, যারা আন্দোলন-সংগ্রামে এত ত্যাগ স্বীকার করেছে, তারা বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি। তারা আমাকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করে। আমি নির্বাচন করি। দল তো স্বাভাবিকভাবেই শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ব্যবস্থা নেবে, সেটি আমি জানতাম। আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এখন আমি দলে নেই। দল ক্ষমতায় আছেÍআমি তাদের শুভকামনা করি। তবে তৃণমূল থেকে নেতৃত্বের বর্তমান অবস্থা দেখে আশঙ্কা হয়, কখন আবার কী অঘটন ঘটে যায়। দলকে আরও সুসংগঠিত করা দরকার। ভালো মানুষের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়া উচিত, যারা সংসদে গিয়ে আইন প্রণয়ন ও দেশের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।”








































আপনার মতামত লিখুন :