বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ ও প্রভাবশালী শামীম ওসমান বাহিনীর চরম টার্গেটে ছিলেন তিন তরুণ নেতা। তখন তিনজনই ছিলেন ছাত্রদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। কারো বাসায় গিয়ে হামলা করে গুলি, রক্তাক্ত জখম করে হত্যার চেষ্টা ও গুম করে রাখার চেষ্টা করেছিল শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান সহ বাহিনীর সদস্যরা। পালাক্রমে তিন তরুণের দুইজন এখন যুবদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। বাকি একজন রয়েছে ছাত্রদলে। বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা যারা সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত তাদের মধ্যে এ ৩ তরুণ থাকবেন সামনের সারিতে।
তিনজন হলেন মশিউর রহমান রনি, শাহেদ আহমেদ ও আজিজুল ইসলাম রাজীব। তাদের মধ্যে রনি এখন জেলা যুবদলের সদস্য সচিব, শাহেদ মহানগর কমিটির সদস্য সচিব ও রাজীব সবশেষ মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক।
রাজীব : নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রদলের সবশেষ কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক তিনি। দায়িত্ব পালন করেছেন সরকারী তোলারাম কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিবের। ছাত্রদলের নেতাদের বিরুদ্ধে যখন নানা সময়ে পড়াশোনা নিযে অভিযোগ তখন শিক্ষাগত যোগ্যতাকে আরো সমৃদ্ধ করতে পড়াশোনার গন্ডির বাইরে বের হয়নি রাজীব। ২০০৯ সালে এসএসসি। ২০১১ সালে এইচএসসিতে উত্তীর্ণের পর ২০২১ সালে স্নাতক শেষ করে সরকারী তোলারাম কলেজেই এম এ পড়াশোনা করছেন এ ছাত্রদল নেতা।
আওয়ামী লীগ আমলে নারায়ণগঞ্জ শহরে ছাত্রদলের শো ডাউনে বেশ আলোচিত ছিলেন রাজীব। সরকার বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে রাজীবের নেতৃত্ব জেগে উঠতে ছাত্রদল। অবশ্য এর জেরে তার বিরুদ্ধে ৮টি মামলাও হয়েছে। রাজনীতির কারণে পলাতক জীবন যাপন করতে হয়েছে দিনের পর দিন। তবুও ছাত্রদলের পতাকাতল থেকে একচুলও বিচ্যুতি হয়নি।
আওয়ামী লীগ আমলে যখন সরকারী তোলারাম কলেজের রাজনীতি ছিল ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রনে তখন তাদের সঙ্গে রীতিমত লড়াই করতেন আজিজুল ইসলাম রাজীব। বিনিময়ে তার উপর নেমে আসে অত্যাচারের খড়গ। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী রাজীব সহ অনুসারীদের আটকে বেধড়কর মারধর করে। হত্যার উদ্দেশ্যে রক্তাক্ত জখম করে। তবে বেঁচে যান রাজীব। তবেও হার মানেনি। বরং তখন থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতিকে আরো সমৃদ্ধ করার চেষ্টায় এগিয়ে চলেন।
২০২৩ সালের ১৪ জুলাই রাত ৮টায় কলেজ রোডে দুজন ছেলেকে মারধর করতে থাকে প্রায় ৩০/৪০ জন যুবক। পরবর্তীতে দুজনের একজন দৌড়ে প্রাণ বাঁচায়। ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই হাজির হয় রাজীব ও কাজল। এসময় তাদেরও বেধড়ক মারধর করতে থাকে। লাঠিসোটা, বাশ, ইট দিয়ে থেঁতলে দেয়া হয় রাজীবের মুখ। খবর পেয়ে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু ও যুগ্ম আহবায়ক আনোয়ার হোসেন আনু উপস্থিত হলে রাজীব ও কাজলকে ডাকবাংলোর ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখে। ঘটনার পরপরেই গণমাধ্যম কর্মীরা সেখানে উপস্থিত হলে চিত্র ধারণ করতে গেলে তাদের উপরেও চড়াও হয় মহানগর ও কলেজ ছাত্রলীগের কর্মীরা। এসময় নিউজ নারায়ণগঞ্জের প্রতিনিধি মোবাশ্বির শ্রাবণকে মারধর ও আজকের পত্রিকার প্রতিনিধি সাবিত আল হাসানের মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। বিএনপির নেতারা ইজিবাইকে তুলে আহত ছাত্রদল নেতাকে হাসপাতালে নিতে চাইলে পুনরায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সাংবাদিকদের সামনেই তাদের মারধর করে। লাঞ্ছিত করা হয় মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আনোয়ার হোসেন আনুকে। তার শার্ট ছিড়ে ফেলে ছাত্রলীগের লোকজন।
অবস্থা বেগতিক দেখে পুলিশে খবর দেয় বিএনপি নেতারা। পরে সদর থানা পুলিশের একটি টিম এসে ছাত্রদলের রাজীব ও কাজলকে উদ্ধার করে প্রথমে থানায় ও পরে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঘটনার পরপরেই আজিজ, কাজল, অনিক ও সোহাগকে ছিনতাইকারী আখ্যা দেয় ছাত্রলীগের নেতারা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান শাহেদ আহমেদ।
মশিউর রহমান রনি : আওয়ামী লীগের গডফাদার খ্যাত শামীম ওসমান যখন তুঙ্গে তখন তাকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দিয়ে রীতিমত আলোচনায় এসেছিলেন মশিউর রহমান রনি। যখন বিএনপির অনেক নেতা শামীম ওসমানের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেছিল তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট আর বক্তব্য দিতেন তিনি।
প্রকাশ্যে শামীম ওসমানকে ‘নারায়ণগঞ্জের গডফাদার’ আখ্যা দিয়ে নারায়ণগঞ্জে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন এবং রাজপথে পুলিশ ছাড়া নামার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। মূলত ওই সময় শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে মুখ খোলা ছিল এক বড় দুঃসাহস।
এ কারণে তাকে চরম প্রতিদান দিতে হয়েছে। ২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আরামবাগ থেকে তাকে আটক করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুইদিন পরে তাকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গ্রেপ্তারের পর গুমের চেষ্টা করা হয়। পরে অস্ত্র দিয়ে গ্রেপ্তার দেখিয়ে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। হাত-পায়ের নখে ঢুকানো হয় সুচ। শরীরের বিভিন্ন অংশে গরম ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। ঝুলিয়ে পিটিয়ে ভেঙে দেওয়া হয় তার বাম হাত। মুখে কালো কাপড় বেঁধে ওজু করানো হয় এবং কলেমা পড়ানো হয়। তাকে ফতুল্লার এক খালি মাঠে ক্রসফায়ারে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়। ভাগ্যের জোরে রনি প্রাণে বেঁচে যান। ১৪১ দিন কারাভোগের পর ২০১৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী জামিনে মুক্তি পায় রনি। আওয়ামী লীগ আমলেই ১০৪টি মামলা আর বার বার কারাবণ করে পোড় খাওয়া নেতা হিসেবে পরিচিতি পায় রনি। বাড়িঘরে দফায় দফায় অভিযান আর ক্ষমতাসীনদের হামলা মোকাবেলা করেই তিলে তিলে গড়ে উঠেন রনি।
ছাত্রদলের ওয়ার্ড সদস্য থেকে, সভাপতি পরবর্তীতে জেলা ছাত্রদলের সভাপতির মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
কর্মদক্ষতার কারণে তারেক রহমান তাকে জেলা যুবদলের সদস্য সচিব হিসেবে টানা দুটি কমিটিতে মনোনীত করেন।
২০২৪ এর ৫ আগস্ট শেষ হাসিনার দেশত্যাগ আর আওয়ামী লীগ নেতাদের পলায়নের আগে জুলাই আগস্টে যে আন্দোলন ছিল তখন সাইনবোর্ড সহ পুরো জেলাতে দাবিয়ে বেড়িয়েছেন রনি। তখন তিনি জেলা যুবদলের সদস্য সচিব হয়ে পুরো জেলার যুবদলের নেতাকর্মীদের মাঠে নামিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
শাহেদ আহমেদ : নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের ১৬ বছরে খুব এক সময় বাসায় রাত কাটাতে পারেনি। ৬৩ মামলার আসামী শাহেদ কখনো গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে কিংবা জামিন পেয়ে নিয়মিত আদালতে হাজিরা। আন্দোলনে রোডম্যাপ তৈরি করে নেতাকর্মীদের নিয়ে তারেক রহমানের নির্দেশ পালনে ছিলেন সোচ্চার।
শাহেদ আহমেদ মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব হওয়ার আগে ছিলেন মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি। এ সংগঠনের বিভিন্ন পদেও ছিলেন তিনি। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে অধ্যয়নের সময়েই ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়ায়। নারায়ণগঞ্জ কলেজ রাজনীতিতে জড়ানোর সময়ে তৎকালীন শহর ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়ায়। একের পর এক আন্দোলন সংগ্রাম করে নিজেকে জাগিয়ে তুলেন।
২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের পর থেকে আন্দোলনে ছিলেন সামনের সারিতে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে শাহেদের নাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সর্বত্র তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলন সংগ্রামের খবর ছিল সকলের মুখে মুখে। কাউন্টার টেররিজম ইউনিট গ্রেপ্তারের পর তাকে রিমান্ডে ব্যাপক নির্যাতন করে। তবে এটাই প্রথম না। বরং গত ১৫ বছরে ৬৩টি মামলা হয়েছে যার বেশীরভাগ নাশকতার মামলা। পুলিশ বাদী বেশীরভাগ মামলার। রাজনৈতিক মামলার কারণে ঠিকমত সংসার করা হয়ে উঠেনি শাহেদের। হরতাল অবরোধ কর্মসূচী হলেই ৭দিন আগে থেকে বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। তবে আন্দোলনের সময়ে ঠিকই মাঠে হাজির থাকতেন তিনি।
২০২২ সালেল ৮ জুন শহরের খানপুর হাসপাতাল রোড এলাকাতে তখনকার আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান পুত্র অয়ন ওসমানের উপস্থিতিতে শত শত অনুগামী রীতিমত মহড়া দেয়। এক পর্যায়ে ওই সড়কে সকল ধরনের লোকজনের চলাচল প্রায় আধাঘণ্টা বন্ধ করে দিলে লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই এলাকাতেই মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি ও যুবদলের মহানগর কমিটির যুগ্ম আহবায়ক শাহেদ আহমেদের বাসা; যার অভিযোগ মহড়া থেকে লোকজন তার বাড়িতে গিয়ে খোঁজ করেন। না পেয়ে গালাগাল করে এসেছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাত ৯টায় অয়ন ওসমান খানপুর হাসপাতাল রোডে একটি দোকানের সামনে এসে অবস্থান করে। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে শত শত অনুগামী যুবক জড়ো হয়। তখন তাদের মধ্যে কয়েকজন অয়ন ওসমানকে নালিশ দেয় তাকে নাকি শাহেদ আহমেদ কটূক্তি করেছে। এছাড়া শামীম ওসমানকে নিয়েও নাকি শাহেদ বাজে মন্তব্য করেছেন। বিষয়টি শুনে অয়নের সঙ্গে থাকা লোকজন উত্তেজিত হয়ে উঠে। তাদের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০জনের একদল সেখান থেকে গিয়ে হাসপাতাল রোডের উত্তরে অবস্থিত শাহেদের বাসায় যান। সেখানে গিয়ে তারা হৈ চৈ শুরু করেন। ওই সময়ে একাধিক বিকট শব্দের আওয়াজ পাওয়া যায়। একজন কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়েছেন।



































আপনার মতামত লিখুন :