ঈদুল আযহা সামনে রেখে আবারও জমে উঠতে শুরু করেছে নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে ফুটপাতগুলো দীর্ঘদিন পর সাধারণ পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছিল, সেখানে এখন ফের বসতে শুরু করেছে ভ্রাম্যমাণ দোকান ও হকারদের সারি। ফলে নগরবাসীর মধ্যে আবারও বাড়ছে ভোগান্তি, তৈরি হচ্ছে যানজট, আর প্রশাসনের সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযান নিয়েও দেখা দিয়েছে নতুন প্রশ্ন।
বিশেষ করে শহরের চাষাড়া, বঙ্গবন্ধু সড়ক, কালীরবাজার, দুই নম্বর রেলগেইট, ডিআইটি, নিতাইগঞ্জ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকেই ফুটপাত দখলের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতাদের চাপ বাড়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে হকারদের একটি অংশ আবারও পুরোনো অবস্থানে ফিরতে শুরু করেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
দীর্ঘদিন ধরেই নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম বড় সমস্যা ছিল ফুটপাত দখল ও অব্যবস্থাপনা। অনেক এলাকায় ফুটপাত পুরোপুরি দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়কে চলাচল করতে হতো। এতে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তো, তেমনি তীব্র যানজটেও স্থবির হয়ে পড়তো শহরের স্বাভাবিক গতি। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্ক মানুষদের জন্য পরিস্থিতি হয়ে উঠেছিল চরম দুর্ভোগের।
এমন বাস্তবতায় গত ১৩ এপ্রিল নগরীর চাষাড়া জিয়া হল এলাকা থেকে শুরু হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের হকার উচ্ছেদ অভিযান। পরে ধাপে ধাপে শহরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। বহুদিন পর ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় স্বস্তি ফিরে আসে সাধারণ মানুষের মধ্যে। নগরবাসীর বড় একটি অংশ প্রশাসনের এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে এবং নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি জানায়।
তবে সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গত ৩ মে বিকেলে নগরীর চাষাড়া নূর মসজিদ এলাকার সামনে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার সময় সিটি করপোরেশনের কর্মচারীদের ওপর হামলার ঘটনা পুরো পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে। অভিযোগ রয়েছে, একদল হকার সংঘবদ্ধভাবে অভিযানে বাধা দেয় এবং কয়েকজন কর্মচারীকে মারধর করে আহত করে। ঘটনার পর মামলা দায়ের হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনেকেই প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
স্থানীয়দের মতে, হামলার ঘটনার পর থেকেই অনেক হকারের মধ্যে এক ধরনের সাহস ও বেপরোয়া মনোভাব তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের কঠোর অবস্থান কিছুটা শিথিল হয়েছে এমন ধারণা থেকেই তারা আবারও ফুটপাত দখলে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে বেচাকেনা বাড়ার সুযোগে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, দিনের তুলনায় বিকেল ও রাতের দিকে ফুটপাত দখল বাড়ছে বেশি। কোথাও পোশাক, কোথাও জুতা, আবার কোথাও কসমেটিকস ও গৃহস্থালি পণ্যের অস্থায়ী দোকান বসানো হচ্ছে। ফলে পথচারীরা আবারও বাধ্য হয়ে সড়কে নেমে চলাচল করছেন। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
তবে হকারদের একটি অংশ বলছে, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ কার্যক্রম মানবিক নয়। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতে ব্যবসা করেই তারা পরিবার চালিয়ে আসছেন। হঠাৎ উচ্ছেদ করে দিলে তারা আয়-রোজগারের পথ হারিয়ে ফেলবেন। এজন্য তারা পুনর্বাসন, নির্ধারিত হকার জোন এবং জীবিকার নিশ্চয়তা দাবি করছেন। গত এপ্রিলজুড়ে বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও মিছিলও করেছে হকার সংগঠনগুলো।
যদিও নগরবাসীর অভিযোগ, পুনর্বাসনের দাবিকে সামনে রেখে একটি প্রভাবশালী চক্র আবারও ফুটপাত দখলের সুযোগ তৈরি করছে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অবৈধ অর্থ লেনদেনের একটি সিন্ডিকেট। সেই চক্রই নেপথ্যে থেকে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, কেবল কয়েকদিনের উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নিয়মিত নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া বন্ধ না হলে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। একইসঙ্গে জীবিকার প্রশ্ন বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত পুনর্বাসনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় হকারদের পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে তাদের জন্য আলাদা জোন নির্ধারণ, সময়ভিত্তিক ব্যবসার সুযোগ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে সংঘাত বাড়তেই থাকবে। অন্যদিকে ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে ঈদকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ শহরে হকারদের পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একদিকে জীবিকার দাবি, অন্যদিকে নগরবাসীর স্বস্তি ও নিরাপদ চলাচলের প্রশ্ন, এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করাই এখন প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



























-20260522173818.jpg)





আপনার মতামত লিখুন :