News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট, ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

ধ্বংসস্তূপের শহরে শৃঙ্খলা ফেরানোর লড়াই


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: আগস্ট ৮, ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম ধ্বংসস্তূপের শহরে শৃঙ্খলা ফেরানোর লড়াই

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ৭ আগস্ট ছিল নারায়ণগঞ্জে এক নতুন বাস্তবতার দিন। টানা আন্দোলন, সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, প্রাণহানি ও অগ্নিসংযোগের বিভীষিকা পেরিয়ে জেলার মানুষ তখন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই চেষ্টার পথ মোটেও সহজ ছিল না। পুলিশের কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির, প্রশাসন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায়, আর সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিলÍআইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এদিন সকাল থেকেই চাষাঢ়া, দুই নম্বর রেলগেট, বঙ্গবন্ধু সড়ক, ডিআইটি, সাইনবোর্ড, শিমরাইল, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, বন্দর, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায়। অনেক স্থানে তারা যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নজরদারির কাজ করেন। পুলিশের সীমিত উপস্থিতির কারণে এই স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম জনমনে কিছুটা আস্থা ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখে।

জুলাই আন্দোলনের রক্তাক্ত দিনগুলোর পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীরা যৌথভাবে সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে পাহারার ব্যবস্থা করেন। কোথাও কোথাও রাতেও টহলের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে অরাজকতা বা লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি না হয়। সেই সময় নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন থানা কার্যত বন্ধ ছিল। অনেক পুলিশ সদস্য নিরাপত্তাজনিত কারণে কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি। ফলে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়। প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য ছিল পরিস্থিতিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা। জেলার বিভিন্ন বাজার ও শিল্পাঞ্চলেও ৭ আগস্ট ধীরে ধীরে কর্মচাঞ্চল্য ফিরতে শুরু করে। ফতুল্লা, বিসিক শিল্পনগরী ও সিদ্ধিরগঞ্জের অনেক গার্মেন্টস কারখানা সীমিত পরিসরে উৎপাদন শুরু করে। তবে শ্রমিকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল স্পষ্ট। অনেক কারখানায় উপস্থিতি স্বাভাবিকের তুলনায় কম ছিল।

অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের স্মরণে বিভিন্ন স্থানে দোয়া, শোকসভা এবং অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনের সময় যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাদের পরিবারের খোঁজখবর নেন সহপাঠী, প্রতিবেশী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা। আন্দোলনের স্মৃতি তখনও ছিল একেবারে তাজা প্রতিটি এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সেই রক্তাক্ত জুলাই। রাজনৈতিক অঙ্গনেও ৭ আগস্ট ছিল পুনর্বিন্যাসের দিন। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন। জেলার রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। সরকার পতনের পর সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা শুরু হয়। তবে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা ছিল মানুষের মনে জমে থাকা আতঙ্ক। ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির স্মৃতি তখনও শহরের অলিগলি, দেয়াল এবং মানুষের কথোপকথনে জীবন্ত। অনেক পরিবার এখনও তাদের আহত স্বজনের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত, আবার কেউ কেউ হারানো প্রিয়জনের শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে ৭ আগস্টের নারায়ণগঞ্জে বিজয়ের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি গভীর বেদনা ও অনিশ্চয়তার ছাপও ছিল স্পষ্ট।

বিশ্লেষকদের মতে, ৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে সংঘাতের রাজপথ থেকে পুনর্গঠনের পথে যাত্রা শুরু হয়। একদিকে প্রশাসন নতুনভাবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, অন্যদিকে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ নিজেদের উদ্যোগে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন। এই দিনটি তাই কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের নয় বরং ভেঙে পড়া জনজীবনকে আবার দাঁড় করানোর এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে আছে।