News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬, ১৬ চৈত্র ১৪৩২

রাজনৈতিক পালাবদলে বিপর্যস্ত জাতীয় পার্টি


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: মার্চ ৩০, ২০২৬, ০৯:১২ পিএম রাজনৈতিক পালাবদলে বিপর্যস্ত জাতীয় পার্টি

রাজধানীর পাশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে একসময় দৃশ্যমান ও সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে অবস্থান ছিল জাতীয় পার্টি (জাপা)-র। স্থানীয় রাজনীতিতে দলটির উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও) ও নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে সেই দৃশ্যপট এখন অনেকটাই বদলে গেছে। মাঠে নেই তেমন কর্মসূচি, নেই দৃশ্যমান নেতৃত্ব সব মিলিয়ে জেলায় জাপার রাজনীতি যেন এক অচেনা স্থবিরতায় আটকে পড়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই জেলার জাপার কার্যক্রমে স্পষ্ট ভাটা দেখা যায়। যে দুই আসনে দীর্ঘদিন দলটির প্রভাব ছিল, সেখানেই এখন সংগঠনের দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, নির্বাচনের পর থেকে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা কমে গেছে, পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না। ফলে একসময় সক্রিয় থাকা নেতাকর্মীদের অনেকেই এখন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারকারী সাবেক সংসদ সদস্য একে এম সেলিম ওসমান এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে খুব একটা দৃশ্যমান নন। তার প্রকাশ্য কার্যক্রম কমে যাওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা মাঝে মধ্যে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলেও আগের মতো সংগঠনের জোর আর নেই। তার ঘিরে থাকা কর্মী বাহিনীতেও আগের সেই উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায় না।

স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক নেতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সমঝোতার রাজনীতি করতে গিয়ে জাপা নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান অনেকটাই হারিয়েছে। প্রশাসনিক সুবিধা পেলেও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে দলটির গ্রহণযোগ্যতা ধীরে ধীরে কমে গেছে। ফলে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যেতেই সেই ভাঙন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জে জাপার এই দুর্বলতার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। এর মধ্যে অন্যতম হলো নির্ভরশীল রাজনীতি। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার ছায়ায় অবস্থান করায় দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আদর্শভিত্তিক অবস্থান তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন আন্দোলন সংঘাতকে কেন্দ্র করে একাধিক নেতার বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির অভিযোগে অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। এতে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন কার্যত ভেঙে পড়ে।

সোনারগাঁয়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভরাডুবি জাপার জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। ওই আসনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় শুধু একটি আসন হারানো নয়, বরং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, দলটির সমর্থনভিত্তি আগের মতো শক্ত নেই।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করে আসা ওসমান পরিবারের ভূমিকাও এখন আগের তুলনায় অনেকটাই সীমিত বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। একসময় শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রভাবও কমতে শুরু করেছে।

বর্তমানে জেলার রাজপথে জাপার কোনো উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি চোখে পড়ে না। দলীয় কার্যালয়গুলোও অনেকটাই নির্জীব। নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই, বরং পুরনো নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা দলটিকে আরও দুর্বল করে তুলছে। অনেক নেতাকর্মী বিকল্প রাজনৈতিক আশ্রয়ের দিকেও ঝুঁকছেন বলে জানা গেছে।

এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত, নারায়ণগঞ্জে পুনরায় শক্ত অবস্থান ফিরে পেতে হলে জাপাকে প্রথমেই নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে নতুন করে সংগঠন গড়ে তোলা, তরুণ নেতৃত্ব তৈরি করা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য বাস্তবধর্মী উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। শুধু নির্বাচনী সময় নয়, সারা বছরজুড়ে জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম চালু রাখতে না পারলে দলটির পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির রাজনীতি এখন এক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। অতীতের শক্ত অবস্থান এখন স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ। সামনে পথ আছে, তবে সেই পথে ফিরতে হলে প্রয়োজন নতুন কৌশল, দৃঢ় নেতৃত্ব।