News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩

মনির কাসেমীকে গ্রেপ্তার করায় ফেরদাউসুর রহমান


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: এপ্রিল ১৯, ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম মনির কাসেমীকে গ্রেপ্তার করায় ফেরদাউসুর রহমান

মাওলানা হারুন অর রশিদ ও ফেরদাউসুর রহমানের সম্পর্ক প্রায় ২০ বছর। একে অপরকে মামা ভাগ্নে সম্বোধন করতেন। একে অন্যের অনেক ঘটনার সাক্ষী। তবে সম্পর্কের অবনতির কারণে এবার ফেরদাউসুরের অনেক গোপন খবর ফাঁস করেছেন এক সময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হারুন। তাঁর ফাঁস হওয়া তথ্য অনেক ভয়ঙ্কর। একজন আলেম হয়ে ফেরদাউস কিভাবে আওয়ামী লীগ প্রীতি, র‌্যাবের এক কারাবন্দী কর্মকর্তার সোর্স হিসেবে শতাধিক আলেমকে গ্রেপ্তার করানো সহ উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য।

১৮ এপ্রিল জমিয়তের কেন্দ্রীয় কমিটির আমেলা সভা হয় যেটা দলের একটি সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম। সেখানে উঠে আসে এসে খবর। ওই সভাতে নারায়ণগঞ্জের জমিয়ত ও এর সহযোগি সংগঠনের ৭০ জন একটি অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। অনাস্থায় ফেরদাউসুরের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ ও পত্রিকার কাটিং সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। এছাড়া তার বেশ কিছু ছবিও সংযুক্ত করে।

এ ঘটনার পর কেন্দ্রীয়ভাবে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয়। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

সভায় কেন্দ্রীয় মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুর ইসলাম আফেন্দি সার্বিক বিষয়ে আলোচনা করেন। ওই সময়ে ফেরদাউসুর রহমান অভিযোগ তুলেন জেলা জমিয়তের সভাপতি মনির হোসাইন কাসেমী স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিচ্ছে না।

তাঁর বক্তব্য চলাকালে জানিয়ে দেওয়া হয় অনাস্থার বিষয়টি। পরে তিনি চুপ হয়ে যান।

পরক্ষনেই জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা হারুন অর রশিদ কথা বলেন। তিনি বলেন, ফেরদাউসুর রহমানের সাথে তার ২০ বছরের অধিক সময় ধরে সম্পর্ক। বিগত দিনে সংগঠনের স্বার্থে অনেক কিছুই বলা হয়নি। কিন্তু এখন বিবেক ও মনুষ্যতের জন্য অনেক কিছু জানানো প্রয়োজন।

হারুন বলেন, ‘র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা আলেপউদ্দিন (ধর্ষণ সহ নানা অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দী) এর সাথে ফেরদাউসুরের ভালো সম্পর্ক ছিল। তখন আলেপের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন ফেরদাউস। আমি কাছে থেকে দেখেছি ২০২১ সালে এ আলেপকে তথ্য দিয়ে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে গ্রেপ্তার করানো হয়। ওই সময়ে আলেপের কাছ থেকে সুবিধা নেয় ফেরদাউসুর। আমি তখন ঘটনার সাক্ষী ছিলাম। বার বার ফেরদাউসকে এসব বিষয়ে সতর্ক করলেও তিনি মানেনি।

শুধু মনির হোসাইন কাসেমী না বরং নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার শতাধিক আলেম ওলামাকে গ্রেপ্তারের পেছনে ফেরদাউসুরের হাত ধরেছে। বক্তব্যে যোগ করেন হারুন।

সভায় জানানো হয়, ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে মনির হোসাইন কাশেমী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু তখন শামীম ওসমানের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে পোলিং এজেন্টের তালিকা বিক্রি করে দেয় ফেরদাউসুর। নিয়মিত শামীম ওসমানের জামতলার বাসায় গিয়ে তথ্য আদান প্রদান করতেন।

হারুন সভায় সবশেষ ২০২৬ এর ১২ ফেব্রুয়ারীর সংসদ নির্বাচন নিয়েও কথা তুলেন। বলেন, ‘ফেরদাউস আমাদের ও দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মোনাফেকগিরি করেছেন। তিনি উপরে জোট প্রার্থী ও আমাদের প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমীর পক্ষ নিলেও প্রতিদিন রাতে স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ আলম, গিয়াসউদ্দিন ও মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করতেন। এদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা এনেছেন। এক বৈঠকে রোজেল ও রানাসসহ কয়েকজনের উপস্থিতিতে ফেরদাউস শপথ করিয়েছেন কোনভাবেই যেন মনির কাসেমীকে জয়ী না করানো হয়। কারণ আমি যে মনির কাসেমীকে ২০২১ সালে গ্রেপ্তার করিয়েছি এটা সে জানে। তিনি জয়ী হলে আমাকে জেলে ভরবে।

হারুনের বক্তব্য চলাকালে ফেরদাউস মাথা নিচু করে বসে থাকেন। আলোচনার এক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে নারায়ণগঞ্জ জেলা জমিয়ত ও মাওলানা ফেরদাউস বিষয়ে কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা তাফাজ্জল হক আজিজের নেতৃত্বে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া ও সহকারী মহাসচিব মাওলানা নাসির উদ্দিন খানসহ তদন্ত কমিটি করা হয়, যারা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে জমিয়তের কেন্দ্রীয় খাস কমিটিতে জমা প্রদান করবে।

প্রসঙ্গত জেলা ও মহানগর জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব যেন চরম আকার ধারণ করেছে। নেতাকর্মীরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং গোপন কর্মী সম্মেলন আয়োজনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। আর এসকল নেতাকর্মীরা যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতে জড়াতে পারেন।

এরই মধ্যে একটি পক্ষের সম্মেলন আয়োজনকে কেন্দ্র করে আরেক পক্ষের বাধায় পন্ড হয়েছে। এদিন তাদের মধ্যে বেশ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিলো। পরবর্তীতে একটি পক্ষ পিছু হঠায় পরিস্থিতি শান্ত হয়।

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা জমিয়তে উলামা ইসলামের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মহাসচিব মনির হোসেন কাসেমীর নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে জেলা ও মহানগর কমিটি পরিচালিত হয়ে আসছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জেলার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান, মহানগরের সভাপতি কামাল উদ্দিন দায়েমী ও সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মনোয়ার হোসাইন পৃথকভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন। তারা মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বাইরে গিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিল আয়োজন করেন। যা নিয়ে জমিয়তে উলামা ইসলামের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এসব কার্যক্রমে জেলা ও মহানগরের সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে অবহিত করা হয়নি এবং কেন্দ্রীয় নেতাদেরও একপাক্ষিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলে মনির হোসেন কাসেমী নিজেকে এ বিষয়ে অবগত নন বলে জানান। পরবর্তীতে নেতাকর্মীদের দাবির মুখে একটি নির্ধারিত কাউন্সিল স্থগিত করা হয়।

এরপরও সংশ্লিষ্ট নেতারা কার্যক্রম চালিয়ে গেলে সংগঠনের পক্ষ থেকে মাওলানা ফেরদৌসুর রহমান ও কামাল উদ্দিন দায়েমীকে শোকজ করা হয়। কিন্তু শোকজের পরও তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের ভিন্নভাবে অবহিত করে গোপনে ৯ এপ্রিল হীরা কমিউনিটি সেন্টারে কর্মী সম্মেলন আয়োজনের চেষ্টা করেন। কিন্তু এই বিষয়টিকে মেনে নিতে পারেননি জেলা যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মুফতি হারুনুর রশিদের নেতৃত্বাধীন জমিয়তের নেতাকর্মীরা।

পরবর্তীতে জেলা ও মহানগরের নেতারা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সম্মেলনটি প্রতিরোধ করেন। এ সময় জেলা সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মোফাজ্জল ইবনে মাহফুজ, জেলা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জসিম আলী, সাইনবোর্ড জোন সভাপতি ওসমান গনী, ফতুল্লা থানা সিনিয়র সহসভাপতি হাফেজ হানজালা, থানা সহসভাপতি নজরুল ইসলাম, থানা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক  মুফতি মাহমুদুল হাসান থানা সহসাংগঠনিক আনিসুর রহমান ছানি এবং সহ-দপ্তর সম্পাদক ফয়সাল ইবনে মাহফুজ নেতৃত্ব দেন।

নেতাকর্মীরা জানান, তারা হীরা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে পৌঁছালে আয়োজকরা পরিস্থিতি বুঝে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে  যান। পরে  মাওলানা ফেরদৌস, সাবেক মহানগর সেক্রেটারি মাওলানা মনোয়ার হোসেন হিরা কমিনিউটির সামনে আসলে উপস্থিত নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হলে, দায়িত্বশীলরা তাকে দ্রুত স্থান ত্যাগ করিয়ে দেয়।

এর আগে দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাউন্সিলের উদ্যোগ নেওয়ায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়। একইসঙ্গে ৯ই এপ্রিল প্রস্তাবিত কাউন্সিল স্থগিত করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি মুফতী মনির হোসাইন কাসেমী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়।