নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের অনিয়ম তুলে ধরে রীতিমত এক হাতে নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের দুই সংসদ সদস্য। ক্ষমতাসীন দলের এই দুই এমপি ধারাবাহিকভাবে নানা অভিযোগের কথা শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে সতর্ক করলেন এই কর্মকর্তাদের। সেই সাথে জনগনকে সাথে নিয়ে অনিয়ম প্রতিরোধ করার কথাও উঠে এসেছে। ক্ষমতাসীন দলের এমপি হয়েও সরকারি কর্মকর্তাদের সমালোচনা করায় পাচ্ছেন ভূয়সী প্রশংসা।
গত রোববার নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত আইন শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে সর্বপ্রথম মুখ খুলেন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নান। সেখানে আইন শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা পুলিশের কর্মকান্ডে বিরক্ত হয়ে দাবী করেন, গোপালগঞ্জের বাসিন্দা এমন পুলিশ সদস্য নারায়ণগঞ্জে বেশী। তারা কখনই আমাদের ভালো চাইবে না।
মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশী নিয়োগ পেতো গোপালগঞ্জের বাসিন্দা এমন ব্যক্তিরা। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার নিজ জেলা হওয়ায় তাদের জন্য থাকতো বাড়তি সুযোগ সুবিধা। সেই সাথে প্রমোশনও পেতেন বেশী। মূলত পুরো প্রশাসনের মধ্যে গোপালগঞ্জের বাসিন্দাদের বাড়তি সুবিধা দিয়ে প্রশাসনকে আওয়ামী করণ করার প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছিলো হাসিনা সরকার।
যেই কারণে বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে পুলিশের অন্ধভাবে আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন দেয়া। বিরোধী দলের উপর অতিউৎসাহী হয়ে জুলুম করা। সরকারি বিধির তোয়াক্কা না করে আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানানো ছিলো সহজ বিষয়। নগ্ন হয়ে আওয়ামী সরকারকে সমর্থন করা সেই পুলিশ সদস্যদের অনেকেই এখনও চাকরিতে বহাল আছেন। ফলে তারা ফের আওয়ামী লীগকে সহযোগীতা করতে পারেন বা বিএনপি সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করবেন এমন সন্দেহ থেকেই এই মন্তব্য করেন এমপি মান্নান।
তবে শুধু পুলিশকেই নয়। এক হাত নিয়েছেন তিতাস ও বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের।
তিনি বলেন, ‘মেঘনা থেকে বা বিভিন্ন নদী থেকে যে বালুর বাল্কহেড প্রবেশের আগেই তাদের থেকে চাঁদা নেয়া শুরু হয়ে যায়। আবার নাকি মোবাইলে চাঁদা দিয়ে দেয়, কীভাবে দেয় জানি না। এর সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা জড়িত।
গ্যাস নিয়ে তিতাস কর্মকর্তাদের উপর ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, সোনারগাঁয়ে ৬৫ হাজার গ্যাস লাইন অবৈধ। আওয়ামী লীগের আমলে এইসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারে দেওয়া হইছে। অবৈধ গ্যাস লাইনের জন্য যদি মামলা দেওয়া হয় তাইলে তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাদের এক নম্বর আসামি করবেন, তাইলে দেখবেন সব কইমা গেছে। আমি কিন্তু আমার থানায় অর্ডার দিয়া দিছি- যারা তিতাস গ্যাসের অফিসার যাইবো তাদের আগে পিটানোর জন্য। তারা সব অবৈধ কাজ করে।
তার এই বক্তব্যের পর ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা হলেও খুশি হয়েছেন সোনারগাঁবাসী। কারন এসব সমস্যায় সোনারগাঁ বাসী দীর্ঘদিন ধরেই ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। এদিকে মান্নানের পর সরকারি দপ্তর ও কর্মকর্তাদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এমপি আবুল কালাম। তিনি বন্দর উপজেলায় থাকা পানি সংকট, অতিরিক্ত লোডশেডিং ও সড়কের বেহাল অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এমপি কালাম বলেন, জনগণের মৌলিক চাহিদা বিদ্যুৎ পানি গ্যাসের পাশাপাশি মানুষের প্রথম সমস্যা যাতায়াত। এসব সেবার দায়িত্ব বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে ভাগ হয়ে থাকায় অনেক সময় সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দেয়। বন্দরের ২১ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা পানির দাবিতে মানববন্ধন করছেন। বিষয়টি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বন্দরে বিদ্যুৎ সরবরাহের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ঘণ্টায় একাধিকবার লোডশেডিং হওয়ায় সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। একই সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ, পানির সংকট, নদীদূষণ, যানজট ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ে মানুষের ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বন্দরে বর্তমানে ঘণ্টায় তিন থেকে চারবার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে লোডশেডিং দিতে হয়, বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু সেটা সমন্বয় করে দেন। একবারে এক ঘণ্টা দেন। কিন্তু ঘণ্টায় তিনবার দিলে এটা অসহনীয় হয়ে যায়। রাস্তাঘাটের বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের অসন্তুষ্টি রয়েছে। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে সমস্যাগুলো নিয়ে তাদের প্রকাশ্যে কথা বলার আহ্বান জানান তিনি। রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে নিয়ে আমরা অসন্তুষ্ট। কিন্তু আমরা তো আপনাদের প্রতিপক্ষ না। আপনারা মুখ খুলুন।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খোদ ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা যখন সরকারি কর্মকর্তা ও দপ্তর নিয়ে অভিযোগ তুলে তখন স্পষ্ট হয় এইসব অভিযোগ কতটা গুরুত্বর। সরকারের ইমেজের কথা না ভেবে নিজ এলাকার বাসিন্দাদের কথা আগে ভাবছেন তারা। যা প্রমান করে এমপিরা বর্তমানে মানুষের কাছে অনেক বেশী দায়বদ্ধ।



































আপনার মতামত লিখুন :