শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে ব্যস্ততা থামে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের চলাচলে সরগরম থাকে নগরীর সড়কগুলো। দিনের ব্যস্ত সময় থেকে শুরু করে গভীর রাত কিংবা ভোর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। পথরোধ করে মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা, মোটরসাইকেলসহ মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে, আবার কোথাও শারীরিকভাবে আঘাত করে সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এর ফলে কর্মস্থলে যাওয়া, ব্যবসা শেষে বাড়ি ফেরা কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে একা রাস্তায় বের হওয়াও অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে দুশ্চিন্তার বিষয়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ফাঁকা বা নির্জন সড়কগুলোতে চলাচলের সময় আতঙ্ক আরও বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন নগরবাসী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগে নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকার নাম বারবার উঠে আসছে। চাষাঢ়া, উকিলপাড়া মোড়, নয়ামাটি, মাসদাইর, জামতলা, ইসদাইর, দেওভোগ, জিমখানা রেলওয়ে কলোনি, ডিসি বাংলোর সামনের সড়ক, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড এবং শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী ওয়াকওয়ে এলাকায় ছিনতাইয়ের আশঙ্কার কথা বলছেন তারা। এসব এলাকার মধ্যে কিছু জায়গা দিনের বেলায় ব্যস্ত থাকলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চলাচল কমে যায়। আর তখনই অপরাধীদের তৎপরতার আশঙ্কা তৈরি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের দিকে একা চলাচলের ক্ষেত্রে তারা এখন আগের তুলনায় বেশি সতর্ক থাকেন। কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন ছাড়া সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়াও এড়িয়ে চলছেন।
একাধিক পথচারী জানান, আগে রাত করে বাড়ি ফিরলেও তেমন ভয় কাজ করত না। এখন রাস্তায় মোবাইল ফোন বের করতেও চিন্তা করতে হয়। পেছন থেকে কেউ আসছে কি না, অপরিচিত কেউ অনুসরণ করছে কি না এসব বিষয় নিয়েই বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দোকান বন্ধ করে রাতে বাড়ি ফেরার সময়ই সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক হয়। সঙ্গে টাকা থাকলে ঝুঁকি আরও বেশি মনে হয়। কোথাও থামতে হলে কিংবা নির্জন রাস্তা পার হতে হলে নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করতে হয়।
শুধু নগরীর অভ্যন্তরীণ সড়ক নয়, ফতুল্লা, কাশিপুর ও সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাতেও ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশেও রাতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। সাইনবোর্ড, সানারপাড়, কাঁচপুর, মদনপুর ও মেঘনাঘাট টোলপ্লাজা সংলগ্ন এলাকাগুলোতে রাতে পথচারী ও যানবাহন চালকদের মধ্যে বাড়তি সতর্কতা দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যানবাহন থামিয়ে কিংবা পথরোধ করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রী ও চালকদের কাছে বিষয়টি আরও উদ্বেগের। কারণ ব্যস্ত মহাসড়কে কোনো অপরাধের শিকার হলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার বিষয়টিও অনেক সময় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে বলে তারা মনে করেন।
নগরবাসীর অভিযোগের বড় একটি অংশ হলো গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় রাতের বেলায় পর্যাপ্ত পুলিশি টহল চোখে পড়ে না। আবার কিছু সড়কে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধ্যার পর পরিবেশ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের মতে, একটি এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল ও দৃশ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে অপরাধীদের তৎপরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু টহলের ঘাটতি এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন সড়ক অপরাধীদের জন্য বাড়তি সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে নদীর তীরবর্তী এলাকা, রেললাইনসংলগ্ন সড়ক, ফাঁকা রাস্তা ও কম জনবসতিপূর্ণ অংশে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ বলছেন, মোবাইল বা সামান্য টাকা ছিনতাই হলে অনেকেই থানায় যেতে চান না। কেউ সময়ের অভাবে, কেউ ঝামেলার আশঙ্কায়, আবার কেউ অভিযোগ করে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে কি না এমন সংশয় থেকে মামলা বা অভিযোগ করেন না।
ফলে স্থানীয়দের ধারণা, বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া সব ছিনতাইয়ের তথ্য সরকারি হিসাবের মধ্যে নাও থাকতে পারে। আর এই অনিবন্ধিত ঘটনাগুলো অপরাধ পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, শুধু ছিনতাইয়ের পর অভিযান চালানো নয়, বরং অপরাধ সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সম্ভাব্য ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে নিয়মিত টহল, সাদা পোশাকে নজরদারি, সিসিটিভি ক্যামেরার কার্যকর ব্যবহার এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা জোরদারের দাবি তাদের। একই সঙ্গে সড়কের পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, নির্জন এলাকাগুলোতে পুলিশি উপস্থিতি বাড়ানো এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেপ্তার নয়, অপরাধের ধরন ও স্থানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কোন এলাকায় কখন বেশি ঘটনা ঘটছে, কী ধরনের মানুষ বা যানবাহনকে টার্গেট করা হচ্ছে এবং অপরাধীরা কোন পথ ব্যবহার করছে এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘হটস্পট’ভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুললে অপরাধ কমানো সম্ভব। নারায়ণগঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী। প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে নগরীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলাচল করেন। তাদের কাছে নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিক জীবনের মৌলিক প্রয়োজন। কিন্তু দিন-রাতের বিভিন্ন সময়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগ বাড়তে থাকলে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ পথচারীÑসবার মধ্যেই তৈরি হয় অস্বস্তি। নগরবাসী তাই এমন একটি নারায়ণগঞ্জ চান, যেখানে রাত করে বাড়ি ফেরার সময় পেছনে তাকাতে হবে না, মোবাইল ফোন হাতে রাস্তায় হাঁটতে ভয় হবে না, ব্যবসার টাকা নিয়ে চলার সময় প্রতিটি মোড়কে ঝুঁকি মনে হবে না।



































আপনার মতামত লিখুন :