শহরের যানজট নিরসনে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ মিশুকের নবায়ন ও নামজারি শুরু করার কয়েকদিনের মধ্যেই দেখা দিয়েছে জটিলতা। দীর্ঘদিন নবায়ন ও নামজারি বন্ধ থাকার পরে সম্প্রতি নবায়ন ও নামজারি শুরু হলেও পুরনো কাগজপত্রের অসঙ্গতি দেখিয়ে নবায়ন নামজারি বন্ধ রেখেছে নাসিক কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও প্রায় ১৫ হাজার নাম্বার প্লেট নবায়ন নামজারিতে অল্প কিছুদিন সময় বেঁধে দেয়ায় অসন্তোষ বিরাজ করছে মিশুক মালিক ও চালকদের মধ্যে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে নবায়ন ও নামজারি করতে গিয়ে পদে পদে ভোগান্তির সম্মুখীন হওয়ায় মিশুকের ডিজিটাল নাম্বার প্লেট ভয়ংকর সিন্ডিকেটের কবলে পড়ার আশঙ্কা করছেন মিশুক মালিক ও চালকরা। ইতোমধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ জনের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। যার সঙ্গে নাসিকের লাইসেন্স শাখার একাধিক কর্মকর্তাও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে নবায়ন ও নামজারি সহজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পাদন করার দাবি জানিয়েছেন প্রকৃত মিশুক মালিক ও চালকরা।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ সকল বৈধ মিশুক মালিকদের লাইসেন্স করার জন্য গত ১৮ আগষ্ট থেকে আগামী ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। এ সংক্রান্ত একটি আবেদন ফরম পূরণ সাপেক্ষে সিটি করপোরেশনে জমা দেয়ার পরে নাসিক কর্তৃপক্ষ একটি জমা স্লিপ দিলে নবায়ন ও নামজারির জন্য নির্ধারিত অর্থ ব্যাংক জমা দিতে হবে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়।
জানা গেছে, বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার আমলে শহরে রিকশা চালানোর জন্য ১০ হাজারের বেশী লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বিলুপ্ত সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভা সাড়ে ৩ হাজারের মতো রিকশার লাইসেন্স প্রদান করেছিল। বিলুপ্ত কদমরসুল পৌরসভা দেড় হাজারের মতো রিকশার লাইসেন্স প্রদান করেছিল। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও কদমরসুল পৌরসভা বিলুপ্ত করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠন করা হলেও দীর্ঘদিন রিকশার লাইসেন্স নবায়ন ও নামজারি বন্ধ ছিল। ২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মাসিক সভায় রিকশার লাইসেন্সগুলোকে মিশুকে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে ২০২৪ সালে রিকশার লাইসেন্সগুলোকে মিশুকের লাইসেন্স হিসেবে রূপান্তরের কার্যক্রম শুরু হয়। সেসময় যেসব রিকশার লাইসেন্স ছিল তারা পর্যায়ক্রমে ফি পরিশোধ করে রিকশার থেকে মিশুকের লাইসেন্সে নবায়ন করে। তবে তৎকালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কোন দায়িত্বশীল প্রশাসক না থাকায় নবায়নের বিষয়ে কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি নাসিক কর্তৃপক্ষ। তবে রিকশা থেকে মিশুকের লাইসেন্সে রূপান্তর হলেও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের যে প্লেট দেয়া হয়েছিল সেগুলো নকল হয়ে যাওয়ায় প্রকৃত লাইসেন্সধারী মিশুক মালিক ও চালকরা পড়েন বিপাকে। নকল প্লেট নিয়ে শহরে অবাধে চলতে থাকে। নাসিক কর্তৃপক্ষ ও মিশুক মালিক চালকদের সমন্বয়ে একাধিকবার অভিযান পরিচালিত হলেও তাতে কোন কাজ হচ্ছিলনা। বরং শহরে ১০ হাজারের কিছু বেশী লাইসেন্সধারী মিশুক চলার কথা থাকলেও চলছিল ৫০ হাজারের বেশী। পরে নাসিক কর্তৃপক্ষ শহরে লাইসেন্সধারী মিশুকগুলোকে হলুদ রং দেয়ার নির্দেশ দিলেও তাতে কোন কাজ হয়নি। যে কারণে আধুনিক ডিজিটাল নাম্বার প্লেট দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল প্রকৃত মিশুক মালিক ও চালকরা। পরে শহরের যানজট কমাতে এবং ডিজিটাল নাম্বার প্লেট নকল ঠেকাতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ একাধিক সভার আয়োজন করে। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ১৮ আগষ্ট থেকে মিশুকের ডিজিটাল নাম্বার প্লেট নবায়ন ও নামজারি শুরু হয়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত নবায়ন ফি ছিল ৮ হাজার ৩৬৫ টাকা। তবে বর্তমানে নবায়ন ফি সর্বমোট ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৫৫ টাকা। এছাড়াও নামজারী ফি ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৫০ টাকা। যা সর্বমোট গিয়ে দাড়ায় ১৪ হাজার ৭০৫ টাকা। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে নবায়ন ও নামজারির করতে অনেক টাকা দরকার ও কঠিন শর্তের কারনে সময় খুব কম হওয়াতে অনেক মিশুক মালিক নবায়ন করতে হিমশিম অবস্থায় পড়েছে। কারণ অনেক গ্যারেজ মালিক রয়েছে যাদের গ্যারেজে ২০ থেকে ২৫টি বা তারও অধিক রিকশা ছিল যাদের গ্যারেজে বর্তমানে মিশুক রয়েছে। হঠাৎ করে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হওয়ায় এবং নবায়ন নামজারিতে কঠিন শর্ত আরোপের কারণে অনেক মিশুক মালিক নবায়ন ও নামজারি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এছাড়াও যারাই নবায়ন ও নামজারি করতে আসছেন তাদের পদে পদে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। নাসিকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা মিশুক মালিকদের নানাভাবে ভুল বুঝিয়ে হয়রানি করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মিশুক মালিকরা জানান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে দীর্ঘদিন ধরেই নবায়ন ও নামজারি বন্ধ ছিল। যখন রিকশার নাম্বার প্লেট ছিল তখন অনেক মালিক তার ব্লু বুক ও প্লেট অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করেছিলেন। তখন অনেকেই ব্লু বুক ও প্লেট ক্রয় করে তাদের রিকশায় লাগিয়ে চালিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝখানে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র আইভী রিকশার লাইসেন্স নবায়ন ও নামজারি বন্ধ করে রাখে। যে কারণে ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত যারা রিকশার লাইসেন্স ক্রয় করেছেন তারা নবায়ন ও নামজারি করতে পারেননি। ২০২৪ সালে নবায়ন শুরু হলেও নামজারির বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত না হওয়ায় নাসিক কর্তৃপক্ষ শুধু নবায়ন ফি জমা নিয়ে মিশুকের নাম্বার প্লেট দিয়েছিল। তবে এখন নবায়ন ও নামজারি শুরু হলেও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ একেক সময় কঠিন কঠিন শর্ত জুড়ে দিচ্ছে। তারা পূর্বতন মালিকদের যারা লাইসেন্স বিক্রি করে দিয়েছিল তাদের আইডি কার্ডসহ অন্যান্য তথ্য চাইছে। অথচ বিগত দিনে যারা লাইসেন্স বিক্রি দিয়েছে তাদের কেউ কেউ হয়তো নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে চলে গেছে নয়তো মারা গেছে। এমনও দেখা গেছে রিকশার লাইসেন্স নবায়ন দেয়ার সময় যার নাম রয়েছে সেখানে তার নাম ঠিকানাও সঠিকভাবে নেই। যে কারণে নবায়ন ও নামজারি কঠিনতর শর্তের কারণে প্রকৃত মিশুক মালিকরা বিপাকে রয়েছেন। তারা বলছেন এ অবস্থায় একটি ৩০-৩৫ জনের একটি দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা নাসিকের লাইসেন্স শাখার কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে লাইসেন্স কিনে ডিজিটাল নাম্বার প্লেটের বাণিজ্য করতে চায়। এরা সহজ সরল মালিকদেরকে ফুসলিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের লাইসেন্স হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। চক্রটি সফল হলে দেখা যাবে শহরের অধিকাংশ প্লেট সিন্ডিকেটের কবলে নিয়ে সংকট তৈয়ারী করে বেশী মুনাফায় বানিজ্য করবে। যে কারণে লাইসেন্স নবায়ন ও নামজারি সহজ করার জন্য নাসিকের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের কাছে দাবি জানিয়েছেন প্রকৃত মিশুক মালিকরা।
এ বিষয়ে নাসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নূর কুতুবুল আলম জানান, মিশুকের লাইসেন্স ২০০৪ সালের পরে আর নামজারি হয়নি। যে কারণে নামজারি নিয়ে কিছুটা জটিলতা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে মিশুক মালিকদের মালিকানার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে নাসিক প্রশাসক নির্দেশনা দিয়েছেন।



































আপনার মতামত লিখুন :