নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে স্থানীয় বিএনপি। মঙ্গলবার বিকেলে জেলা আইনজীবী ভবনের দ্বিতীয় তলায় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় এক পক্ষের আইনজীবী ও নারায়ণগঞ্জ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির আহত হয়েছেন। একই সময়ে মহানগর বিএনপির আহবায়ক ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে হেনস্তার অভিযোগও উঠেছে। ঘটনার পর থেকেই আদালতপাড়ার এই বিরোধ নিয়ে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি শুধু আইনজীবী সমিতির অভ্যন্তরীণ বিরোধ নয়, এর সঙ্গে দলীয় রাজনীতি, নেতৃত্বের প্রভাব এবং আগামী আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য হিসাব-নিকাশও জড়িয়ে আছে।
আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার বিকেলে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবিরের চেম্বারে একদল আইনজীবীকে নিয়ে খাওয়ার আয়োজন করা হয়। একই সময়ে সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানের পক্ষেও অন্য আইনজীবীদের নিয়ে পৃথক আয়োজন ছিল। এ নিয়ে আগে থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়।একপর্যায়ে মহানগর বিএনপির আহবায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান আইনজীবী সমিতির সভাপতির চেম্বারে গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে তিনি বিপরীত পক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর পিপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির অভিযোগ করেন, সাখাওয়াত হোসেন খান দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ আদালতকে দুই ভাগে বিভক্ত করার চেষ্টা করছেন। তাঁর দাবি, এদিন সাখাওয়াতের অনুসারীরা তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং এতে তাঁর হাতের আঙুল ভেঙে গেছে।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, সাখাওয়াত হোসেন খান ও তাঁর অনুসারীরা তাঁদের ওপর হামলা চালান। তিনি আরও অভিযোগ করেন, পিপি নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাখাওয়াতের হস্তক্ষেপের চেষ্টা রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি ঘটনাটিকে বিব্রতকর উল্লেখ করে বলেন, একটি খাওয়ার আয়োজনকে কেন্দ্র করে তাঁকে অসম্মান করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগ তুলে নিজেদের অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই সামনে এসেছে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের বিষয়টি। বিশেষ করে আগামী আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কারা নেতৃত্বে থাকবেন এবং কোন প্যানেল বা প্রার্থীকে দলীয়ভাবে সমর্থন দেওয়া হবে তা নিয়ে এরই মধ্যে হিসাব শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
পিপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকিরের বক্তব্যেও আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি দাবি করেছেন, আইনজীবী ফোরামই নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নেবে। অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেন খানও দীর্ঘদিন আইনজীবী সমিতির নেতৃত্বে ছিলেন। ফলে পেশাগত সংগঠনের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাবÑদুই জায়গার সমীকরণই এই বিরোধকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার বিষয়ে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, এটি একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এখন বড় প্রশ্ন হলো, দলীয়ভাবে বিএনপি কীভাবে এ বিরোধ সামাল দেয়। কারণ নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আইনজীবী নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রয়েছে। আদালতপাড়ার এই বিরোধ যদি দ্রæত মীমাংসা না হয়, তাহলে তা দলীয় অন্যান্য সাংগঠনিক পর্যায়েও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির মতো বড় একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধ যখন প্রকাশ্যে হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়, তখন তা দলের ভাবমূর্তির জন্যও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের সময়ে এমন ঘটনা দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এখন নজর থাকবে বিএনপির সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের দিকে। দলটি কি দুই পক্ষকে নিয়ে বসে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নেবে, নাকি ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে সেটিই দেখার বিষয়। একই সঙ্গে আগামী আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে এই বিরোধ কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। মঙ্গলবারের হাতাহাতি হয়তো আদালতপাড়ার একটি দিনের ঘটনা। তবে এর মধ্য দিয়ে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কতটা গভীর, সেটিও এখন সামনে চলে এসেছে। আর সেই বিরোধ সামলানোই এখন স্থানীয় বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


































আপনার মতামত লিখুন :