‘ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী’ ৮০/৯০ এর দশকে ব্যবহৃত বিমান বাংলাদেশের প্রচারণামূলক একটি স্লোগান যা ওই সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বিমানযোগে বিশ্বের যে কোন প্রান্তে অল্প সময়ে পৌঁছে যাওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হতো স্লোগানটি, ভৌগলিক সীমা ছোট হয়ে আসার অর্থে নয়। ছোট হয়ে আসছে নারায়ণগঞ্জ কথাটি আক্ষরিক অর্থেই নারায়ণগঞ্জের ভৌগলিক সীমা ছোট হয়ে আসার অর্থে ব্যবহার করা যায়। দেশের সবচেয়ে ছোট জেলা নারায়ণগঞ্জ আরও ছোট হয়ে আসছে পূর্বাচলকে ঢাকার অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তে। দেশের বর্তমান জেলা সমূহ এক সময় মহকুমা ছিল। বৃহত্তর ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত নারায়ণগঞ্জ মহকুমার অধীনে নরসিংদী ছিল একটি থানা।
১৯৭৭ সনে নরসিংদী মহকুমায় ঊন্নীত হলে নারায়ণগঞ্জের সীমা ছোট হয়ে আসে। ১৯৮৪ সনে সকল মহকুমা জেলায় রূপান্তরিত হয়। নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ পৃথক জেলায় রূপান্তরিত হয়।
মজার ব্যাপার হলো নারায়ণগঞ্জ মহকুমার একসময়ের একটি থানা নরসিংদী নারায়ণগঞ্জের চেয়ে বড় জেলা হিসেবে আবির্ভূত হয়। পূর্বাচল ঢাকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তা আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনিক সুবিধার জন্যই মহকুমা সমূহ জেলায় রূপান্তর করা হয়। একসময়ের সকল মহকুমা জেলায় রূপান্তরিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৃহত্তর জেলার নামেই জেলাগুলোর পরিচিতি রয়ে গেছে।
এর পিছনে রয়েছে বৃহত্তর জেলার অভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। নোয়াখালী ভেঙে নোয়াখালী, ফেনী লক্ষীপুর, নামের তিনটি জেলা হলেও উক্ত এলাকার মানুষ বৃহত্তর নোয়াখালীবাসী হিসেবেই অধিক পরিচিত। একই কথা বৃহত্তর ১৯ টি জেলার ক্ষেত্রে কমবেশি প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে নারায়নগঞ্জ বরাবরই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত থাকাকালীন সময়েও এখানকার মানুষ নিজ পরিচয় প্রকাশে ঢাকা নয় নারায়ণগঞ্জকেই প্রাধান্য দিতো। নারায়ণগঞ্জ জেলা না থানা এটিও গুরুত্বপূর্ণ নয় তাদের কাছে।
নারায়ণগঞ্জবাসীর গর্ব তার সোনালী অতীত, ঐতিহ্য এবং বর্নিল বর্তমান নিয়ে। আকারে কত ছোট তাও বিষয় নয়।
একটি জেলা থেকে অন্য জেলাকে পৃথক করার মূলে ভৌগলিক সীমারেখা হলেও ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। পূর্বাচল বিচ্ছিন্ন হয়ে ঢাকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের আকার ছোট হবে কিন্তু পূর্বাচল হারাবে তার গর্বের অতীত, আজীবন লালিত নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দাবি।
যে প্রশাসনিক সমস্যার কথা বলে পূর্বাচলকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে তা কতটা যৌক্তিক এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। মোঘলযুগ থেকে অদ্যাবধি দেশের রাজধানী ঢাকা হলেও নারায়ণগঞ্জ বরাবরই ঢাকার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ছিল এখনও আছে। রাজধানীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখানে বিদ্যমান।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যাত্রা শুরু করে নারায়ণগঞ্জকে সঙ্গে নিয়ে যা একসময় ডিআইটি নামে পরিচিত ছিল। রাজধানীর অবিচ্ছেদ্য অংশটি পৃথক জেলা হওয়ায় কোন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে কি? তাহলে আলাদা পৌরসভা করে পুর্বাচলকে নারায়ণগঞ্জের সাথে রাখতে সমস্যা কোথায়? পশ্চিম বাংলার রাজধানী কলকাতা আশপাশের ৫টি জেলা উঃ ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলী, নদীয়া জেলার অংশ নিয়ে গঠিত। এরমধ্যে কলকাতা পৌর সংস্থা ছাড়াও ছোট বড় অনেকগুলো পৌরসভা, পঞ্চায়েত এলাকা ও নতুন শহরাঞ্চল রয়েছে। কলকাতা মহানগর অঞ্চল বা কেএমএ নামে পরিচিত রাজধানী শহরটি পরিচালিত হয় কলকাতা মেট্রোপলিটান ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা কেএমডিএ দ্বারা। এমন উদাহরণ আরও দেয়া যাবে। পূর্বাচলকে নারায়ণগঞ্জের অংশ হিসেবে রেখেও কি রাজধানীর অন্তর্ভুক্ত করা যেতো না? যেমনটি কলকাতা সহ অনেক দেশের রাজধানীর ক্ষেত্রে দেখা যায়! রাজধানী সম্প্রসারনের লক্ষ্যে আশপাশের জেলাকেও প্রয়োজনে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে সেই এলাকার নাম পরিচয় মুছে ফেলতে হবে কেন? একটি অঞ্চল তার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে এমন বিভাজন ওই অঞ্চলটিকে পরিচয় সংকটে ফেলে এলাকাবাসীর তীব্র মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রসারণের প্রয়োজনে যেকোন এলাকা রাজধানীর অন্তর্ভুক্ত করা যেতেই পারে এজন্য শুধুমাত্র রাজধানীর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ একক কর্তৃপক্ষের হাতে থাকলে কোন জটিলতা থাকবে না। আত্মপরিচয় সংকটে ভুগবে না সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী। বিষয়টি শুধু নারায়ণগঞ্জ নিয়ে নয়, পার্শ্ববর্তী গাজীপুরের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য। ভবিষ্যতে ঢাকার পার্শ্ববর্তী অন্যান্য জেলার ক্ষেত্রে একই দৃশ্য দেখা যেতে পারে।
অন্য জেলার মানুষ কোন পরিচয়ে সন্তুষ্ট হবেন সেটি তাদের ব্যাপার। তবে নারায়ণগঞ্জবাসী নিজ স্বত্ত্বা ও পরিচয়ে গর্বিত, আনন্দিত। রাজধানীর অন্তর্ভুক্ত হলেও নারায়ণগঞ্জের পৃথক স্বত্ত্বা অটুট থাকুক এমন প্রত্যাশা সকল নারায়ণগঞ্জবাসীর।
লেখক : বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।








































আপনার মতামত লিখুন :