News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রকাশ্য ও ফেসবুকে দুটি দলের পাল্টাপাল্টি, ভাগাভাগিতে ঐক্যমত


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২৬, ১০:৫১ পিএম প্রকাশ্য ও ফেসবুকে দুটি দলের পাল্টাপাল্টি, ভাগাভাগিতে ঐক্যমত

বিএনপি ও এনসিপি নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা, বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচীতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিলেও ভাগাভাগির ক্ষেত্রে নিজেদের চমৎকার মিল রয়েছে। ফতুল্লা ডিআইটি হাটের পর এবার কোরবানীর পশুর হাটেও কোথাও পার্টনার, আবার কোথাও কোথাও ১০ পার্সেন্ট কমিশনে রফাদফা করেছেন। সে কারণেই এবার হাটের ক্ষেত্রে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়নি। শান্তিময় পরিবেশেই নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করেছেন। তবে এ সিন্ডিকেটের কারণে সরকার বড় ধরনের রাজস্ব হারিয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিনের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত এনসিপি নেতা তারিকুল মূলত এসব হাটের দেখভাল করেন। তাঁর ও সহযোগিরা মিলেই বিভিন্ন হাট ঘাটের দরপত্র ক্রয় করেন। পরে বসেন সমঝোতায়। এখানে এমপি সরাসরি কোন কিছুতে হস্তক্ষেপ না করাতে তিনি থেকে যান বিতর্কের বাইরে। তবে ঝামেলা হলে আসে কঠোর বার্তা। বক্তাবলীর খেয়াঘাটের ইজারা নিয়ে ঝামেলার পর তিনি ওই বার্তা দিলেও বিশৃঙ্খলা জড়ানো নেতারাও তার আশীর্বাদপুষ্ট।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সদর উপজেলার এবার ১৩টি হাটের সবগুলোর বিপরীতে দরপত্র ক্রয় করেছিলেন এনসিপির নেতারা। পরে তাদের মধ্যে সমঝোতা হওয়াতে একের বেশী কেউ দরপত্র জমা করেনি। এর মধ্যে আলীগঞ্জ হাট নিয়ে এনসিপি নেতাদের সঙ্গে ১০ পার্সেন্ট কমিশনের চুক্তি হয়েছে। এছাড়া গোগনগর বাড়িরটেক, তালতলা, সাইনবোর্ড ও ভূইগড় সোনালী সংসদের হাটেও এনসিপির কতিপয় নেতাদের সঙ্গে বিএনপির ১০ থেকে ১২ পার্সেন্ট কমিশনে রফাদফা হয়। ফলে এসব হাটে এনসিপি কোন বিশৃঙ্খলা করেনি। এছাড়া কাশীপুর, বক্তাবলী ও মার্কাজ মসজিদের সামনের হাটে বিএনপি নেতারা টাকা লগ্নি করে পার্টনার হয়েছেন।

বিএনপি নেতারা জানান, গত রোজার পর থেকেই ১৩ হাটের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকে বিএনপির নেতারা। তারা গরুর বেপারীদের কোটি কোটি টাকা লগ্নি করেছে আগে থেকেই। এ কারণেই তাদের হাট না নিলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বিষয়টি নিয়ে এনসিপির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তারা এনসিপির নেতাদের এ বিষয়টি বুঝাতে সক্ষম হন যে বিএনপি হাট না নিলে এনসিপি নিলেও তারা চালাতে পারবে না। পরে  হাট নিয়ে তাদের মধ্যে সমঝোতা ঘটে।

রোজার ঈদের আগে ফতুল্লা ডিআইটি মাঠ সহ বিভিন্ন সেক্টরে ইজারা সম্পন্ন হয়। ইজারার আগে ফতুল্লা মাঠের নজর ছিল এনসিপি নেতাদের। তরিকুল নামের এনসিপি নেতা দরপত্র ক্রয় করেন। তিনি আবার বক্তাবলী খেয়াঘাটের দরপত্রও কিনেছিলেন। ডিআইটি মাঠের দরপত্র ক্রয়ের পর বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তাদের তিন দফায় বৈঠক হয়। শুরুতে এনসিপি নেতা তরিকুল বিএনপি নেতাদের কাছে ৩০ ভাগ কমিশন চায়। পরে দ্বিতীয় দফায় ২০ ভাগে নেমে আসে। তখন এনসিপির সঙ্গে জামায়াতও যুক্ত হয়। এ নিয়ে রাতভর জল্পনা শেষে দরপত্র দাখিলের দিন সকাল ১১টায় এক বৈঠকে এনসিপি ১০ ভাগে রাজী হয়। তখন এনসিপি নেতারা একজন জনপ্রতিনিধির নামেও কমিশন চেয়েছিল। শেষতক সমঝোতায় জামায়াত ও এনসিপি নেতারা দরপত্র দাখিল করেনি। সে কারণে বিএনপি নেতা পেয়ে যান মাঠের ইজারা।

২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হওয়া বক্তাবলীর রাজাপুর খেয়াঘাটের দরপত্র নিয়ে সমঝোতা না হওয়াতে বিএনপির পাশাপাশি এনসিপি, জামায়াত নেতারা দরপত্র জমা দিতে গেলে মারামারির ঘটনা ঘটে।

বক্তাবলী ঘাট নিয়েও একই পন্থায় আলোচনা শুরু হয় তিন চারদিন ধরে। এতে বক্তাবলীর বিতর্কিত রশিদ মেম্বার সহ আরো কয়েকজন সমঝোতায় রাজী না হলেও থানা বিএনপির সভাপতি শহীদুল ইসলাম টিটু সমঝোতার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

এদিকে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মত কোরবানির পশুর হাটকে ঘিরে নজর ছিলো সকলের। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশী ঘণবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় এখানে আগ্রহ ছিলো কয়েকগুন। সেই সাথে এই অঞ্চলে আধিপত্য রয়েছে এনসিপির। তবে হাটের টেন্ডারে একক ভাবে এগিয়ে আছে বিএনপি।

১৩ টি হাটের ইজারা ঘোষণাকালে দেখা যায় সিন্ডিকেটের প্রভাব। ১৩টি হাটের মধ্যে ৭টি হাটে দরপত্র জমা পড়েছে মাত্র ১টি করে। অর্থ্যাৎ এই হাটগুলোতে আর কোন আগ্রহীকে দরপত্র ফেলতে দেয়াই হয়নি। দুটি হাটে একাধিক দরপত্র জমা পড়লেও তা ছিলো সাজানো। আর উন্মুক্ত প্রতিযোগীতা দেখা গেছে চারটি হাটে। যেখানে উন্মুক্ত প্রতিযোগীতার মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতা হাটের ইজারা লাভ করেন।

একক দরপত্রে ইজারা নেয়া হাটের চিত্র

গোগনগর বাড়িরটেক অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি সর্বনিন্ম দর ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই হাটটি  ৭ লাখ ৬০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন সোহেল হোসেন। সরকারি দরের চাইতে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেশী দিয়ে ইজারা পেয়েছেন তিনি।

বক্তবলী বাজার সংলগ্ন অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি সর্বনিন্ম দর ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এই হাটটি ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন নজরুল ইসলাম। সরকারি দরের চাইতে মাত্র ৫ হাজার টাকা বেশী দিয়ে ইজারা পেয়েছেন তিনি।

কুতুবপুর ৯ নাম্বার ওয়ার্ড মার্কাজ মসজিদ সংলগ্ন অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি সর্বনিন্ম দর ২ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ টাকা। এই হাটটি ২ লাখ ৬০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন আরিফুর রহমান। সরকারি দরের চাইতে মাত্র ১৮ হাজার টাকা বেশী দিয়ে ইজারা পেয়েছেন তিনি।

সাইনবোর্ড শান্তিধারা মসজিদ সংলগ্ন অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি সর্বনিন্ম দর ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। হাটটি ১৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন শহিদুল ইসলাম টিটু। সরকারি দরের চাইতে মাত্র ২৫ হাজার টাকা বেশী দিয়ে ইজারা পেয়েছেন তিনি।

কুতুবপুরের অফসার ওয়েল মিল সংলগ্ন অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি সর্বনিন্ম দর ৭ লাখ ৫ হাজার টাকা। এই হাটটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন। সরকারি দরের চাইতে মাত্র ৪৫ হাজার টাকা বেশী দিয়ে ইজারা পেয়েছেন তিনি।

কুতুবপুর পাগলা ট্রাক স্টান্ড অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি সর্বনিন্ম দর  ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই হাটটি ৬ লাখ টাকা দিয়ে ইজারা পেয়েছেন হাজী শহিদুল্লাহ। সরকারি দরের চাইতে মাত্র ৫০ হাজার টাকা বেশী দিয়ে ইজারা পেয়েছেন তিনি।

গোগনগর পুরাতন সৈয়দপুর অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি সর্বনিন্ম মূল্য ৬২ লাখ ১১ হাজার ৩০০ টাকা। এই হাটটি ৯২ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ টাকায় ইজারা নিয়েছেন লুৎফর রহমান। সরকারি মূল্যের চাইতে ২৬ লাখ ৪৪ হাজার ১০০ টাকা বেশী দিয়ে ইজারা পেয়েছেন তিনি।

উপরোক্ত সবগুলো হাট ইজারা হয়েছে একক দরপত্রে। অর্থ্যাৎ এখানে আর কোন প্রতিযোগী ছিলো না। দরের চিত্র দেখলেই বোঝা যায় হাটগুলো ইজারা হয়েছে সরকারি দরের চাইতে নামমাত্র কিছু টাকা বেশী দিয়ে। যার কারনে সরকারি বিপুল পরিমান রাজস্ব হারিয়েছে।

নাটক সাজানো হয়েছে দুইটি হাটের ইজারায়

একই চিত্র দেখা গেছে আরও দুইটি হাটে। যেখানে সিন্ডিকেটের লোকজনই একাধিক দরপত্র দাখিল করে কমমূল্যেই হাটের ইজারা বাগিয়ে নিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে, গোগনগর স মিল সংলগ্ন অস্থায়ী পশুর হাট যার সরকারি সর্বনিন্ম দর ২ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ টাকা। হাটটি ২ লাখ ৬৬ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন হাবিবুর রহমান সেলিম। অর্থ্যাৎ সরকারি মূলের চাইতে মাত্র ৫০০ টাকা বেশী দর প্রদান করে ইজারা নেয়া হয়েছে হাটটি।

এই হাটে মোট তিনজন দরপত্র দাখিল করেন। বাকি দুজনের মধ্যে একজন সরকারি সর্বনিন্ম দর এবং আরেকজন সরকারি সর্বনিন্ম দরের চাইতেও কম মূল্যে দরপত্র দাখিল করে নিজের দরপত্র বাতিল করেন। ফলে মাত্র ৫০০ টাকা বেশী দিয়েই হাবিবুর রহমান ইজারা পেয়েছেন।

একইভাবে গোগনগরের আউয়ালের গুদারাঘাট সংলগ্ন হাটের সরকারি সর্বনিন্ম দর ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। হাটটি ২ লাখ টাকা দিয়ে পেয়েছেন লিটন মিয়া। সরকারি দরের চাইতে মাত্র ৬০ হাজার টাকা বেশী দিয়ে হাট পেয়েছেন তিনি। এই হাটে দুইজন দরপত্র দাখিল করেন। এর মধ্যে লিটন সরকারি দরের চাইতে বেশী টাকা দিলেও অপরজন সরকারি দরের চাইতেও কম মূল্য দেখান। ফলে সেটি বাতিল হয়।

উন্মুক্ত প্রতিযোগীতা হয়েছে মাত্র চারটি হাটে

উন্মুক্ত প্রতিযোগীতা হওয়া হাটগুলোর মধ্যে ডিক্রিরচর খেয়াঘাট সংলগ্ন অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি সর্বনিন্ম মূল্য ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এই হাটটিতে ৪ জন দরপত্র দাখিল করেন। সর্বোচ্চ ১০ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকায় হাটটি ইজারা পেয়েছেন আব্দুর রহমান। সরকারি দরের চাইতে ৬ লাখ টাকা বেশী দিয়েছেন ইজারাদার।

বক্তবলীয় প্রসন্ননগর অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি সর্বনিন্ম দর ৫১ হাজার টাকা। এই হাটে তিনটি দরপত্র জমা পড়েছে। সর্বোচ্চ ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়ে হাটটি ইজারা পেয়েছেন আবুল খায়ের। সরকারি দরের চাইতে ১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বেশী দিয়েছেন ইজারাদার।

কাশিপুর ওরিয়ন প্লান্ট সংলগ্ন অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি সর্বনিন্ম দর  ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এই হাটে দুজন দরপত্র জমা দিয়েছেন। সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন রাশেদুল ইসলাম। সরকারি মূল্যের চেয়ে ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা বেশী দিয়েছেন ইজারাদার।

ভূইগড় সোনালী সংসদ মাঠ অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি সর্বনিন্ম দর ৬ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এই হাটে দুজন দরপত্র জমা দিয়েছেন। সর্বোচ্চ ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন মাজেদুল হক মাজু। সরকারি দরের চাইতে ২৪ লাখ ১ হাজার টাকা বেশী দিয়েছেন ইজারাদার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, হাটগুলোতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাব থাকে। কিন্তু হাটের ইজারা নেয়ার জন্য নিজেদের সরকারকেই রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছেন নেতাকর্মীরা। তারা সিন্ডিকেট করে প্রতিপক্ষকে ইজারা নেয়া থেকে বিরত রাখছেন। আবার যারা দরপত্র কিনছে তাদেরকে রাতের আধারে ম্যানেজ করে ভাগ বাটোয়ারার মাধ্যমে দমিয়ে রাখছেন। যাতে স্বচ্ছতা হারাচ্ছে প্রশাসন। সেই সাথে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এমন সিন্ডিকেট বন্ধে একক দরপত্র জমা দেয়া হাটের ইজারা বাতিল করতে পারে প্রশাসন। সেই সাথে অস্বাভাবিক দরপত্র দাখিল হতে দেখলে পুনরায় টেন্ডার আহবান করা যেতে পারে।