নারায়ণগঞ্জ হেফাজত ইসলামের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পর বিদ্রোহ করে পাল্টা সভায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন কর্মীকে দেখা গেছে। ১৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে শহরের জামতলায় একটি রেস্টুরেন্টে ওই পাল্টা সভার আয়োজন করেন বহুল বিতর্কিত ফেরদাউসুর রহমান গং। সেখানে একাধিক ছবিতে দেখা গেছে, ৭-৮ জন পাঞ্জাবী টুপি পরিহিত লোক ছিল। আর সামনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন কর্মী ছিল। তাদেরকে নিয়ে কথিত প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে ফেরদাউসুরে একটি ক্যামেরায় পুরো বিষয়টি রেকর্ড করা হয়। সেখানে শুধু ফেরদাউসকে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। সামনে যারা ছিল তারা সকলেই শাহ নিজামের অনুসারী যুবলীগ ও ছাত্রলীগ কর্মী। নিজামের পক্ষে বিগত দিনে নানা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন ফেরদাউস। দুবাই থেকে এখনো নিয়মিত ফেরদাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচ্ছেন নিজাম।
ফেরদাউসুর রহমান সহ তাদের অনুসারীদের কোনো রকম পাত্তা না দিয়েই হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে শহরের ঐতিহাসিক ডিআইটি মসজিদ প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট জেলা ও মহানগরীর পৃথক দুটি কমিটি ঘোষণা করা হয়।
আর এসময়ে ফেরদাউসুর রহমানদের পাল্টা কমিটি ঘোষণা প্রসঙ্গে হেফাজত ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও জেলা সভাপতি মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেন, আমরা যখন কমিটি ঘোষণার দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখন আমাদের কিছু ভাই পাল্টা মহানগর কমিটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। আমরা তাদের সে কমিটির প্রতি কোনো কর্ণপাত করিনি।
মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেন, আমাদের কেন্দ্রীয় নেতারা যারা ছিলেন তারা এসে যেভাবে জেলা কমিটি এবং মহানগর কমিটি উপহার দিয়ে গেছেন তার বিপরীতে ভিন্ন কেউ নতুন করে কমিটির ঘোষণা দিবে এটা তেমন গ্রহণযোগ্য হয়নি। এটা নিয়ে আমরা ভাবছি না। আমরা চেষ্টা করবো তারা যেন তাদের ভুল বুঝে চলে আসুক; ভুল স্বীকার করে আসলে তাদের নিয়ে কাজ করতে আমাদের বাধা নেই।
এদিনের কমিটি ঘোষণার পরও মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান সহ তাদের অনুসারীরা পাল্টা সভা করে হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তাদেরকে নানাভাবে উস্কিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন।
হেফাজত নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালিন সময়ে তৎকালিন মহানগর হেফাজত ইসলামের সভাপতি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান ও তার অনুসারিরা শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতেন। সেই সাথে তাদের অনুসারীদের সাথেও মাওলানা ফেরদাউসের ভালো সম্পর্ক ছিলো। বিভিন্ন সময় ওসমানদের স্বার্থ আদায়ে মাওলানা ফেরদাউস হেফাজতের নেতাকর্মীদের নিয়ে কর্মসূচি পালন করতেন।
তৎকালিন সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যেই মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে আসছিলেন। বিভিন্ন সময় তাদের সম্পর্কের ঘনিষ্টতাও পরিরক্ষিত হয়। ২০২১ সালের ২০ মার্চ আলীরটেকের ডিক্রিরচর ঈদগাহ মাঠে ইসলামি মহাসম্মেলন করে ওলামা পরিষদ। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন তৎকালিন এমপি শামীম ওসমান। এসময় তিনি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে তার ছোট ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন। যা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো।
এর আগে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ২০১৬ সালের ১৩ মে বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান সেদিন শ্যামল কান্তিকে কান ধরে উঠবস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে এই ঘটনা প্রকাশ পেলে সারাদেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। এই ঘটনায় চাপের মুখে পড়ে যান ওসমান পরিবার।
ঠিক সে সময়েই তাদের পাশে দাঁড়ান নারায়ণগঞ্জ হেফাফতের নেতারা। ওই বছরের ২০ মে নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজত আয়োজিত শহরের ডিআইটি জামে মসজিদের সামনে ‘নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের মুসলিম জনতা’ ব্যানারে সমাবেশ করা হয়। সমাবেশ থেকে নারায়ণগঞ্জ হেফাজত নেতারা শ্যামল কান্তিকে শাস্তি দিতে সরকারকে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। সেই সাথে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে হরতাল- অবরোধ করে দেশ অচল করে দেয়ার ঘোষণা দেন।
অন্যদিকে ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়ে কটূক্তির অভিযোগ এনে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম (ক অঞ্চল) অশোক কুমার দত্তের আদালতে হেফাজতে ইসলাম নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সমন্বয়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান এই মামলা করেছিলেন।
২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মসজিদ ভেঙে শপিংমল ও মাদ্রাসা উচ্ছেদ করে পার্ক করার অভিযোগ এনে তৎকালিন মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে সমাবেশ করে নারায়ণগঞ্জ ওলামা পরিষদ। এদিন জুমার নামাজের পর শহরের চাষাঢ়া এলাকার বাগে জান্নাত মসজিদের সামনে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশের সভাপতি ছিলেন হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার সভাপতি ফেরদাউসুর রহমান। এভাবে একের পর বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ফেরদাউসের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতারা ওসমানীয় হেফাজত হিসেবে আখ্যা পান।
সেই সাথে বিভিন্ন সময় হেফাজত ইসলামের নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হলেও ফেরদাউস থাকতো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান মহানগর হেফাজত ইসলামকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন।




























-20260912144331.jpg)






আপনার মতামত লিখুন :