News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

শামীম ওসমান অনুসারীরা বাদ পড়ায় ফেরদাউসের নতুন চেষ্টা


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম শামীম ওসমান অনুসারীরা বাদ পড়ায় ফেরদাউসের নতুন চেষ্টা

নারায়ণগঞ্জ হেফাজত ইসলামে ‘ওসমানদের দালাল’ খ্যাত তথা ওসমানীয় হেফাজত হিসেবে পরিচিত ছিলেন মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান সহ তাদের অনুসারীরা। তারা আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে শামীম ওসমান সহ তার অনুসারীদের নির্দেশনায় কাজ করতেন। শামীম ওসমানের পক্ষ নিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রামের আয়োজন করতেন। ধর্মীয় লেবাসে শামীম ওসমানের পক্ষ নিয়ে ধর্মকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করার চেষ্টা করতেন।

এরই মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আর এই পতনের পর থেকেই ‘ওসমানদের দালাল’ খ্যাত তথা ওসমানীয় হেফাজত হিসেবে পরিচিত মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান সহ তাদের অনুসারীদের বয়কট করা হয়। সবশেষ ঘোষিত জেলা ও মহানগর হেফাজত ইসলামের কমিটিতে তাদের বাদ দেয়া হয়। তবে কমিটি থেকে বাদ পড়ে নিজেদের নিরব রাখতে পারছেন না। বরং শামীম ওসমান সহ তার অনুসারীদের নির্দেশনায় নারায়ণগঞ্জে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শামীম ওসমান সহ তার অনুসারীদের নির্দেশনায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতেন। তারই ধারাবাহিকতায় শামীম ওসামন সহ তার অনুসারীদের অনুপস্থিতে তাদের নির্দেশনায় নারায়ণগঞ্জ হেফাজত ইসলামের প্রত্যেক প্রোগ্রামের পরই পাল্টা সভার আয়োজন করছেন। পাল্টা বক্তব্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

জানা যায়, গত ২৬ আগস্ট মতবিনিময় সভার মধ্য দিয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে। মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন, হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও ঐতিহাসিক ডিআইটি মসজিদের খতীব মাওলানা আব্দুল আউয়াল।

সেই সাথে সভায় হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি হিসেবে আল্লামা আব্দুল আউয়াল, সিনিয়র সহ-সভাপতি মাওলানা আব্দুল কাদির (আমলাপাড়া মাদ্রাসা), সেক্রেটারি মুফতী বশীরুল্লাহ (মাদানীনগর মাদ্রাসা), সিনিয়র সহ-সেক্রেটারি মাওলানা বদরুল আলম সিলেটী (ইসলামী ঐক্যজোট), সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন খান (সোনারগাঁও), অর্থ সম্পাদক মাওলানা খুরশিদ আলম (আমলাপাড়া) এবং প্রচার সম্পাদক হিসেবে মুফতী শেখ শাব্বীর আহমাদ (খেলাফত মজলিস) নির্বাচিত হন।

একই সাথে মহানগর কমিটিতে সভাপতি হিসেবে মুফতী জাকির হুসাইন কাসেমী, সহ-সভাপতি মুফতী মামুনুর রশীদ (বিকেএম), সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুর রহমান (দেওভোগ মাদ্রাসা) এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে মুফতি মাহমুদুল হাসান কাসেমী (হাজীপাড়া মাদ্রাসা) নির্বাচিত হন।

কিন্তু এই কমিটির গঠনের পর প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর রাত ৯টার দিকে ফতুল্লার জামতলা এলাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পাল্টা কমিটি ঘোষণা করেন হেফাজতে ইসলাম কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী প্রচার সম্পাদক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান। সাত সদস্যের ওই কমিটিতে মাওলানা কামাল উদ্দিন দায়েমীকে সভাপতি এবং মাওলানা তাজুল ইসলাম আব্বাসকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছিলো। একই সাথে হেফাজত নেতাদের উদ্দেশ্য বিভিন্নভাবে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়া হয়। কিন্তু তাদের এই বক্তব্যকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি হেফাজত ইসলামের নেতারা।

পরবর্তীতে মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান সহ তাদের অনুসারীদের কোনো রকম পাত্তা না দিয়েই হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে শহরের ঐতিহাসিক ডিআইটি মসজিদ প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট জেলা ও মহানগরীর পৃথক দুটি কমিটি ঘোষণা করা হয়।

আর এসময়ে ফেরদাউসুর রহমানদের পাল্টা কমিটি ঘোষণা প্রসঙ্গে হেফাজত ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও জেলা সভাপতি মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেন, আমরা যখন কমিটি ঘোষণার দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখন আমাদের কিছু ভাই পাল্টা মহানগর কমিটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। আমরা তাদের সে কমিটির প্রতি কোনো কর্ণপাত করিনি।

মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেন, আমাদের কেন্দ্রীয় নেতারা যারা ছিলেন তারা এসে যেভাবে জেলা কমিটি এবং মহানগর কমিটি উপহার দিয়ে গেছেন তার বিপরীতে ভিন্ন কেউ নতুন করে কমিটির ঘোষণা দিবে এটা তেমন গ্রহণযোগ্য হয়নি। এটা নিয়ে আমরা ভাবছি না। আমরা চেষ্টা করবো তারা যেন তাদের ভুল বুঝে চলে আসুক; ভুল স্বীকার করে আসলে তাদের নিয়ে কাজ করতে আমাদের বাধা নেই।

এদিনের কমিটি ঘোষণার পরও মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান সহ তাদের অনুসারীরা পাল্টা সভা করে হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তাদেরকে নানাভাবে উস্কিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

তবে মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান সহ তাদের অনুসারীদের এই তৎপরতাকে শামীম ওসমান সহ তার অনুসারীদের নির্দেশনা হিসেবে মনে করছেন হেফাজত ইসলামের নেতারা। কারণ শামীম ওসমান সহ তার অনুসারী শাহ নিজাম সহ অনেকের সাথেই ফেরদাউসের ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিলো। বর্তমানে তারা ক্ষমতার বাইরে থাকায় দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। আর সেই চেষ্টার অংশ হিসেবেই ফেরদাউসুর রহমানকে হয়তো নির্দেশনা দিয়েছেন পাল্টা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নেতাদের উস্কিয়ে দেয়ার জন্য। ফেরদাউসের বক্তব্যে হেফাজতের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে এটার সুবিধাভোগী ওসমানরাই হবে। আর তাই তারা তাদের স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

হেফাজত নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালিন সময়ে তৎকালিন মহানগর হেফাজত ইসলামের সভাপতি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান ও তার অনুসারিরা শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতেন। সেই সাথে তাদের অনুসারীদের সাথেও মাওলানা ফেরদাউসের ভালো সম্পর্ক ছিলো। বিভিন্ন সময় ওসমানদের স্বার্থ আদায়ে মাওলানা ফেরদাউস হেফাজতের নেতাকর্মীদের নিয়ে কর্মসূচি পালন করতেন।

তৎকালিন সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যেই মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে আসছিলেন। বিভিন্ন সময় তাদের সম্পর্কের ঘনিষ্টতাও পরিরক্ষিত হয়। ২০২১ সালের ২০ মার্চ আলীরটেকের ডিক্রিরচর ঈদগাহ মাঠে ইসলামি মহাসম্মেলন করে ওলামা পরিষদ। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন তৎকালিন এমপি শামীম ওসমান। এসময় তিনি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে তার ছোট ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন। যা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো।

এর আগে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ২০১৬ সালের ১৩ মে বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান সেদিন শ্যামল কান্তিকে কান ধরে উঠবস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে এই ঘটনা প্রকাশ পেলে সারাদেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। এই ঘটনায় চাপের মুখে পড়ে যান ওসমান পরিবার।

ঠিক সে সময়েই তাদের পাশে দাঁড়ান নারায়ণগঞ্জ হেফাফতের নেতারা। ওই বছরের ২০ মে নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজত আয়োজিত শহরের ডিআইটি জামে মসজিদের সামনে ‘নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের মুসলিম জনতা’ ব্যানারে সমাবেশ করা হয়। সমাবেশ থেকে নারায়ণগঞ্জ হেফাজত নেতারা শ্যামল কান্তিকে শাস্তি দিতে সরকারকে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। সেই সাথে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে হরতাল- অবরোধ করে দেশ অচল করে দেয়ার ঘোষণা দেন।

অন্যদিকে ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়ে কটূক্তির অভিযোগ এনে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম (ক অঞ্চল) অশোক কুমার দত্তের আদালতে হেফাজতে ইসলাম নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সমন্বয়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান এই মামলা করেছিলেন।

২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মসজিদ ভেঙে শপিংমল ও মাদ্রাসা উচ্ছেদ করে পার্ক করার অভিযোগ এনে তৎকালিন মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে সমাবেশ করে নারায়ণগঞ্জ ওলামা পরিষদ। এদিন জুমার নামাজের পর শহরের চাষাঢ়া এলাকার বাগে জান্নাত মসজিদের সামনে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশের সভাপতি ছিলেন হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার সভাপতি ফেরদাউসুর রহমান। এভাবে একের পর বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ফেরদাউসের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতারা ওসমানীয় হেফাজত হিসেবে আখ্যা পান।

সেই সাথে বিভিন্ন সময় হেফাজত ইসলামের নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হলেও ফেরদাউস থাকতো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান মহানগর হেফাজত ইসলামকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন।