News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩

৫ হাজার কোটি টাকা রপ্তানি করা বিসিকের করুণ দশা


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: আগস্ট ২২, ২০২৬, ১০:১৬ পিএম ৫ হাজার কোটি টাকা রপ্তানি করা বিসিকের করুণ দশা

বাংলাদেশের নিটওয়্যার ও হোসিয়ারি শিল্পের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা বিসিক। প্রতিবছর এই শিল্পনগরী থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই শিল্পাঞ্চলে কর্মরত প্রায় পৌনে তিন লাখ শ্রমিক। অথচ বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এই কেন্দ্রের ভেতরের সড়ক, ড্রেনেজ ও অন্যান্য অবকাঠামোর বেহাল দশায় প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের।

নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি এলাকায় প্রায় ৫৮ দশমিক ৫২ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে ফতুল্লা বিসিক হোসিয়ারি শিল্পনগরী। এখানে ৭২৯টি প্লটের বিপরীতে রয়েছে ৪২৯টি শিল্প ইউনিট। দেশের নিটওয়্যার ও হোসিয়ারি খাতের অন্যতম বড় উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই শিল্পনগরীর উৎপাদিত পোশাক দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবে শিল্পনগরীতে প্রবেশ করলেই অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের বৈপরীত্য চোখে পড়ে।

দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অপর্যাপ্ত সংস্কারের কারণে অধিকাংশ সড়ক ভাঙাচোরা। কোথাও তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত, কোথাও উঠে গেছে সড়কের পিচ। এর সঙ্গে অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুরো শিল্পনগরীর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই ফতুল্লা বিসিকের বিভিন্ন সড়কে জমে যায় হাঁটুপানি। কোথাও কাদা, কোথাও সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। অনেক সময় পানি ঢুকে পড়ে কারখানার ভেতরেও। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে মূল্যবান কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্যের।

ড্রেনগুলো সংকীর্ণ ও অনেক জায়গায় ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ থাকে না। এর ওপর পেছনের খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নামার পথও অনেকটা সংকুচিত হয়েছে। বর্ষা এলেই তাই জলাবদ্ধতা যেন নিত্যদিনের সমস্যায় পরিণত হয়। শুধু বর্ষাকালেই নয়, শুষ্ক মৌসুমেও ভোগান্তি থেকে রেহাই পান না শ্রমিকরা। ভাঙাচোরা সড়কে ভারী যানবাহন চলাচলের সময় ধুলাবালি উড়তে থাকে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের কর্মস্থলে যাতায়াতেও তৈরি হচ্ছে দুর্ভোগ। দিনের শুরুতেই কর্মস্থলে পৌঁছাতে অনেকের কাছে পথ পাড়ি দেওয়া যেন এক ধরনের যুদ্ধ।

বিসিকের এক শ্রমিক রফিক আহমেদ বলেন, ‘বিসিকে সারাবছরই রাস্তায় কাদা থাকে। চলাচল করতে পারি না। অনেক সময় রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে কাপড়চোপড়ে কাদা লাগে। সেই কাদা মাখানো জামা নিয়েই সারাদিন অফিস করতে হয়।’

নারী শ্রমিক রিনা আক্তার বলেন, ‘আমি এই বিসিকে প্রায় পাঁচ বছর ধরে কাজ করছি। প্রথম থেকেই দেখছি, বৃষ্টির সময় চলাচল করতে পারি না। রাস্তায় পানি জমে থাকলে আমরা নারী শ্রমিকরা চলাচল করতে গিয়ে অনেক অসুবিধায় পড়ি। আবার দেরি করে গেলে মালিকপক্ষও নানা কথা বলে।’

আরেক শ্রমিক ইসরাফিল হোসেন বলেন, ‘বিসিকে যে রকম উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল, রাস্তা-ঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাও সে রকম হয়নি। বৃষ্টি হলে চলাচলের কোনো উপায় থাকে না। এতে মালিকদের ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটছে। কারখানা কর্তৃপক্ষ সমস্যায় পড়লে আমাদের শ্রমিকদেরও সমস্যায় পড়তে হয়।’

শ্রমিকদের পাশাপাশি শিল্পনগরীর অবকাঠামোগত দুরবস্থা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকদের মধ্যেও। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহ-সভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, ‘বিসিকে সুবিধার চেয়ে সমস্যার শেষ নেই। সুবিধা বলতে আমরা কিছুই পাচ্ছি না। দুটি প্রধান সড়ক ও কয়েকটি উপসড়ক ছাড়া অধিকাংশ সড়কই বেহাল।’তিনি বলেন, ‘ড্রেনে স্ল্যাব নেই। ড্রেনের ভেতরে ময়লা জমে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। ময়লা ফেলার জন্য কোনো ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থা নেই। ফলে বিসিকের বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে।’

শিল্পনগরীর পরিবেশ নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে মোরশেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, ‘বায়ার নিয়ে বিসিকে প্রবেশ করলেই অস্বস্তিকর পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়। বায়াররা এসে স্বস্তি পান না। আমাদের প্রত্যেকটি ফ্যাক্টরি থেকে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ চার্জ নিয়ে থাকে। কিন্তু সে অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না। ইউনিয়ন পরিষদও চার্জ নিচ্ছে, কিন্তু সুবিধা দিচ্ছে না। সব মিলিয়ে আমরা কোনো রকম সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।’

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে জমজমাট বিসিক হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরী। এখানে প্রায় পাঁচ শতাধিক ছোট, বড় ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সবগুলো প্রতিষ্ঠানই এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি। এসব প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নিটিং ও ডাইং প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে।’

তিনি জানান, এই শিল্পাঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। দুপুরে খাবারের সময় কিংবা শুরু ও ছুটির সময়ে গেলে স্রোতের মতো মানুষকে চলাচল করতে দেখা যায়।

মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, ‘এই অবস্থার মধ্যে প্রধান দুটি সড়ক ছাড়া অলি-গলির প্রায় সব সড়কই সামান্য বৃষ্টিতে পানির নিচে চলে যায়। ফলে শ্রমিকদের যাতায়াতে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গার্মেন্টসের পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও মারাত্মক অসুবিধা হচ্ছে।’

তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘আপনারা এসে দেখে যান, আমরা কী অবস্থায় আছি। আমাদের এই অবহেলিত শিল্পনগরীকে দেখে যান। এখান থেকে প্রতিবছর ৫ হাজার কোটি টাকা রপ্তানি হয়। অথচ আমরা কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না।’

তবে শিল্পনগরীর অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে অর্থ বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন বিসিক কর্তৃপক্ষ। ফতুল্লা বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এখানকার সমস্যাগুলো সমাধান করতে হলে সরকারি বড় বরাদ্দ প্রয়োজন। বাংলাদেশে ৮৩টি শিল্পনগরী চালু আছে। এই ৮৩টি শিল্পনগরীর জন্য সব মিলিয়ে ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকা বাজেট দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী আমরা প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাই না।’

তিনি বলেন, ‘এখানে প্রায় ৪১টি সড়ক আছে। এর মধ্যে ৭ থেকে ৮টি রাস্তার কাজ করা হয়েছে। অর্থ বরাদ্দের জন্য বহুবার চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে।’বিসিক কর্মকর্তা আরও জানান, সর্বশেষ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিল্পনগরীর সমস্যাগুলো তুলে ধরে একটি ডকুমেন্টারি আকারে ৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। মন্ত্রণালয় সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করে জানায়, ৫০ কোটি টাকায়ও প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। পরে আরও বিস্তারিতভাবে প্রস্তাব দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী নতুন করে প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে।

মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সেই প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। আশা করি, প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে শিল্পনগরীর সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।’