News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২

৪ এপ্রিল বন্দর গণহত্যা দিবস


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | রফিউর রাব্বি প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৬, ০৮:৩৯ পিএম ৪ এপ্রিল বন্দর গণহত্যা দিবস

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলা কালে দেশের বিভিন্ন প্রন্তে সংঘটিত গণহত্যার প্রকৃত তথ্য ও চিত্র এখনো আমাদের মূল ইতিহাসের সাথে যুক্ত হতে পারে নি। এ সব তথ্য ও সংবাদ এখনো অনুদঘাটিত এবং অবহেলিত। আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ত্রিশলক্ষ বলে থাকি, কিন্তু দেশের সকল গণহত্যার প্রকৃত তথ্য তুলে আনলে এ সংখ্য তার চেয়েও অনেক বেশি হবে বলে এখন অনেক গবেষকই মত প্রকাশ করছেন। কয়েকদিন আগে দেশের বিশটি জেলায় গণহত্যার পরিসংখ্যান সংবলিত একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানেও তারা গণহত্যার প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার ব্যপারে মত প্রকাশ করেছেন।

নারায়ণগঞ্জে অনেক গুলো গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। এখানে রয়েছে ভয়াবহ বর্বরতার স্বাক্ষর বহু বদ্ধভূমি। এখানে সংঘটিত হয়েছে প্রায় ১০৯টি গণহত্যা, রয়েছে ৩৩টিরও বেশি বধ্যভূমি ও গণকবর, রয়েছে ৪৬টি নির্যাতনকেন্দ্র। যেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরপরাধ নিরীহ মানুষদের নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তবে সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ও গৌরবের সে উপাখ্যান এখনো সংগ্রহ করা যায় নি। এখানে নেই কোন শহীদের তালিকা। নারায়ণগঞ্জের উল্লেখযোগ্য বদ্ধ্যভূমি ও গণ কবর হচ্ছে বক্তাবলী বদ্ধভূমি, বন্দর সিরাজদৌল্লা ক্লাব বদ্ধ্যভূমি, ডিক্রির চর বদ্ধ্যভূমি, রাজাপুর বদ্ধ্যভূমি, লক্ষ্মীনগর বদ্ধ্যভূমি, আদমজী জুটমিল বদ্ধ্যভূমি, আদমজীর শিমুলপাড়া বিহারি কলোনি বধ্যভূমি, হরিহরপাড়া বদ্ধ্যভূমি, আলীগঞ্জ সরকারী পাথর ডিপো বদ্ধ্যভূমি, পাগলা ইটভাটা বদ্ধ্যভূমি, আলীগঞ্জ বদ্ধ্যভূমি, কবির রাবার উন্ড্রাস্টিজ বদ্ধ্যভূমি, পাকিস্তান ন্যাশনাল ওয়েল ডিপো বদ্ধ্যভূমি, পাগলার কালির ঢিপি বদ্ধ্যভূমি, দৌলেশ্বর তেল মিল বদ্ধ্যভূমি, ব্যাকল্যান্ড গভর্নর জেটি বদ্ধ্যভূমি, আড়াই হাজার বদ্ধ্যভূমি, উদ্ধবগঞ্জ বদ্ধ্যভূমি, দক্ষিণপাড়া (সোনারগাঁ) বদ্ধ্যভূমি, ঢাকা বাজু আনসার ক্লাব নির্যাতন বদ্ধভূমি, ভোলাব বদ্ধ্যভূমি ইত্যাদি।

নারায়ণগঞ্জে প্রথম গণহত্যা সংঘটিত হয় ২৭ মার্চ মাসদাইর কবরস্থান এলাকায়। এইটি প্রথম প্রতিরোধ গণহত্যা। ৪ এপ্রিল সংঘটিত হয় বন্দর গণহত্যা। জেলার মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, বদ্ধভূমির প্রকৃত তথ্য এখনো অনুদ্ঘাটিত। নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের যথাযথ ইতিহাস এখনো উঠে আসেনি। শহীদদের কোন তালিকা নেই। প্রশাসনের কাছেও নেই। নারায়ণগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দু’একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হলেও, সে সবের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু এর শুরুটা যে হয়েছে, এইটিই সুখের বিষয়।

শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ শহর, পূর্ব পাড়ে বন্দর। একসময় বন্দর পাটের কল, জাহাজ নির্মাণের ডকইয়ার্ড ও খাদ্য গুদামের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। কদম-রসুল দরগাহ্র কারণে আড়াই’শ বছর ধরে পূর্ব বঙ্গে বন্দর গুর”ত্ব পেয়ে এসেছে। বৃটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলে ইংরেজ ও আর্মেনিয়দের মাঝেমধ্যে বিচরণ করতে দেখা গেলেও অবাঙালি বিহারিদের পদচারণা কখনোই ছিল না। কিন্তু সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের পরে রেডক্রসের উদ্যোগে বন্দরের বিভিন্ন স্থানে অবাঙালি বিহারিদের রিফিউজি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। পরে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পেতে এমন দাঁড়ায় যে কিছু কিছু পাড়া-মহল্লা ও এলাকা তারা দখলে নিয়ে নেয়।

বন্দর শহরতলি হলেও ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বিভিন্ন জাতীয় সংগ্রামে সব সময় গুর”ত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ষাটের দশকে আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনে বন্দরের ছিল সাহসী ভূমিকা। সে সময় সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের মাধ্যমে বন্দরের যুবক ও সংস্কৃতি কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। ঊনসত্তরের ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে আইয়ূব খানের বিরুদ্ধে দেশবাসী রায় ঘোষণা করলে, এর কয়েকদিন পর একুশে ফেব্রুয়ারি সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের সদস্যরা বন্দরে বিভিন্ন বাড়ি-ঘর ও দোকান-পাটে কালো পতাকা উড়িয়ে ছিলেন। বন্দরে বসবাসরত বিহারিদের নেতা আইয়ূব মাস্টারের আইয়ূব রেস্টুরেন্টেও তখন ক্লাব সদস্যরা কালো পতাকা উড়িয়ে দেন। কিন্তু পতাকা উত্তোলনের কিছুক্ষণ পর আইয়ূব মাস্টার কালো পতাকা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলে এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পরে। ক্লাব সদস্যদের নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ জনতা আইয়ূব রেস্টুরেন্ট ও কনভেনশন মুসলিম লীগের সে সময়ের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সচিব মোহাম্মদ আলীর বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। যার ফলে সিরাজদ্দৌলা ক্লাব সদস্য ও এলাকার যুবকদের প্রতি বিহারি ও মুসলিম লীগের লোকদের ছিল প্রচণ্ড ক্ষোভ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই আইয়ূব মাস্টার ও মোহাম্মদ আলীর বাড়ি দু’টিই হয়ে উঠেছিল বন্দরে পাক সেনাদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প।

একাত্তরে সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন শুর” হলে মার্চের ১৭-১৮ তারিখ সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের নেতৃত্বে বন্দরে প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। এ প্রতিরোধ কমিটি বিহারিদের কাছ থেকে প্রায় চল্লিশটি রাইফেল-বন্দুক ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একটি অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তোলেন। ২৫ মার্চ টিক্কাখানরা যখন ঢাকায় অপারেশন সার্চ লাইটের নামে হাজার-হাজার নিরীহ বাঙালিকে  হত্যা করে চলেছে; বন্দরে তখন সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের মাঠে মঞ্চস্থ হচ্ছে সাত্তার ভূইয়া রচিত ও এস এম ফারুক পরিচালিত ‘অমর বাঙালি’ নাটক। যে নাটক পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তখন বাঙালির রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এসব কারণে তখন বিহারিদের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল সিরাজদ্দৌলা ক্লাব।

একাত্তরের ২৮ মার্চ সকালে পাকবাহিনী নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। সপ্তাহ পরে ৪ এপ্রিল ভোররাতে বিহারিদের সহায়তায় পাক হানাদারবাহিনী নবীগঞ্জঘাট ও দক্ষিণের কেরোসিনঘাট দিয়ে একসঙ্গে বন্দরে প্রবেশ করে। নবীগঞ্জ দিয়ে পাড় হওয়া গ্র”পটি ইস্পাহানী ও জেলেপাড়ার বহু বাড়ি-ঘর গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় এবং এ এলাকা থেকে বহু লোককে ধরে বন্দর সিরাজদ্দৌলা ক্লাব মাঠে নিয়ে হাজির করে। ক্লাব মাঠে আসতে পথের দু’পাশের অসংখ্য বাড়ি-ঘর পাক সেনারা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। কেরাসিনঘাট দিয়ে পাড় হওয়া গ্রুপটি ডকইয়ার্ডে দিয়ে উঠে সামনে অগ্রসর হয়ে হিন্দু-অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিতে থাকে। লালজির আখড়া ও বৃন্দাবন আখড়া গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়ে সেখান থেকে বহু লোককে ধরে সিরাজদ্দৌলা ক্লাব মাঠে নিয়ে আসে। পাক সেনাদের উভয় গ্র”পই সকাল ন’টার মধ্যে ক্লাব মাঠে এসে পৌঁছে। সে সময় মাঠের ক্লাব ঘরে আশ্রয় নেয়া সাধারণ মানুষ ও ধরে আনা বন্দিদের মোট ৫৮ জনকে পাক সেনারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে প্রথমে গুলি করে হত্যা করে। পরে আশপাশের বাড়িঘর থেকে কাপড়-চোপড় ও মূলিবাঁশের বেড়া এনে লাশের উপরে ফেলে গানপাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সন্ধ্যার পূর্বে হানাদার বাহিনী শীতলক্ষ্যা পাড় হয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে চলে আসে। বন্দর বিরাণভূমিতে পরিণত হয়। বাড়ি-ঘর ফেলে জ্ঞানশূন্য সমস্ত মানুষ দিগি¦দিক পালিয়ে যেতে থাকে। লাশের স্তূপ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসেন মুজিবুর রহমান কচি নামের এক কিশোর। পোড়া বাড়ি-ঘর, মৃত মানুষের গন্ধ আর স্বজনহারা মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে শীতলক্ষ্যার পূর্বপারের বাতাস। রাতেই বন্দরের বিভিন্ন এলাকা বিরান-ভূমিতে পরিণত হয়। রাত গভীর হলে সে ক্লাব মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে এলাকাবাসী ৫৪ জন হিন্দু-মুসলমান শহীদদের একসাথে গণ-কবরে সমাহিত করে। ধ্বংসস্তুপ আর অগ্নিদগ্ধ বন্দরের পাড়ে আছরে পড়তে থাকে শীতলক্ষ্যার কালঢেউ সারা রাত ক্ষোভে, দুঃখে, বিদ্রোহে ভোরের সূর্যোদয় পর্যন্ত।

রফিউর রাব্বি : লেখক, সংস্কৃতি কর্মী