News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

হাসপাতালের গেটেই দালাল, প্রেসক্রিপশনেই টেস্ট-বাণিজ্য


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | আসামাউল হুসনা প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম হাসপাতালের গেটেই দালাল, প্রেসক্রিপশনেই টেস্ট-বাণিজ্য

জেলার একটি সরকারি হাসপাতালের বাইরে একজন মা দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে পরীক্ষার একটা লম্বা তালিকা। ডাক্তার দেখানো শেষ, কিন্তু চিকিৎসা শুরু হয়নি। পাশ থেকে একজন এগিয়ে এলেন, “আপা, এই টেস্টগুলো এখানে হবে না, আমার সাথে আসেন, স্যার ওই ক্লিনিকে বসেন।” এই একটি মুহূর্তেই নারায়ণগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবার আসল চেহারা ধরা পড়ে। এটি কোনো একটি হাসপাতালের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, জেলার প্রধান সরকারি হাসপাতালগুলোর নিত্যদিনের বাস্তবতা।

শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের বড় অংশ চিকিৎসার জন্য নির্ভর করেন সরকারি হাসপাতালের ওপর, অন্তত স্বল্প খরচে সেবা পাওয়ার আশায়। কিন্তু চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় আরেক বাস্তবতা। একের পর এক পরীক্ষার তালিকা, যার বেশিরভাগ সরকারি হাসপাতালে করার সুযোগ নেই। আর যেসব পরীক্ষা কাগজে-কলমে করার ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও প্রায়ই দেখা যায় মেশিন বিকল, প্রয়োজনীয় কিটের সংকট কিংবা জনবলের অভাব। ফলে রোগীকে শেষ পর্যন্ত বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দ্বারস্থ হতেই হয়।

হাসপাতালের গেট বা করিডরে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিরা নিজেদের স্টাফ পরিচয় দিয়ে নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম বলে দেন। “স্যার এই সেন্টারেই বসেন”, “এখান থেকেই টেস্ট করালে রিপোর্ট ভালো হবে” এই কথায় রোগী ও তার স্বজনকে কার্যত নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়। এটি শুধু দালালচক্রের সক্রিয়তা নয়, এটি এক অঘোষিত টেস্ট-বাণিজ্য, যেখানে রোগীর প্রয়োজনের চেয়ে আর্থিক লেনদেনই মুখ্য।

গত এপ্রিলে ভ্রাম্যমাণ আদালত ৩০০ শয্যা হাসপাতাল এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে দালালচক্রের সদস্য এবং একাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে জরিমানা করেছে, লাইসেন্সবিহীন পরিচালনা, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসাসেবা পরিচালনার অভিযোগে। কিন্তু এই অভিযান সমস্যার গভীরে পৌঁছাতে পারেনি। জরিমানা খাওয়া প্রতিষ্ঠান কয়েকদিন পরই আবার একই কায়দায় চালু হয়ে যায়। কারণ ব্যবস্থাটাই অটুট। শুধু উপসর্গে হাত দিলে রোগ সারে না।

সংকট আরও গভীর জায়গায়। ৩০০ শয্যা হাসপাতাল এবং নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল জেলার এই দুই প্রধান সরকারি হাসপাতালে জরুরি সেবার অবস্থা এতটাই নাজুক যে মুমূর্ষু রোগীকেও প্রায়ই ঢাকায় রেফার করা হয়। শিল্পসমৃদ্ধ এই জেলায় হার্ট অ্যাটাকের রোগী ঢাকায় নেওয়ার পথেই জীবন হারান। এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।

বেসরকারি ক্লিনিকে প্রসূতি সেবার চিত্রও উদ্বেগজনক। গর্ভবতী নারীকে বলা হয়, “বাচ্চার অবস্থা খারাপ, এখনই অপারেশন না করলে ঝুঁকি।” আতঙ্কিত পরিবার দ্বিতীয় মতামত নেওয়ার সুযোগই পায় না। যেখানে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব, সেখানেও অপারেশন করা হয়। মা ও নবজাতকের অপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবারের আর্থিক বিপর্যয় একসঙ্গে নেমে আসে। চিকিৎসা যখন প্রয়োজনের বদলে মুনাফার হিসাবের কাছে পরাজিত হয়, তখন এমন ঘটনাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।

একজন গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাচালক কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের উপার্জনকারী মানুষের কাছে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট বা সিজারের বিল শুধু টাকার অঙ্ক নয়। এটি সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া, সংসারের শেষ সঞ্চয় নিঃশেষ হওয়া এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার গল্প। চিকিৎসা খাতে সাধারণ মানুষের আস্থা আজ তলানিতে, আর এই অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর ধরে হয়রানি, ভোগান্তি ও প্রতারণার অভিজ্ঞতা থেকে।

স্থায়ী সমাধান পেতে হলে তিনটি জায়গায় হাত দিতে হবে। লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নে প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকদের কমিশন-নির্ভর প্রেসক্রিপশন সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অসৎ যোগসাজশ ভাঙতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি সচল রাখা, পর্যাপ্ত কিট সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিশেষায়িত জরুরি চিকিৎসা সুবিধা গড়ে তোলাও জরুরি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এককভাবে এই কাজ করতে পারবে না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত সংস্কার।

একটি শহরের সভ্যতার পরিমাপ হয় তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি কতটা মর্যাদার সঙ্গে চিকিৎসা পায়, তা দিয়ে। নারায়ণগঞ্জে যদি রোগী সুস্থ হওয়ার আগেই নিঃস্ব হয়, ঢাকায় নেওয়ার পথেই জীবন হারায়, কিংবা অপ্রয়োাজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অপারেশনের বোঝা বহন করতে বাধ্য হয়, তবে সেটি শুধু স্বাস্থ্যখাতের ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি।

চিকিৎসা নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এটি দয়া নয়, অনুগ্রহ নয়, ব্যবসাও নয়। এই অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের হাসপাতালগুলোতে মানুষের অসহায়ত্বের বাণিজ্য চলতেই থাকবে।