News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩

এনডিএ: স্বপ্নপূরণের পর এবার বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | আসামাউল হুসনা প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম এনডিএ: স্বপ্নপূরণের পর এবার বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

যে শহর বহু বছর ধরে দেশকে সুতো দিয়েছে, কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ বোনার সুযোগ পায়নি। বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ। দেশের রপ্তানি আয়, শিল্প উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানে এ জেলার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুগের পর যুগ ধরে "প্রাচ্যের ড্যান্ডি" হিসেবে পরিচিত এই নগরী দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাব ছিল স্পষ্ট। নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ, যানজট, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন শহরটির সম্ভাবনাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। এই বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনডিএ) গঠন নতুন আশার সঞ্চার করেছে এবং সুশৃঙ্খল নগর উন্নয়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে এই অর্জন একদিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের দাবি, আলোচনা, নীতিগত উদ্যোগ এবং বিভিন্ন অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টা। বিশেষ করে ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে সামনে আনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে জনমত গঠনের চেষ্টা করা হয়েছে।

গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) প্রায় এক হাজার ব্যবসায়ীর উপস্থিতিতে স্বতন্ত্র নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়। উপস্থিত ব্যবসায়ীরা সর্বসম্মতিক্রমে এই দাবির প্রতি সমর্থন জানান। অনেকের মতে, নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন প্রশ্নে ব্যবসয়ী সমাজের পক্ষ থেকে এত বড় পরিসরে এ ধরনের দাবি এর আগে কখনও উত্থাপিত হয়নি। সেই সভা মূলত দীর্ঘদিনের দাবিকে একটি সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

এই দাবির পেছনে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দীপুর ধারাবাহিক ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এজিএমের আগেই তিনি বিভিন্ন সভা, মতবিনিময় অনুষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জের জন্য পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর আওতায় থেকে নারায়ণগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। শিল্পনগরী হিসেবে শহরটির বিশেষ চাহিদা থাকলেও ঢাকাকেন্দ্রিক পরিকল্পনার কারণে স্থানীয় বাস্তবতা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। ফলে নগর সম্প্রসারণ ঘটেছে, কিন্তু নগর ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খল হয়নি। ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে এই যুক্তি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয় এবং পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দাবিকে শক্তিশালী করা হয়।

একইসঙ্গে বিকেএমইএ-এর সহ-সভাপতি (অর্থ) ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেলও বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে আনেন। শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামোগত সংকট, সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, জলাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগবান্ধব নগর পরিবেশ সৃষ্টির প্রশ্নে তিনি পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব তুলে ধরেন। শিল্প ও ব্যবসা খাতের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশের জন্য সুষম নগর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজরনীয়তার বিষয়টি তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেন।

অন্যদিকে প্রশাসনিক পর্যায়ে বিষয়টি এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্রশাসক ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়, নীতিগত আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ বিষয়টিকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

ব্যবসায়ী সমাজের দাবির পাশাপাশি প্রশাসনিক সুপারিশ এবং সরকারি পর্যায়ের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় বিষয়টি আইন প্রণয়নের পর্যায়ে পৌঁছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে "নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬" উত্থাপিত হয় এবং আলোচনা শেষে বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি দাবি আইনি ভিত্তি লাভ করে এবং নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের পথ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হয়। ব্যবসায়ী সমাজের দাবি, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের সমন্বয়েই এই প্রক্রিয়া সফলতার মুখ দেখে। ফলে এনডিএ গঠনকে অনেকেই নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করছেন।

তবে নতুন একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান নিহিত নয়। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নির্ভর করে তার কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ওপর। পর্যাপ্ত জনবল, দক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদ, আর্থিক সক্ষমতা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত না হলে প্রত্যাশিত উন্নয়ন বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। তাই এনডিএ'র সামনে যেমন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, তেমনি রয়েছে বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জও।

এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এই নতুন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নগরবাসী কী ধরনের পরিবর্তন প্রত্যাশা করেন?

প্রথমত, একটি বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি মাস্টার প্ল্যান। নারায়ণগঞ্জে কোথায় শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারিত হবে, কোথায় আবাসিক এলাকা গড়ে উঠবে, কোথায় জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ করা হবে এবং কীভাবে ভবিষ্যৎ নগরায়ণ পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ। বর্ষা মৌসুমে নগরবাসীর অন্যতম বড় দুর্ভোগ হচ্ছে জলাবদ্ধতা। আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনরুদ্ধার এবং সমন্বিত পানি নিষ্কাশন পরিকল্পনা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। শিল্প ও বাণিজ্যনির্ভর একটি শহরের জন্য কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিত সড়ক নেটওয়ার্ক, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নগর পরিবহন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি।

চতুর্থত, পরিবেশ সংরক্ষণ। শীতলক্ষ্যা নদী, খাল, জলাশয় এবং নগর পরিবেশ রক্ষা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

এই প্রেক্ষাপটে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রথম চেয়ারম্যান মাশুকুল ইসলাম রাজীবের প্রতি নাগরিকদের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রথম নেতৃত্বই তার ভবিষ্যৎ কর্মধারা ও সাংগঠনিক সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মাণ করে। নগরবাসী আশা করেন, তিনি দ্রুত একটি বাস্তবমুখী ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেবেন এবং প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালিত হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প অনুমোদন, উন্নয়ন ফি নির্ধারণ এবং ঠিকাদারি কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি নাগরিক সম্পৃক্ততা, এই বিষয়গুলোই নির্ধারণ করবে এনডিএ সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে কিনা।

নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জন্ম তাই কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার বাস্তব রূপ। একদিন এই শহর দেশের শিল্প ও বাণিজ্যে পথ দেখিয়েছিল। এখন সময় এসেছে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও টেকসই উন্নয়নেও নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের। সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সকল অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর।