News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ০২ আগস্ট, ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

জুলাই আগস্ট আন্দোলনের ভয়াবহতা বর্ণনা খোকনের


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: আগস্ট ২, ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম জুলাই আগস্ট আন্দোলনের ভয়াবহতা বর্ণনা খোকনের

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক খোকন বলেছেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন ছিল ভয়াবহ। প্রশাসনের সদস্যরা প্রায়ই তাদের বাড়িতে অভিযান চালাতেন, গ্রেপ্তারের চেষ্টা করতেন। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, মোবাইল ফোন ব্যবহার করাও নিরাপদ ছিল না।

তিনি বলেন, “একটি সিম কার্ড এক রাতের বেশি ব্যবহার করতে পারতাম না। ট্র্যাকিংয়ের আশঙ্কা দেখা দিলেই সিম ফেলে দিতাম, কখনো মোবাইল সেটও বদলে ফেলতে হতো। রাস্তা থেকে নতুন মোবাইল কিনে অন্য কাউকে দিয়ে নতুন সিম সংগ্রহ করতাম। এক বাসায় কখনো টানা রাত কাটাতে পারিনি। এমনও হয়েছে, এক রাতেই তিনটি বাসা পরিবর্তন করেছি। পরে জানতে পেরেছি, তিনটি বাসাতেই পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। আমার দুই ছেলে কোথায় রাত কাটাতো, সেটাও জানতাম না। মাসের পর মাস বাবা-ভাই কিংবা স্ত্রীর মুখ দেখতে পারিনি, কথা বলাও সম্ভব হয়নি।”

গত ২ আগস্ট সময়ের নারায়ণগঞ্জকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

খোকন বলেন, আন্দোলনের সময় মিছিলে নামলেই পুলিশ সরাসরি গুলি চালাত। টিয়ারশেল ও প্রাণঘাতী গুলির পাশাপাশি হেলিকপ্টার থেকেও গুলি চালানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। বিশেষ করে চিটাগাং রোড এলাকায় বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। “আমার সঙ্গে থাকা অনেকের শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। শত শত গুলি শরীরে লেগেছে। আমি নিজ হাতে আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করেছি।”

তিনি বলেন, “নারায়ণগঞ্জে শাওন যেদিন নিহত হয়, সেদিন আমরা সামনেই ছিলাম। কাঞ্চনে আরেকজন শহীদ হয়েছেন, চনপাড়ায়ও অনেকেই প্রাণ দিয়েছেন। অসংখ্য মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। শহিদুল ইসলাম টিটু ভাইয়ের চোখে সরাসরি গুলি করা হয়েছে, সেই গুলি এখনো তার চোখে রয়েছে।”

পরিবারের ওপর নির্যাতনের কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা ঘরে থাকতে পারিনি। আমাদের পরিবারের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে। সন্তানদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি।”

তিনি বলেন, “তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনা অনুযায়ী রাজপথে ছিলাম। সেই সময় প্রশাসন আমাদের পরিবার, সন্তান—কাউকেই ছাড় দেয়নি।”

দমন-পীড়নের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়ে খোকন বলেন, “যারা শাওনকে গুলি করেছে, যারা চনপাড়া ও কাঞ্চনে মানুষ হত্যা করেছে, তাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বর্তমান সরকারের কাছে এটাই আমার অনুরোধ।”

তিনি বলেন, জেলা যুবদল ও পরে জেলা বিএনপির দায়িত্ব পালন করা সহজ ছিল না। “আমাকে সরাসরি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে। বর্তমান এমপি মুস্তাফিজুর রহমান দিপু ভূঁইয়া আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তাকেও চারবার অস্ত্র তাক করে ভয় দেখানো হয়েছিল। আল্লাহর রহমতে গুলি বের হয়নি। না হলে সেদিন আমরা হয়তো বেঁচে থাকতাম না।”

তিনি অভিযোগ করেন, তাদের বাড়িঘর, গাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা হয়েছে। “বর্তমানে বিএনপির পদে এলে ফুলের মালা দেওয়া হয়। কিন্তু তখন আমাদের গলায় পড়ত মামলার মালা। শত শত মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে আদালতের বারান্দায় দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে।”

নিজের রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে খোকন বলেন, “কারফিউ ভঙ্গের নির্দেশ এলেই মনে হতো, আজ ঘর থেকে বের হচ্ছি, কিন্তু আর হয়তো ফিরে আসতে পারব না। আমার বাড়িতে একাধিকবার গুলি চালানো হয়েছে। বৃদ্ধ বাবা-মা আতঙ্কে একে অপরকে জড়িয়ে ধরতেন।”

তিনি বলেন, “আমার চোখের সামনে গুলি লেগে মানুষ মারা গেছে। আমি নিজ হাতে তাদের লাশ বহন করেছি। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় রক্তে ভেসে যেত সবকিছু। সেই স্মৃতি মনে পড়লে এখনো শরীর শিউরে ওঠে।”

জুলাই আন্দোলনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, “যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, হাত-পা কিংবা চোখ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা জানাই।”

দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে দলের নেতাকর্মীদের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুট করা হয়েছে, অসংখ্য মামলা দেওয়া হয়েছে—তারপরও তারা দল ছেড়ে যাননি। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।”

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে খোকন বলেন, “যেসব পরিবার স্বজন হারিয়েছে এবং যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের পাশে সরকারকে দাঁড়াতে হবে। শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন এবং আহতদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে তারা সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।”

তিনি আরও বলেন, “বিএনপির জেলা সাধারণ সম্পাদক কিংবা যুবদলের দায়িত্ব পালন করা তখন চারটিখানি কথা ছিল না। আমার বাড়ির সামনে যুবলীগের অফিস করা হয়েছিল। বাড়িতে কে আসছে, সেটিও ভিডিও করে নজরদারি করা হতো। কেউ আমার বাড়িতে এলে তার পরিবারও হামলা ও হয়রানির শিকার হতো।”

মুস্তাফিজুর রহমান দিপু ভূঁইয়ার বাড়িতে মিছিলের পর হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “সেদিন তার বাড়ি, অফিস, মার্কেট এবং নতুন প্রাডো গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। আমার জিপও ভাঙচুর করা হয়েছিল। আমাদের লক্ষ্য করে গুলিও চালানো হয়েছিল।”

শেষে তিনি বলেন, “তখন বিএনপির নাম উচ্চারণ করতেও মানুষ ভয় পেত। অনেক নেতাকে গুম করা হয়েছে, আমাদেরও গুমের চেষ্টা হয়েছে। সেই সময়ে বিএনপির দায়িত্ব পালন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি দায়িত্ব।