News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ০৫ আগস্ট, ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩

জনতার গর্জনে পতনের পূর্বাভাস


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: আগস্ট ৪, ২০২৬, ১০:২৮ পিএম জনতার গর্জনে পতনের পূর্বাভাস

২০২৪ এর ৪ আগস্ট ছাত্র জনতার ঢল নেমেছিল নারায়ণগঞ্জে। শহরের অলিগলি, চাষাঢ়া থেকে শুরু করে পুরো জেলায় তখন জনতা রাজপথে। বিপরীতে পুলিশ আর আওয়ামী লীগের লোকজন বিচ্ছিন্নভাবে নামলেও কুলিয়ে উঠতে পারছিল না। জনতার গর্জনে পতনের পূর্বাভাস ছিল।

৪ আগস্ট সকাল থেকেই থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিলো নারায়ণগঞ্জ জুড়ে। সকাল ৭ টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিটাগাং রোড এলাকায় অবস্থান নিয়ে সড়ক বন্ধ করে দেয় শিক্ষার্থীরা। বেলা ৮ টায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যুক্ত হলেও ১০ টা নাগাদ একে একে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে। কোন কোন কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়, আবার কোন কোন কারখানার শ্রমিকেরা স্বেচ্ছায় বেরিয়ে আসেন। কারখানা থেকে বেরিয়েই যুক্ত হয়ে যান আন্দোলনে।

বেলা সাড়ে ১০টা থেকেই মহাসড়কের সাইনবোর্ড, চিটাগাং রোড এবং মদনপুরে অবস্থান নিতে শুরু করে আন্দোলন সমর্থকেরা। এসময় মদনপুরে একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। একই সময়ে নারায়ণগঞ্জে প্রবেশের অন্যতম পথ লিংক রোডের জালকুড়ি, স্টেডিয়াম, শিবু মার্কেট, সস্তাপুর এলাকায় অবরোধ শুরু করে আন্দোলন সমর্থকেরা।

বেলা সাড়ে ১০টায় হামলা চালানো হয় জেলা পরিষদ কার্যালয়ে। ভাঙচুর করার পর অবস্থান নেয় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে। বেলা ১১ টায় চাষাঢ়ায় কয়েক হাজার আন্দোলনকারী সড়ক অবরোধ করে। চাষাঢ়া গোলচত্বর ছাড়িয়ে আন্দোলনকারীরা ছড়িয়ে পরে মিশনপাড়া, গ্রীন্ডলেজ ব্যাংকের মোড় এবং কলেজ রোড এলাকায়। এসময় কলেজ রোডে অবস্থান নেয়া ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেয় শিক্ষার্থীরা।

বেলা ১২ টার মধ্যে আন্দোলনকারীরা ভাঙচুর শুরু করে। চাষাঢ়া পুলিশ বক্স, রাইফেলস ক্লাব ভাঙচুর করে ভেতরের আসবাবপত্র বের করে আগুন ধরিয়ে দেয়। ভাঙচুর চালানো হয় চারটি শীতল বাস, বায়তুল আমান ভবনের জানালা, আজগর পাম্প, শান্তনা মার্কেট। এছাড়া কলেজ রোডের সামনে একটি প্রাইভেট কার ও শীতল বাস কাউন্টারের সামনে একটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়া হয়।

১২টা থেকে পুলিশের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পরে আন্দোলনকারীদের একাংশ। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হামলা, ডিসি থিম পার্কে আগুন এবং জেলখানার ক্যান্টিনে হামলা শুরু করলে তাদের প্রতিহত করে পুলিশ। টিয়ারশেল ও ছররা গুলি ছুড়লে পিছু হটে তারা। তিনটা নাগাদ আন্দোলনকারীদের চাষাঢ়া পর্যন্ত পিছু হটাতে সক্ষম হয় পুলিশ। পরে চাষাঢ়া সম্মুখে আর আগায় নি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। সংঘর্ষে শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হয়।

শহর ছাড়াও সহিংসতা চালাতে দেখা গেছে অন্যান্য এলাকায়। ফতুল্লা মডেল থানায় হামলা চালিয়ে আহত করা হয় এক এএসআইকে। হামলা চালানো হয় পঞ্চবটি পুলিশ বক্স ও চায়না প্রজেক্টে। পুলিশ লাইন্স এলাকায় একটি বাস ভাঙচুর ও লাইন্সের গেট ভাঙচুর করা হয়। 

বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চাষাঢ়া স্বাধীনতা চত্বরে অবস্থান ধরে রাখে আন্দোলন সমর্থকরা। শিক্ষার্থীরা ‘উই ওয়ান জাস্টিস’, ‘শহীদ হওয়া শিক্ষার্থীদের রক্ত বৃথা যেতে দিব না’ ‘লেগেছে রে লেগেছে রক্তে আগুন লেগেছে’ সহ বিভিন্ন স্লোগানের প্রকম্পিত করে তোলে পুরো এলাকা। চাষাঢ়ায় প্রবেশের বিভিন্ন সড়কে বাশের ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানায়, দাবী আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরবো না। এই সরকারের পতন চাই আমরা। আমাদের ভাইদের রক্ত বৃথা যাবে না।

শামীম ওসমান মাঠে নামবেন এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছিলো। পাশাপাশি শাহ নিজাম প্রকাশ্যেই বার্তা দেন কর্মীদের নিয়ে মাঠে থাকবেন। কিন্তু তাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি চাষাঢ়ায়। কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা সকাল থেকে চাষাঢ়ায় এসে দাঁড়ালেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে দেখে কেটে পরেন। তবে দুই নম্বর রেলগেইট এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতারা শতাধিক কর্মী নিয়ে একটি মিছিল বের করেন। পরে আন্দোলনকারীদের উপস্থিতি দেখে সটকে পরেন তারা।

অন্যদিকে কলেজ রোড এলাকায় সকাল থেকেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জড়ো হচ্ছিলো। পথিমধ্যে আন্দোলনে যাওয়া শিক্ষার্থীদের পেলে তাদের চড় থাপ্পর দেয়ারও অভিযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু চাষাঢ়া শিক্ষার্থীদের দখলে চলে যাওয়ার পর তাদের ধাওয়া দিতে শোনা যায়। বিকেল ৩ টা পর্যন্ত মাসদাইর, ইসদাইর বিভিন্ন এলাকায় জড়ো হলেও সামনে এগোতে পারেনি তারা।’

শামীম ওসমানের আস্তানা বা ডেরা হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ শহরের রাইফেলস ক্লাব। নিজের রাজনৈতিক কোন কার্যালয় না থাকলেও এই ক্লাবটি হয়ে উঠেছে শামীম ওসমান ও তার অনুসারীদের বৈঠকের স্থান। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সভা, আড্ডা, বৈঠক সবকিছুই অনুষ্ঠিত হয় এখানে। এমনকি তার সাথে দেখা করতে আসা তার এলাকার সাধারণ মানুষও ছুটে আসেন এই ক্লাবে। বেলা সাড়ে ১১টায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয় শতাধিক শ্রমিক ও সাধারণ আন্দোলন সমর্থক। চাষাঢ়া প্রবেশ করেই তা-ব শুরু করেন তারা। ইটপাটকেল ছুড়েন রাইফেলস ক্লাবের কাঁচের জানালা ও পুলিশ বক্সে। পরে শিক্ষার্থীরা এলে কিছুটা নিবৃত হয় তারা। বেলা ১২টার দিকে হটাৎ একদল ব্যক্তি রাইফেলস ক্লাবের দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ভেতরের আসবাবপত্র এনে বাইরে ফেলে দেয়া হয়। সেসব আসবাবপত্র লুটপাট ও আগুন ধরিয়ে দেয় আন্দোলন সমর্থকরা। ক্লাবের সম্মুখ ও পেছনের দুটো গেটই ভেঙ্গে ফেলা হয়। এসময় পুরো সড়কে ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য তাসের কার্ড। বিকেল নাগাদ পুরো ক্লাব পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। ভেতরের কক্ষে ধরিয়ে দেয়া আগুন নিভে এলেও বের হতে থাকে কালো ধোঁয়া। ছিন্নমূল ও টোকাইরা ক্লাবের ভেতরে থাকা পোড়া আসবাবপত্র বের করতে শুরু করে। সেগুলো লুটপাটের মহোৎসব শুরু হয়। বিকেল ৫টার পর আন্দোলনকারীরা চলে গেলেও সুযোগ সন্ধানীরা লুটপাট চালাতে থাকে ৬টা পর্যন্ত। এক পর্যায়ে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়লে পালিয়ে যায় তারা।