শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের নগর সমস্যা সমাধান এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনডিএ)। মঙ্গলবার কর্তৃপক্ষের কার্যালয় উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হলেও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, জলাবদ্ধতা, খাল-জলাশয় দখল, আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা, সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং ভবন নির্মাণে পরিকল্পনার ঘাটতি সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জকে পরিকল্পিত নগরে রূপ দিতে এনডিএকে একসঙ্গে বেশ কিছু জটিল সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, নারায়ণগঞ্জের সমস্যা শুধু একটি বা দুটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবাসন, যোগাযোগ, ড্রেনেজ ও নাগরিক সুবিধার পরিকল্পনা না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাগুলো জমেছে। ফলে নতুন কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। শহর ও আশপাশের এলাকায় আবাসিক ভবনের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। অনেক জায়গায় সড়ক, ড্রেনেজ কিংবা পার্কিং সুবিধার সক্ষমতা বিবেচনা না করেই স্থাপনা তৈরি হয়েছে। নতুন করে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে এনডিএকে।
নারায়ণগঞ্জের আরেকটি বড় সমস্যা যানজট। চাষাঢ়া, দুই নম্বর রেলগেট, নিতাইগঞ্জ, পঞ্চবটি, ফতুল্লাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দিনের বড় একটি সময় যানবাহনের ধীরগতি দেখা যায়। শিল্পকারখানার পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ির চাপের পাশাপাশি অপরিকল্পিত পার্কিংও যানজট বাড়াচ্ছে। শুধু সড়ক প্রশস্ত করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন পরিকল্পনা।
জলাবদ্ধতাও নারায়ণগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কারণ। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন সড়ক ও নিচু এলাকায় পানি জমে যায়। এর পেছনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, খাল-জলাশয় ভরাট এবং পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়াকে দায়ী করা হয়। নগর উন্নয়নের পরিকল্পনায় পানি নিষ্কাশন ও জলাধার সংরক্ষণকে গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
খাল ও জলাশয় দখলমুক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় একসময় যে খালগুলো পানি নিষ্কাশন ও নৌযাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, সেগুলোর অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। কোথাও দখল, কোথাও ময়লা-আবর্জনা এবং কোথাও স্থাপনা নির্মাণের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব খাল ও জলাশয়ের সীমানা নির্ধারণ করে সংরক্ষণ করা এনডিএর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে।
শিল্পনগরী হিসেবে নারায়ণগঞ্জের জন্য আবাসিক ও শিল্প এলাকার সমন্বয় করাও সহজ হবে না। বিভিন্ন আবাসিক এলাকার কাছাকাছি শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় পরিবেশ, শব্দদূষণ, যানবাহনের চাপ ও নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। আবার শিল্পকারখানাগুলো জেলার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে শিল্পায়ন বন্ধ না করে পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পথ খুঁজতে হবে।
নগর পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খোলা জায়গা ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। জনসংখ্যা বাড়লেও খেলার মাঠ, পার্ক, হাঁটার জায়গা এবং উন্মুক্ত স্থান তুলনামূলকভাবে কম। নতুন আবাসিক প্রকল্প কিংবা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব নাগরিক সুবিধা কতটা রাখা হচ্ছে, সেটিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
এনডিএর সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়। সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ, গণপূর্ত, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জের নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে নতুন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগও প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও নাগরিকদের প্রত্যাশা, এনডিএ যেন শুধু নতুন ভবন নির্মাণ কিংবা নকশা অনুমোদনের প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না থাকে। নারায়ণগঞ্জের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, শিল্পায়ন, পরিবহন, পরিবেশ, জলাবদ্ধতা এবং নাগরিক সুবিধাকে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
কারণ, নারায়ণগঞ্জের নগর সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ। তাই এসব সমস্যার সমাধানও একদিনে সম্ভব নয়। বাস্তবভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান, কঠোর বাস্তবায়ন, সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলেই নতুন এই কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।







































আপনার মতামত লিখুন :