নারায়ণগঞ্জে নব নিযুক্ত পুলিশ সুপারের ধারাবাহিক অভিযান এবং মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর জেলাজুড়ে অপরাধীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। জেলার বিভিন্ন স্থানে মাদক স্পট বন্ধ হলেও থামেনি কাশিপুরের মাদকস্পটগুলো। এখনও দিনের বেলায় গোপনে আর রাতের আধারে প্রকাশ্যেই চলে মাদকের কেনাবেচা। যা নিয়ন্ত্রণ করা হয় সিসি ক্যামেরা ও নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে। এলাকায় কোন পুলিশ সদস্য প্রবেশের সাথে সাথেই পুরো নেটওয়ার্ক সতর্ক হয়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাশীপুরে এমন মাদক ব্যবসাতেই সীমাবদ্ধ নেই অপরাধীরা। এখানে চলে চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা এবং সন্ত্রাসী কর্মকা-। ডাকাত শহীদ, বাপ্পি ও ইকবালের নেতৃত্বে থাকা সংঘবদ্ধ চক্রের অপরাধমূলক কর্মকান্ড এখনও অব্যাহত রয়েছে। মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু এবং সাবেক কাউন্সিলর বিভা হাসানের প্রশ্রয়ে শহরেও নিজেদের ডালপালা বিস্তার করতে শুরু করেছে এই চক্রটি।
কাশিপুর অঞ্চলের বাসিন্দারা বলছেন, এই এলাকায় জমি ক্রয়-বিক্রয়, বাড়ি নির্মাণ কিংবা বাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রেও চাঁদা দাবি করা হয়। পাশাপাশি জমির সাইনবোর্ড ব্যবহার করে মাদক ব্যবসার একটি বড় সিন্ডিকেট পরিচালনা করা হয়। গুঞ্জন রয়েছে এই চক্রের নিজস্ব মাদকের কারখানাও রয়েছে। যেখানে বসে বানানো হয় নকল ইয়াবা ট্যাবলেট। যদিও এই গুঞ্জনের সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
কাশীপুরের একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে জানান, এলাকায় প্রভাবশালী একটি চক্রের ভয়ে অনেকে মুখ খুলতে সাহস পান না। তাদের অভিযোগ, কাশীপুরের খিল মার্কেট, বাংলাবাজার, বাবুরাইল, চর কাশীপুর ও নরসিংপুরসহ আশপাশে ওই চক্রের প্রভাব রয়েছে। এছাড়া নিতাইগঞ্জ এলাকাতেও রয়েছে নিজস্ব বাহিনী। যারা চালক, মালিক ও ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে চাঁদাবাজি করে থাকে।
শুধু তাই নয়, নগরীর বাবুরাইল-তাঁতীপাড়া এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী সবুজের নিয়ন্ত্রণে একটি আস্তানা রয়েছে। যেখানে মানুষকে ধরে নিয়ে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের মতো ঘটনা ঘটে। সবশেষ এক ট্রাক চালককে ধরে এনে নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টির প্রমান মেলে।
কয়েক মাস পুর্বে রাশেদ নামে এক ট্রাক চালক ও মালিককে ডেকে নিয়ে অপহরণ করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপন দাবী করা হয়। সেই টাকা দিতে না পারায় কুপিয়ে আহত করা হয় তাকে। কোনমতে পালিয়ে প্রাণ বাচায় রাশেদ। ঘটনার বর্ননা দিয়ে রাশেদ জানায়, সম্প্রতি ধার দেনা করে নিজে একটি ট্রাক ক্রয় করেন। সেই থেকেই তার ট্রাকের উপর নজর পরে শহিদ গ্রুপের সদস্যদের। কৌশলে ডেকে এনে তাকে অপহরণ করে আটকে রাখে এবং ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবী করে। সেই টাকা না দিলে তার ট্রাক তাদের নামে লিখে দিতে হবে অথবা দিতে হবে প্রাণ।
রাশেদ বলেন, স্ট্যান্ডের সেক্রেটারি শহীদের লোকজন আমার থেকে তারা ২০ লাখ চাঁদা চাইছে। টাকা না দিলে আমি কয়েকদিন আগে যেই ট্রাক কিনছি সেটা ওদের নামে লিখে দিতে হবে। নাহলে আমাকে মেরে ফেলবে। আমি ছাদ থেকে লাফিয়ে পালায়া হাসপাতালে আসছি। কারা এই ঘটনার সাথে জড়িত জানতে চাইলে বলেন, শহীদের অনুসারী শুভ, শাহীন, আরাফাত, ইমরান, রাজীব সহ আরও কয়েকজন মিলে আমাকে মারধর করে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায়। টাকা না পেলে আমার স্ত্রীকে ধর্ষণ করার হুমকি দেয়, এবং আমার সন্তানকে বিক্রি করে দেয়ার হুমকি দেয়। পুরো নিতাইগঞ্জ ট্রাক স্ট্যান্ড এখন সন্ত্রাসের রাজত্ব হয়ে উঠেছে।
এই ঘটনা সহ কাশিপুর অঞ্চলে ডিপিডিসির তার চুরি এবং একাধিক অপকর্মের জন্য শহীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশিত হলেও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কোন ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি। যা নিয়ে মুখ খুলেন এমপি আবদুল্লাহ আল আমিন। তিনি জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত আইন শৃঙ্খলা বৈঠকে সাধারণ মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, ফতুল্লার কাশিপুর এলাকায় বড় একটি সমস্যা হচ্ছে আইন শৃঙ্খলার অবনতি। এখানে একজনের নাম উল্লেখ করতেই হয় সেটা হচ্ছে শহীদ ওরফে ডাকাত শহীদ গ্যাং। এই অপরাধীর নাম প্রতিনিয়ত পত্রিকায় পাবেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোন স্টেপ নেয়া হচ্ছে না।
এমপি আল আমিন এই বক্তব্য দেয়ার পর ডাকাত শহীদ বাহিনী তাদের ভাড়াটে লোকজন নামিয়ে এমপি আল আমিনের হাত ভেঙ্গে দেয়ার ঘোষণা দেয়। প্রকাশ্যে একজন এমপিকে হুমকি দেয়ার পরেও প্রশাসনের রহস্যজনক আচরণ লক্ষ্য করা যায়। চাপের মুখে শহীদ বাহিনীর আস্তানায় দুই দফা অভিযান চালালেও আগেই টের পেয়ে যাওয়ায় সটকে যায় অপরাধীরা। যেই কারনে খালি হাতেই ফিরতে হয় পুলিশ প্রশাসনকে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের নবাগত পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর কাশীপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর ও নিরপেক্ষ অভিযান পরিচালনা করবে। বাসিন্দাদের দাবী, অভিযোগে থাকা এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিৎ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া।
























-20260912144331.jpg)








আপনার মতামত লিখুন :