দীর্ঘদিন পর নারায়ণগঞ্জে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিগত সময়ে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তাদের মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। সেই সাথে শেষ পর্যন্ত মতবিরোধ থেকে সংঘাতে রূপ নেয়। আর এই সংঘাত থেকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির উভয়পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি হয়। পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়।
একই সাথে শেষ পর্যন্ত ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ মিটে গেলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষয়ক্ষতির কোনো পরিত্রাণ হচ্ছে না। ছিনতাই হয়ে যাওয়া বিভিন্ন মালামাল ফেরত পাওয়া নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়ে যাচ্ছে। ফলে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের বিরোধ মিটে গেলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকছে না। তাদের এসকল বিষয়গুলোকে আড়াল করে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।
জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় ১ যুগ ধরেই নারায়ণগঞ্জে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছিলো। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তারা ঐক্যবদ্ধভাবেই রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ছিলেন। সেই সাথে তাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়।
কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের মধ্যে ছন্দপতন ঘটে। ধীরে ধীরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে বিরোধ দানা বাঁধতে থাকে। সেই সাথে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তাদের মধ্যে বিরোধ আরও বেশি স্পষ্ট হতে থাকে। এক পর্যায়ে তাদের সেই বিরোধ গিয়ে সংঘাতে রূপ নেয়। যেন তারা একে অপরের চির শত্রুতে পরিণত হয়ে যান।
এরই মধ্যে বুধবার (আগস্ট) দুপুরে শহরের চাষাঢ়া ও কলেজ রোড এলাকায় ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসময় প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় ধরে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের ২০ জন কর্মী আহত হয়েছে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এদিন জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে সরকারি তোলারাম কলেজ প্রোগ্রামের আয়োজন। আর এই প্রোগ্রামে বক্তব্য দেয়াকে কেন্দ্র করে তোলারাম কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মনির হোসেন জিয়ার সাথে শিবিরের নেতার তর্ক বিতর্ক হয়। এই তর্ক বিতর্কের এক পর্যায়ে তোলারাম কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইমদাদুল হক শুভ, সেক্রেটারী তামিম ও অর্থ সম্পাদক জুহাসকে মারধর করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
এদের মধ্যে ইমদাদুল হক শুভ কলেজ থেকে বের হয়ে চাষাঢ়া গোল চত্বর এলাকায় চলে আসে। তার তাকে ধরে নেয়ার জন্য ছাত্রদলের দুই নেতা পিছু ধাওয়া করতে করতে চাষাঢ়া গোল চত্বর এলাকায় গিয়ে ইমদাদুল হক শুভকে ধরে ফেলে।
এদিকে অদম্য জুলাই ব্যানারে মহানগর ইসলামী ছাত্রশিবির মিছিল নিয়ে আসছিলো। তাদের মিছিলটি চাষাঢ়া গোল চত্বর এলাকায় আসার সাথে সাথে ইমদাদুল হক শুভকে তুলে নিয়ে যাওয়ায় বিষয়টি সামনে পড়ে যায়। আর এটা দেখেই শিবিরের নেতাকর্মীরা ক্ষেপে যায়। সেই সাথে দৌড়ে গিয়ে ইমদাদুল হক শুভকে তুলে নিয়ে যেতে আসা ছাত্রদলের দুই নেতাকে ব্যাপক মারধর করে। একই সাথে তাদের দুইজনকে মারধর করে ছেড়ে দেয়।
পরে ইমদাদুল হক শুভ তাদেরকে সেক্রেটারী তামিম ও অর্থ সম্পাদক জুহাসকে তোলারাম কলেজে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আটকে রাখার বিষয়টি জানায়। এই খবর পেয়ে শিবির মিছিল নিয়ে তোলারাম কলেজের দিকে অগ্রসর হয়। সেই সাথে মিছিলটি ডাক বাংলোর সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ অবস্থান করার পর তাদের কাছে খবর আসে তামিম ও জুহাসকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
এরপর শিবিরের মিছিলটি তাদের কার্যালয়ের দিকে চলে যাওয়ার জন্য মতস্থির করে। আর এসময়েই ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী লাঠি-সোটা ও দেশিয় অস্ত্র নিয়ে শিবিরের নেতাকর্মীদের উপড় হামলা করে। আর এতে করে শিবিরের মিছিলে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী হামলা করতে এসে উল্টা মারধরের শিকার হয়। সেই সাথে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এরই মধ্যে সরকারি তোলারাম কলেজ কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দেয়। সেই সাথে খবর পেয়ে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছুটে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তারা এক পর্যায়ে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদেরকে ঘটনাস্থল থেকে সড়িয়ে দেয়। তবে ছাত্রদল ঘটনাস্থলে থেকে যায়। পুলিশের সামনে কয়েকবার হামলা করার চেষ্টা করেও পুলিশ তাদের বুঝিয়ে শান্ত করে। এরপর তারা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে।
এদিকে এই সংঘর্ষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারি তোলারাম কলেজের ইসদাইর এলাকার শের-ই বাংলা ছাত্রাবাসে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ভাঙচুর লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এসময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ভাঙচুরের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও ট্যাব চুরি নিয়ে গেছে। সেই সাথে হামলার শিকার হয়েছেন শিবির কর্মী থেকে শুরু করে ছাত্রশক্তি, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন এমনকি সাধারণ শিক্ষার্থীরাও।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন তোলারাম কলেজ শাখার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ সগির হোসেন বলেন, ‘আজকে ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বিকেলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হলে প্রবেশ করে আমার রুম ভাঙচুর করে এবং মূল্যাবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়। আমার ল্যাপটপ নিয়ে গেছে, আমার পাশের রুমের এক ভাইয়ের থেকে ট্যাব নিয়ে গেছে। এনআইডি কার্ড ও সার্টিফিকেট নষ্ট করে ফেলেছে।
আরেক শিক্ষার্থী শরীফ আবদুল্লহ বলেন, আমি ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের ছাত্র। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের চুক্তিভিত্তিক ট্র্যাফিক কর্মী হিসেবে কাজ করি। আমি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত না। কিন্তু আজকে বিকেলে ছাত্রদল নেতা অনিক আমার রুমে প্রবেশ করে বলে আমি এনসিপি করি, আমি ছাত্রশিবির করি। এসব বলে আমাকে বেল্ট দিয়ে মারধর শুরু করে।
তিনি আরও বলেন, আমার ১ টি ট্যাব, ২ টি মোবাইল, মানিব্যাগ ও বিছানার নিচে রাখা হল ফি ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। আমার দাদা গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং জেলা বিএনপির আহবায়ক। পারিবারিকভাবে বিএনপির রাজনীতি করেও ছাত্রদলের ছেলেরা আজকে আমাকে শিবির আখ্যা দিয়ে মেরেছে।
তবে এই বিষয়ে তোলারাম কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মনির হোসেন জিয়া বলেন, ‘শিবিরের একটি ফেইসবুক গ্রুপ রয়েছে। সেই গ্রুপে যারা যুক্ত আছে তারা ছাত্রদলের বিরুদ্ধে নানান অপপ্রচার চালায়। তাদের ফোন চেক করে সেগুলো সাময়িক জব্দ করে পরবর্তীতে হল সুপারের কাছে দিয়ে এসেছি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানি করা হয়নি।’
সরকারি তোলারাম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ভাঙচুর ও লুটপাটের বিষয়টি আমাদের জানা নেই। আমার ছাত্রদের হল ত্যাগের নির্দেশনা দিয়েছি। সেই সাথে আমরা তিন সদস্য তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত কমিটি তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিবে। তদন্ত কমিটি প্রধান হলেন উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আজিজুল্লাহ। বাকী দুইজন সদস্য হলেন- প্রফেসর মনোয়ার হোসাইন এবং প্রফেসর হুমায়ুন কবির। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আসলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এরই মধ্যে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা মিটমাট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। দুইপক্ষই একে অপরের সাথে বসে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তাদের বিরোধ মিটিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। কিন্তু এই সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের লুট হয়ে যাওয়া মালামাল উদ্ধারের বিষয়টি যেন আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।






































আপনার মতামত লিখুন :