ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই যেন নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে যেন বেহাল দশা বিরাজ করছে। মূলদল বিএনপি সহ অঙ্গ সহযোগি সংগঠনগুলোর কমিটিগুলো অনেক দিন হয়ে গেলেও নতুন করে কমিটির নবায়ন করা হচ্ছে না। সেই সাথে তারা বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলে থাকায় তাদের দলীয় কর্মসূচিও যেন অনেক কমে গেছে। ফলে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি থেকে শুরু করে তাদের অঙ্গ সহযোগি সংগঠনের তৎপরতাও অনেক কমে গেছে।
সবশেষ ঢাকার কেন্দ্রীয় সমাবেশেও নারায়ণগঞ্জ বিএনপির উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিলো না। বিএনপির অনেক নেতাকর্মীরাই অংশগ্রহণ করেনি। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে শ্রমিক সমাবেশের আয়োজন করেছিলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গত ১ মে এ সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ঢাকায় পহেলা মে উপলক্ষে শ্রমিক সমাবেশে এটিই তার প্রথম বক্তব্য ছিলো। আর এই সমাবেশকে ঘিরে বিএনপির পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিলো। দলটির নেতারা আশা করছিলেন, ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক শমজীবী মানুষ ও নেতাকর্মী এতে অংশ নেবেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রত্যাশা ছিলো, এ সমাবেশে লাখো মানুষের সমাগম ঘটবে।
কিন্তু এই সমাবেশকে কোনো গুরুত্বই দেননি নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মীরা। অথচ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নানা প্রতিকূলতা পুলিশের নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করে ঢাকার সমাবেশে জানান দিতেন নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মীরা। প্রায় প্রত্যেকটি সভা সমাবেশেই নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নজরকাড়া অংশগ্রহণ থাকতো। কোনোভাবেই তাদের দমানো যেতো না। আর বর্তমানে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও তারা যেন অনেকটাই নিস্ক্রীয় হয়ে পড়েছেন।
যার ধারাবাহকিতায় মূল দল বিএনপি সহ তাদের অঙ্গ সহযোগি সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরাও নিরব হয়ে পড়েছেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই পদ পদবীর আশায় নানা কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের জানান দিয়ে আসছেন। একইভাবে স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি দলীয় সমর্থনের আশায় নানা কর্মসূচি গ্রহণ করছেন। যার মাধ্যমে দলীয়ভাবে সক্রিয় থাকার বিপরীতে বিএনপি সহ অঙ্গ সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক তৎপর হয়ে পড়েছেন। নেতাকর্মীরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছেন।
সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলো আওয়ামী লীগ। আর এই ক্ষমতায় থাকাবস্থায় নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মীরা অনেক নির্যাতন নীপিড়নের শিকার হয়েছেন। দিনের পর দিন মাসের পর মাস এবং বছরের পর বছর বিএনপির নেতাকর্মীদেরকে পরিবার পরিজন ছেড়ে দিন যাপন করতে হচ্ছে। সেই সাথে তারা আন্দোলন সংগ্রামেও অংশ নিতে পারতেন না। ব্যবসা বাণিজ্যেও নানাভাবেই বাধার শিকার হয়েছেন। সব মিলিয়ে তাদের যেন স্বাভাবিক জীবন যাপন ছিলো না।
এরই মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আর এই পতনের মধ্যে দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও আলাপ আলোচনা শুরু হয়। সেই সাথে অনেকেই সংসদ নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বীতার আশা করেন। কিন্তু বিএনপি দলীয় মনোনয়ন মিলেনি অনেকের। আর বিএনপি দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় দলের বাইরে গিয়েই তারা প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।
আর এই প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে গিয়ে দলীয় পদ পদবী হারাতে হয়েছে বিএনপি দলীয় অনেক প্রভাবশালী নেতাদের। সেই সাথে তাদের অনুসারীদেরও অনেকে পদ হারাতে হয়েছে। যার সূত্র ধরে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও অনেক এলেমেলো হয়ে পড়েছেন।
নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপি সহ অনেক অঙ্গ সবহযোগী সংগঠনের কমিটিও অনেক দিন হয়ে গেছে। ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির ৪১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে অ্যাডভোকেট মো. শাখাওয়াত হোসেন খান এবং সদস্য সচিব হিসেবে অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আর এই কমিটির বর্তমান আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক পদে মনোনীত হয়েছেন। সেই সাথে চলমান কমিটির অনেকদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। ফলে এই মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের ব্যাপারে আলাপ আলোচনা চলমান রয়েছে। তবে কবে নাগাদ হতে পারে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এদিকে মামুন মাহমুদকে আহ্বায়ক ও মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়াকে প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক করে ৩৩ সদস্যের নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিলো। ২০২৫ সালের ২৪ মার্চ রাতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। কমিটিতে অন্য দুই যুগ্ম আহ্বায়ক হলেন মাশুকুল ইসলাম ও শরীফ আহমেদ।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুকের নেতৃত্বাধীন আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় বিএনপি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদ জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে মনোনীত হয়েছেন। সেই সাথে প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। সে হিসেবে জেলা বিএনপির নতু কমিটি নিয়েও আলাপ আলোচনা চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালিন সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিল্টন নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের নতুন কমিটির ঘোষণা দেন। আর এই কমিটিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের আহ্বায়ক পদে সাদেকুর রহমান সাদেক, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খায়রুল ইসলাম সজীব ও সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি জায়গা পান।
একই সাথে ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট রাতে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিল্টন নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের কমিটির অনুমোদন দেন। আর এই কমিটিতে আহ্বায়ক পদে মনিরুল ইসলাম সজল, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাগর প্রধান ও সদস্য সচিব পদে আছেন শাহেদ আহমেদ।
যার ধারাবাহিকতায় জেলা ও মহানগর যুবদলের কমিটিও অনেকদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। সে হিসেবে নতুন কমিটি নিয়ে আলাপ আলোচনা চলমান রয়েছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর শাখা ছাত্রদলের কবিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিলো। একই সাথে জেলা ও মহানগরের আওতাধীন সব উপজেলা-থানা, পৌর, কলেজ, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিলো।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে হয়েছিলো মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর কমিটি এবং অধীনস্থ সব ইউনিট কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। শিগগিরই উক্ত ইউনিটগুলোর নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। কিন্তু এই কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার এক বছর অতিবাহিত হতে চললেও এখন পর্যন্ত নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। এভাবে এসকল কমিটিগুলোর নবায়ন অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই সাথে সাংগঠনিক দিক দিয়েও নজর দেয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছে।



































আপনার মতামত লিখুন :