দেশজুড়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন। বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে চিহ্নিত চাঁদাবাজদের তালিকা প্রস্তুত, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। তবে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে এখনো পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো দৃশ্যমান অভিযানের দেখা না মেলায় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী মহল এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কয়েক মাস ধরে নারায়ণগঞ্জে সক্রিয় চাঁদাবাজদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে বিভিন্ন সংস্থা। থানা পুলিশ, গোয়েন্দা ইউনিট এবং অন্যান্য দায়িত্বশীল সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি সমন্বিত তালিকা প্রণয়নের কাজও অনেকটাই এগিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তালিকা তৈরির এই প্রক্রিয়া শেষ হলেও এখনো পর্যন্ত বড় পরিসরে অভিযান শুরু না হওয়ায় জনমনে বাড়ছে সংশয়।
নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরেই চাঁদাবাজি একটি বহুল আলোচিত সমস্যা। জেলার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল, পরিবহন খাত, কাঁচাবাজার, পাইকারি ব্যবসা কেন্দ্র, হকার নিয়ন্ত্রণ, ঘাট ইজারা এবং নির্মাণকাজকে ঘিরে নানা সময়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। ভুক্তভোগীদের অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে না চাইলেও ব্যবসায়ী মহলে এ বিষয়ে অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। তাদের দাবি, প্রশাসনের নজরদারি বাড়লেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় চাঁদাবাজ চক্রগুলো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
সম্প্রতি চাঁদাবাজির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে সাবেক যুবদল নেতা খাইরুল ইসলাম সজীবকে আটকের ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও পরবর্তীতে মুচলেকার মাধ্যমে তার মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি অনেকের মধ্যে নানা প্রশ্নেরও সৃষ্টি করেছে। অনেকে মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা প্রশাসনের চলমান তৎপরতার একটি ইঙ্গিত দিলেও এখনো তা বড় আকারের অভিযানে রূপ নেয়নি।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মতে, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে তালিকা প্রস্তুত এবং বিশেষ অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। শুরুতে কিছু তৎপরতা দেখা গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা শিথিল হয়ে পড়ে। ফলে অভিযানের চাপ কমে গেলে পুরোনো চক্রগুলো আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার অনেকেই বাস্তব ফলাফল দেখতে চান। শুধুমাত্র তালিকা প্রস্তুত বা পরিকল্পনার ঘোষণা নয়, মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এবার আগের তুলনায় বেশি সতর্কতার সঙ্গে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে ভুলবশত তালিকাভুক্ত না হন, সেজন্য প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজদের পেছনে থাকা নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস এবং সহযোগীদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ কারণেই অভিযান শুরু করতে কিছুটা সময় লাগছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে একযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যাতে একটি চক্রের একজন সদস্য গ্রেপ্তার হলেও অন্যরা নতুন করে একই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে না পারে। এজন্য তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের কাজকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এর সঙ্গে অনেক সময় স্থানীয় প্রভাব, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের সম্পর্কও জড়িত থাকে। ফলে কার্যকর ফল পেতে হলে আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি এসব প্রভাব বলয় ভাঙার উদ্যোগও প্রয়োজন। অন্যথায় বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযান হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
সচেতন নাগরিকদের মতে, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে টেকসই ব্যবস্থা নিতে হলে নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও জরুরি। কারণ মাঝপথে উদ্যোগ থেমে গেলে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সবমিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের প্রস্তুতি ও তৎপরতার খবর নতুন করে আশার সঞ্চার করলেও বাস্তব চিত্র এখনো অনেকটাই অপেক্ষার। তালিকা তৈরির কাজ শেষ করে যদি দ্রুত ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা যায়, তবেই এই উদ্যোগের সফলতা প্রমাণিত হবে। আর সেই দৃশ্যমান পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ মানুষ।






































আপনার মতামত লিখুন :