নারায়ণগঞ্জ শুধু একটি শহর নয়, এটি বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। এই জেলার হাজার হাজার কারখানার উৎপাদন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণ করে, রপ্তানিকে এগিয়ে নেয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে। এই শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ফতুল্লা বিসিক হোসিয়ারি শিল্প নগরী। প্রায় ৫৮.৫২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরী দেশের নিটওয়্যার ও হোসিয়ারি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা এই শিল্পাঞ্চলকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। দেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি আয়ে এর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু যে শিল্পনগরী দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, সেই শিল্পনগরীই আজ অবহেলা, অবকাঠামোগত সংকট এবং পরিবেশগত ঝুঁকির ভার বহন করছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। শুধু শিল্প প্লট বরাদ্দ নয়, শিল্পনগরীর অভ্যন্তরীণ সড়ক, ড্রেনেজ, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও আলোকসজ্জাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণও বিসিকের দায়িত্ব। কিন্তু ফতুল্লা বিসিকের বাস্তব চিত্র সেই প্রত্যাশার সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ফতুল্লা বিসিকে প্রবেশ করলেই উন্নয়য়নের সঙ্গে বাস্তবতার তীব্র বৈপরীত্য চোখে পড়ে। ভেতরের অনেক সড়ক আজও কাঁচা, কোথাও বড় বড় খানাখন্দ। সামান্য বৃষ্টিতেই সেসব রাস্তায় পানি জমে যায়, কাদা-পানি মাড়িয়েই হাজার হাজার শ্রমিককে প্রতিদিন কর্মস্থলে পৌঁছাতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে আবার একই সড়ক ধুলার চাদরে ঢেকে যায়। ট্রাক ও ভারী যানবাহনের চলাচলে সেই ধুলা বাতাসে ছড়িয়ে পুরো এলাকা ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। অনেক সড়কে পর্যাপ্ত সড়কবাতি না থাকায় সন্ধ্যার পর অন্ধকারে চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পঞ্চবটি-মুক্তারপুর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। দীর্ঘদিনের খোঁড়াখুঁড়ি, নির্মাণসামগ্রী, ধুলাবালি ও যানজট শিল্পাঞ্চলের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন উৎপাদনের জন্য ছুটে চলা শ্রমিকদের প্রথম লড়াই শুরু হয় কর্মস্থলে পৌঁছানোর পথ থেকেই। আর এই চিত্র কোনো একদিনের নয়; বছরের পর বছর ধরে একই অবস্থা চলছে। উৎপাদন বাড়ছে, রপ্তানি বাড়ছে, অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু যে শিল্পনগরী এই অগ্রযাত্রার অন্যতম ভিত্তি, তার ভেতরের সড়ক, কর্মপরিবেশ ও সামগ্রিক অবকাঠামো যেন উন্নয়নের আলো থেকেই বঞ্চিত।
এটি শুধু যাতায়াতের দুর্ভোগ নয়, শ্রমিকের মর্যাদা ও কর্মপরিবেশেরও প্রশ্ন। যে এলাকায় দেশের অর্থনীতির এত বড় অংশ নির্ভরশীল, সেখানে কাদা, ধুলাবালি, জলাবদ্ধতা ও অন্ধকার যদি নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণও উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, ডাইং, ওয়াশিং ও টেক্সটাইল কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য শীতলক্ষ্যা নদী ও আশপাশের জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে পানির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়ছে এবং আশপাশের পরিবেশ দূষিত হয়ে উঠছে। বাতাসে ধুলাবালি ও রাসায়নিক গন্ধের প্রভাবও বাড়ছে।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শ্রমিকদের ওপর। ধুলাবালি, রাসায়নিক গন্ধ ও দূষিত পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, চোখের জ্বালা ও অ্যালার্জিসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অথচ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং শ্রমিকবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, যাদের পরিশ্রমে দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাত সচল থাকে, তাদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা কি খুব বেশি প্রত্যাশা? এই পরিস্থিতির দায় একক কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়। শিল্পনগরীর অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বিসিকের দায়িত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তর, সংযোগ সড়কের উন্নয়নে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর সমন্বয়ও জরুরি। কিন্তু সমন্বয়ের অভাবেই বছরের পর বছর সমস্যাগুলো একই জায়গায় রয়ে গেছে।
ফতুল্লা বিসিকের জন্য এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও বাস্তবমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা। কাঁচা সড়ক পাকাকরণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সড়কবাতি স্থাপন, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি এবং শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের ন্যূনতম প্রয়োজন।
যে শিল্পাঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখছে, সেখানে ন্যূনতম অবকাঠামো, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ উৎপাদনের পরিসংখ্যান দিয়ে উন্নয়ন মাপা গেলেও, সেই উৎপাদনের পেছনে থাকা মানুষের জীবনমান দিয়েই উন্নয়নের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়।
দেশের অর্থনীতির চাকা শুধু কারখানার যন্ত্রে ঘোরে না, ঘোরে শ্রমিকের ঘামে। যে শিল্পনগরী দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে, সেই শিল্পনগরীর শ্রমিকদের কাদা-পানি, ধুলাবালি, দূষিত পরিবেশ ও অন্ধকারের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হওয়া কোনো আধুনিক শিল্পব্যবস্থার পরিচয় হতে পারে না।
ফতুল্লা বিসিকের উন্নয়ন তাই শুধু একটি শিল্পনগরীর উন্নয়ন নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন। টেকসই শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদনের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিতে হবে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সুস্থ পরিবেশ এবং শ্রমিকের জীবনমানকে। তাহলেই শিল্পের প্রকৃত সাফল্য অর্থবহ হবে।









































আপনার মতামত লিখুন :