নারায়ণগঞ্জ শহর অনেকদিন ধরেই দখলদারিত্বের চাপে ছিল। পথচারীদের জন্য থাকা ফুটপাত ধীরে ধীরে অস্থায়ী বাজারে পরিণত হয়, আর একসময় সেই দখল মূল সড়কেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে রাস্তায় যানজট, ফুটপাতে হকার মানুষের স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগই ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে এই ভোগান্তি শহরের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে ১৩ এপ্রিলের উচ্ছেদ অভিযানকে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ বললে কম বলা হবে এটি ছিল শহরকে আবার শৃঙ্খলায় ফেরানোর একটি দৃশ্যমান উদ্যোগ।
বঙ্গবন্ধু সড়ক, নবাব সলিমুল্লাহ সড়ক ও শায়েস্তা খাঁ সড়কে পরিচালিত এই অভিযানে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে সমন্বয় থাকলে কঠিন কাজও সম্ভব। স্থানীয় সাংসদ, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করায় দ্রæত পরিবর্তন দেখা গেছে। অনেক হকারের স্বেচ্ছায় সরে যাওয়া দেখিয়েছে, এই অনিয়ম নিয়ে ভেতরে ভেতরে তারাও অস্বস্তিতে ছিলেন।
অভিযানের পর সিটি প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালামের স্পষ্ট ঘোষণা ফুটপাত ও সড়কে আর হকার বসতে দেওয়া হবে না। এটি কোনো কড়াকড়ি নয়, বরং একটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। একটি শহর যদি তার চলাচলের জায়গা রক্ষা করতে না পারে, তাহলে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রা সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই সিদ্ধান্তকে জনপ্রিয়তার দিক থেকে নয়, বাস্তবতার দিক থেকে দেখা উচিত।
কিন্তু এরই মধ্যে ২০ এপ্রিল কিছু জনবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক নেতা হকারদের সামনে রেখে আন্দোলনের চেষ্টা করছেন। পুনর্বাসনের দাবি অবশ্যই যৌক্তিক, কারণ জীবিকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই দাবিকে ব্যবহার করে যদি আবার ফুটপাত দখলের পুরোনো অবস্থায় ফেরার চেষ্টা হয়, তাহলে সেটি কোনো সমাধান নয়।
লাখো মানুষের দৈনন্দিন ভোগান্তির বিপরীতে অল্প কিছু মানুষের স্বার্থকে দাঁড় করানো ঠিক নয়। একটি শহরে সবার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য থাকা দরকার। ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত তৈরি করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
সিটি প্রশাসন ও স্থানীয় সাংসদ ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন, স্থানীয় ভোটার ও প্রকৃত হকারদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই প্রতিশ্রæতির বাস্তবায়ন। কারণ পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ টেকসই হয় না, আবার উচ্ছেদ ছাড়া শৃঙ্খলাও ফেরে না।
এই মুহূর্তে উত্তেজনা নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা। যারা সত্যিকারের হকারদের কথা বলতে চান, তাদের উচিত হবে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াকে দ্রæত ও স্বচ্ছ করা। আর যারা এই বিষয়টি ব্যবহার করে অস্থিরতা তৈরি করতে চান, তাদের ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
ইতোমধ্যেই বিশৃঙ্খলা তৈরিতে সহায়তাকারী কিছু নেতার বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের ক্ষোভ দেখা গেছে এবং তাদের বয়কটের আহŸান উঠেছে। কারণ বিষয়টি স্পষ্ট হাজার খানিক মানুষের জন্য লাখো মানুষের ভোগান্তি মেনে নেওয়া যায় না। নারায়ণগঞ্জের মানুষ তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তারা একটি চলাচলযোগ্য, শৃঙ্খলাপূর্ণ শহর চান। এখন দেখার বিষয়, এই জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে সবাই কতটা দায়িত্বশীল আচরণ করেন। শহরকে এগিয়ে নিতে আবেগ নয়, দরকার বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দৃঢ়তা।





































আপনার মতামত লিখুন :